- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভোগান্তিতে সাচনাবাজারের ক্রেতা বিক্রেতারা

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
হাওরের বন্দরখ্যাত জামালগঞ্জের সাচ্নাবাজার নানা সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে। জেলার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এই বাজারটিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, গণশৌচাগার, গভীর নলকূপ, অটোস্ট্যান্ডসহ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের প্রয়োজনীয় সব সুবিধা না থাকায় অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। বৃষ্টি হলে বাসা-বাড়ির দূষিত পানি নির্গত হয়ে বাজারের বাঁধ বাজার ও নতুন বাজার অংশে চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের হলেও ভোগান্তি নিরসনে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।
বাজারের যান ও জনচলাচলের প্রধান গলি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দখলে থাকায় বাজারে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের প্রতিনিয়ত গাদাগাদি করে পথ চলতে হচ্ছে। জরুরী রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স কিংবা বড় কোন গাড়ি নিজ গন্তব্যে যেতে মারাত্বক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ৩ বছর আগে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৎকালীন ইউএনও শামীম আল ইমরান উদ্যোগী হয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রধান গলি থেকে উচ্ছেদ করলেও এখন পর্যন্ত এদের স্থানান্তরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি। এ কারণে বাজারের অবস্থা যেই সেই।
সমস্যা দূর করতে ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারের স্থানীয় প্রশাসন, ও ব্যবসায়ী সমিতির চোখে পড়ার মত কোন উদ্যোগও নেই। বাজারের এমন অবস্থায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
শতবর্ষী সাচনাবাজারে শুধু জামালগঞ্জ উপজেলার মানুষই নয়, হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার মানুষও হাট-বাজার সারতে এখানে আসেন। সরকার এই বাজার থেকে মোটা অংকের রাজস্বও আদায় করছে। কিন্তু বাজারের উন্নয়ন কাজ প্রতিশ্রুতির বেড়াজালেই আটকে আছে। এই অবস্থায় ক্রেতা ও পথচারীসহ সকলেই বাজারের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সাচনা বাজারের আলাদা ঐতিহ্য আছে। প্রতিদিন অর্ধকোটিরও বেশি টাকা বেচাকেনা হয় এই বাজারে। সরকারও এই বাজার থেকে বছরে কোটি টাকা রাজস্ব নিচ্ছে। কিন্তু বাজারের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হচ্ছে না। একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে বেহেলী রোড, সিএন্ডবি রোড, বাঁধ বাজার, লামাবাজার ও মধ্যবাজারসহ বাজারের সকল অলি-গলি চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
এত বড় বাজারে কোন একটি গণশৌচাগার বাজারের উত্তর পার্শ্বে থাকলেও সেটিও ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সুপেয় পানির অভাব পূরণে নলকূপ আছে মাত্র একটি। এছাড়া বাজারে প্রবেশ করা শত শত রিক্সা, অটোরিক্সা, মোটরসাইকেলের নির্ধারিত কোন স্ট্যান্ড নেই। একারণে চালকেরা বাজারের যত্রতত্র যানবাহন দাঁড় করিয়ে যানজটের সৃষ্টি করছে। এই নিয়ে প্রায়ই চালক, পথচারী ও ব্যবসায়ীদের মাঝে বাক-বিত-া লেগেই থাকে। মালামাল বহনকারী ট্রাক-পিকআপ বাজারে প্রবেশ করলে স্বাভাবিক চলাচলে মারাত্বক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, এই বাজারের পূর্ব নাম ছিল কালীগঞ্জ বাজার। মূলত এটি সাচনা জমিদার বাড়ির দেবোত্তর সম্পত্তির অংশ হিসাবে প্রায় দু’শ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বৃহত্তর সিলেটের নদীবন্দর হিসাবে একসময় এ বাজারের সুখ্যাতি ছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জাহাজ মালামাল নিয়ে সাচনা বাজারে নোঙর করত। ভাটি অঞ্চলের অন্যতম হাট ছিল এটি। নানা অব্যবস্থাপনায় বাজারটির বর্তমান অবস্থা খুবই নাজুক।
২০১৮ সালের ৪ মে বাজারের সৌন্দর্য-শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ শুরু করেছিলেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আল ইমরান। ওইদিন উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক বাজারের গলিটি খালি করার কঠোর নির্দেশনা জারির পর নিজ উদ্যোগে গলি ছেড়ে বাজারের সৌন্দর্য ও সুশৃঙ্খল যাতায়াতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন অবৈধ ভাসমান ব্যবসায়ীরা। তার অংশ হিসেবে গলির মাঝখানে রোড ডিভাইডার স্থাপন করে উপজেলা প্রশাসন। পাশাপাশি গলির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অন্যত্র পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজোবধি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যার ফলস্বরূপ দখলমুক্ত জায়গা ফের দখল হয়েছে। বেড়েছে মানুষের দুর্ভোগ।
সাচনা নতুন বাজারের ব্যবসায়ী ও ছড়াকার পঙ্কজ শীল বলেন, বাজারের কথা আর কী বলব। বৃষ্টি হলে বাসা-বাড়ির ময়লাযুক্ত পানি রাস্তায় এসে দুর্ঘন্ধ ছড়ায়। রোগজীবাণুযুক্ত পানি জেনেও আমরা এর উপর দিয়ে হাঁটাচড়া করছি। সবকিছু মিলে প্রাচীন এই বাজারটি অপরিচ্ছন্ন অপরিষ্কার হয়ে পড়েছে। এগুলো দেখার কেউ নেই।
সাচনা বাঁধ বাজারের মুদিমাল ব্যবসায়ী সুনির্মল হালদার বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই বাজারের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। পানি জমে যাতায়াতে মারাত্বক ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। কারও পায়খানা-প্রশ্রাবে চাপ দিলে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। পুরাতন এই বাজারটির আরও কত যে সমস্যা আছে সেগুলো আর বলতে চাই না। এমনিতে নেতার অভাব নেই, কিন্তু কাজের বেলায় কেউ নেই, এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য।
সাচনা চৌধুরী বাড়ির সৈকত ঘোষ চৌধুরী জানিয়েছেন, পয়নিষ্কাশনের জন্য বাজারটিতে কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। হাজার হাজার লোকের জন্য স্যানিটেশন মাত্র একটি। তাও আবর্জনার স্তুপে চাপা পড়ে সেটি এখন বন্ধ! সরকার এ বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব নিলেও উন্নয়নের জন্য তেমন কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। তাছাড়া ব্যবসায়ী মহলে সঠিক নেতৃত্বের অভাবে সাচনা বাজার হয়তো একদিন বিলীন হয়ে যাবে। ঐতিহ্যবাহী এ বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। এর অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উন্নয়নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সাচনাবাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদ আল আজাদ বলেন, এ সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। বাজারে আসা ছেলেমেয়ে যে কারও হঠাৎ পেটে মোচড় দিলে তাকে মারাত্বক বেকায়দায় পড়তে হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদাপানি জমে চলাচলে অসহ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি রইল।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটি অচিরেই বাস্তবায়িত হবে এবং জামালগঞ্জে ড্রেন নির্মাণের কাজ শেষ হলেই সাচনা বাজারে এর কাজ শুরু হবে। এছাড়া পাবলিক টয়লেটের ব্যাপারটি এলজিআরডিতে দেওয়া আছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলোর কাজ শুরু হবে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বলেন, আগামী সপ্তাহ ১৫ দিনের মধ্যে ড্রেনের কাজ শুরু হবে। বাজারের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুইটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি বাজারকে সুশৃঙ্খল করতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাচাই বাছাই করে যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী তাদেরকে পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা চলছে। আস্তে আস্তে বাজারের সব সমস্যাই দূর হবে।

  • [১]