- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দোয়ারায় মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণেই নৌকার ভরাডুবি

আশিক মিয়া, দোয়ারাবাজার
মনোনয়ন বাণিজ্যই দোয়ারাবাজার উপজেলায় অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আ.লীগের নৌকা প্রতীকের ভরাডুবির কারণ হিসাবে এখনও আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে আটটিতেই চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের। কিন্তু জনপ্রিয় প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থী দেওয়ায় এবারের নির্বাচনে ৬টিতেই নৌকা প্রতীকের ভরাডুবি হয়েছে। এই ভরাডুবির পেছনে মনোনয়ন বাণিজ্যকেই দায়ী করেছেন দলীয় নেতা কর্মীরা।  
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ যদি বর্তমান চেয়ারম্যানদের মনোনয়ন দেয়া হত তাহলে এতবড় হুচট খেতে হত না আ.লীগের। যারা নির্বাচনের আগেও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ছবি সংবলিত পোস্টারে ভোটারদের শুভেচ্ছা দিয়েছেন তাদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা নিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে সহায়তা করা হয়েছে। এমনকি যারা বিএনপি থেকে সদ্য আ.লীগে যোগ দিয়েছেন তাদের বাড়ি বিক্রি করেও নৌকার মনোনয়নের জন্য টাকা দিয়েছেন বলেও কথা উঠেছে উপজেলা জুড়ে।
বর্তমান চেয়ারম্যানরা সবাই নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন না পাওয়ায়, দলীয় প্রতীক পাওয়া প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তারা। বিভিন্ন ইউনিয়নে ভোটের পরিমাণ এতই কম ছিল যে, সংসদ নির্বাচনেও এত কম ভোট কখনও পায়নি নৌকা। তবে ভোটারের মধ্যে আঞ্চলিকতা ও ব্যক্তি ইমেজই কাজ করেছে বেশি।
বাংলাবাজার ইউনিয়ন আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক বর্তমান চেয়ারম্যান জসিম আহমদ   চৌধুরী রানা বিজয়ী হয়েছেন ৬১২৬ ভোট পেয়ে, আর নৌকা প্রতীকের মনোনীত প্রার্থী মো.আবুল হোসেন পেয়েছেন ৪৫৯৭ ভোট।
এ ব্যাপারে ইউনিয়ন আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন বিক্রি করার কারণে এবং সঠিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন না দেয়ার কারণেই ভরাডুবি হয়েছে আ.লীগ প্রার্থীর ।’
নরসিংপুর ইউনিয়নের আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. আইয়ুবুর রহমান রহমানীর বিজয় হয়েছে ৩০৯৯ ভোট পেয়ে। আর আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ইউপি সদস্য আব্দুর রশিদ তালুকদার  পেয়েছেন ১০১৬ ভোট। এই ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের ভোটের অবস্থান ছিল ৬ নম্বরে।
নরসিংপুর ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি মো. নুরুদ্দিন আহমদ বলেন,‘ মনোনয়ন বাণিজ্য না করে যদি উপযুক্ত কোন ব্যক্তিকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হত, তাহলে কোন প্রার্থীর পরাজয় বরণ করতে হত না।’
দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী তিনবারের নির্বাচিত বর্তমান চেয়ারম্যান আ.লীগের যুগ্ম আহবায়ক মো.আব্দুল খালেক পেয়েছেন ৩৬৯৬ ভোট, আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আব্দুল হামিদ পেয়েছেন ৩১২৮ টি। বিজয়ী বিএনপির প্রার্থী আব্দুল বারী পেয়েছেন ৪৪২১ ভোট। এখানে নৌকা প্রতীকের মনোনীত ব্যক্তির অবস্থান ছিল ৩ নম্বরে।
ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি মানিক লাল দে বলেন, ‘যদি প্রকৃত ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হত, তাহলে ইউনিয়নের ভোটারদের এমন প্রতিক্রিয়া হত না। নৌকা প্রতীকের বিপুল জয় হত।’
বোগলাবাজার ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান উপজেলা আ.লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য আহাম্মদ আলী আপন পেয়েছেন ২৮৫৬ ভোট, আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রর্থী মোহাম্মদ মিলন খান পেয়েছেন মাত্র ৮৪৮ ভোট। এই ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি সমর্থীত মো.আরিফুল ইসলাম, তিনি পেয়েছেন ৩৯৮৮ ভোট। ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর অবস্থান ছিল ৩ নম্বরে।
৩১৬৫ ভোট পেয়ে লক্ষিপুর ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন আ.লীগের উপজেলা কমিটির যুগ্ম আহবায়ক বর্তমান চেয়ারম্যান বিদ্রোহী প্রার্থী মো. আমিরুল হক। আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী জহিরুল ইসলাম পেয়েছেন মাত্র ১৯২৪ ভোট। ভোটের হিসাবে নৌকা প্রতীকের মনোনীত ব্যক্তির অবস্থান ছিল ৪ নম্বরে।
ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমিরুল হক ছিলেন আ.লীগের দুর্দিনের কান্ডারী এবং জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান। আমরা কোন সময় ভাবিনি আ.লীগের মত একটি শক্তিশালী দল এমন ভুল করবে।’
তবে মনোনয়ন বাণিজ্যসহ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে দোয়ারাবাজার আওয়ামী লীগের একাংশের আহবায়ক ফরিদ আহমদ তারেক বলেন, ‘দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। আমাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে মনোনয়ন বাণিজ্যসহ নানা ধরনের মিথ্যা কথা বলা হচ্ছে। আমি কারো কাছ থেকে টাকা আদায় করেছি, কেউ কোন প্রমাণ দেখাতে পারবে না।’ তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘দলীয় প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর বিরোধিতা ও বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে এমপি মুহিবুর রহমান মানিক ও তার পিএস, দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক ও ছাতকের উপজেলা চেয়ারম্যান বকুল চৌধুরী কাজ করার কারণে।’
ছাতক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের প্রকৃত নিবেদিত কর্মীদের পক্ষে কাজ করেছি। যাদের পক্ষে কাজ করেছি তারা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। আমরা অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন আদায়কে ঘৃণা করি। কোন সুবিধাভোগি ও সুযোগ সন্ধানীকে পছন্দ করি না। ’
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক বলেন, ‘গত ৩০ এপ্রিলের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে যারা আমাকে অনুরোধ করেছেন আমি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিরোধিতা করার অভিযোগ মোটেও সত্য নয়।’

  • [১]