স্বপন কুমার দেব
ক্যান্ডির পথে
রোগগ্রস্ত শরীর নিয়ে লিখালিখি অত্যন্ত কষ্টকর। শরীর থাকে দুর্বল আর মন থাকে বিক্ষিপ্ত। রোগ যদি হয় ছেঁচড়া ধরনের তাহলে আরো কষ্ট। রোগের নাম চিকেন পক্স। বসন্ত রোগ বলে আর মহিমান্বিত করলাম না। ব্যাথা বেদনা চুলকানি সবই আছে। একুশ দিনের মেয়াদ আছে। ঘরবন্দি। ¯œান গোসল পানি লাগানো বন্ধ। পরবর্তী সময়ে আরো কত ফ্যাক্রা কে জানে। ভালো দিক একটা আছে। একবার হলে নাকি আর হয় না। তবে আমাদের বয়সে দ্বিতীয় বার হওয়ার আর সময় নেই। প্রকৃত অর্থে এই রোগের কোন ওষুধ বিষুধ নেই। ভাইরাস থেকে আগত। কাজেই কারণ আবিস্কার হয়নি ধরা যায়। তবে সব রোগীই মনে মনে ডাক্তার। আমার মতে এটি এক ধরনের ভাইরাস জনিত চর্ম রোগ। কেউ কেউ বলেন অশান্ত শরীরকে শান্ত করতে এ রোগের আবির্ভাব হয়। ডা. গৌতম রায় শুধু ডাক্তার নয় অতি চমৎকার মানবিক গুণ সম্পন্ন ও আন্তরিক। যতটুকু যে ভাবে আরাম বোধ করছি উনার পরামর্শে ও ঔষধ প্রয়োগে। সব ডাক্তারই ভালো তবে যেহেতু আমি উনার চিকাৎসাধীন আছি এজন্য উনার সম্পর্কে বলা। এই বয়সে এই রোগ সাধারণত হয় না। হয়ে যখন গেছে সহ্য করতে হবে। কথায় আছে ‘পরেছো মোঘলের হাতে খেতে হবে খানা একসাথে’। আগের দিনে টুটকা, ফাটকা, ভরন ছিল মূল ঔষধ। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গৌরা দা’র কথা। শশ্রুম-িত সদা হাস্যময় গৌরা আচার্য্য বসন্ত দেবী/শীতলা দেবীকে গুলে খেয়ে ফেলেছিলেন। উনি ছিলেন বসন্ত রোগের একমাত্র কবিরাজ। ভেবেছিলাম এই সংখ্যা বাদ দিয়ে দিবো। একটু ভালো লাগায় বসে গেলাম লিখতে। আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ। জেইল রোডের নদীর পাড়ের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা লেখক মতিউর রহমান ভাইয়ের সুরমা নদীর পাড় ভাঙা ফেসবুক লেখাগুলি দেখছি। এত কষ্ট আর আবেগ যে তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। বাসিন্দারা বিপন্ন। রোম যখন পুড়ছে, স¤্রাট নিরো তখন বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন। বাসা বাড়ী জলের তলে যাবে তো কি হলো। হোটেল আছে না? ফ্রান্সের এক রাজা দম্ভোক্তি করেছিলেন রুটির অভাব তো কি হয়েছে? কেক খাও। প্রসঙ্গত মনে পড়ে সুকান্তর একটি কবিতা। নামটি সম্ভবত ‘চালকুমড়ো’। রাজা রসিকতা করে প্রজাকে এই পরম বস্তুটি দিয়ে বলেছিলেন এতে চাল ও কুমড়ো দুটিই পাবে। এখন সবাই সেলফি বাজারে ফটো সদাই করতে ব্যস্ত। স্মৃতিময় নদীর পাড় আর লঞ্চ ঘাট এরিয়া কি ভবিষ্যতে থাকবেনা? তাহলে তো এই শহরও থাকবে না। যাই হোক ক্যান্ডি প্রসঙ্গে আসি। লেখার মাঝে গ্যাপ হওয়া অস্বস্তিকর। সিরিয়েল দেখনেওয়ালাদের মতো। তাই কষ্ট করে লিখছি। ক্যান্ডি, শ্রীলংকার মধ্য অঞ্চলে অবস্থিত। কলম্বো থেকে একশত কি.মি এর উপর দূরত্ব। জেলার নামও ক্যান্ডি। আয়তন এগারো স্কয়ার কি.মি। প্রস্থ এক হাজার ছয়শত ফিট। লম্বা ধাঁচের শহর। লোক সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ। কলম্বোর আগে ক্যান্ডিতে শ্রীলংকার রাজধানী ছিলো। চারিদিকে নয়রাভিমান পাহাড়। ভেতরে লেক। বিখ্যাত বুদ্ধ টুথ টেম্পল আছে এখানে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সুবিন্যস্ত চা বাগান। পর্যটকদের আকর্ষন ক্যান্ডি। ছোট শহরে হোটেল আছে পাঁচ শতাধিক। ১৩৫৭ খৃ: থেকে ১৩৭৪ খৃ: মধ্যে আধুনিক ক্যান্ডি শহর গড়ে উঠে। একটি দৃষ্টি নন্দন শৈল শহর। মাহেন্দ্র জয়বর্ধনের সঙ্গে আমরা সকাল ১০টার সামান্য পরে কলম্বো ছেড়ে আসি। শহরের শেষ সীমায় বিস্তির্ণ এলাকা নিয়ে কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শহর ছাড়িয়ে আমাদের মত গ্রাম। হাইওয়ে। মাঝে ছোট খাটো বাজার ও গঞ্জ। যেনো বিদেশ নয় দেশেই আছি। তবে সবুজের ঘনত্ব বেশী। রাস্তায় ছোট খাটো গ্রামীণ গরীব দোকানদার। সাধারণ কৃষকরা অনেক গরীব। আস্তো আস্তো নাড়কেলের পসরা সাজিয়ে বসেছে তারা। পুরো পরিবার। আঁকা বাঁকা রাস্তায় বসে নাড়কেলের জল খেতে প্রবল ইচ্ছে হলো। মাহেন্দ্র সাহেবেরও এতে ইন্ধন আছে। আলাদা ডাব জাতীয় কিছু নেই। গাড়ী থামিয়ে দোকানের বাঁশের বেঞ্চে বসে পড়লাম। এখানকার নাড়কেলের রং পাকা আমের মতো। ছোট বড় দুই রকম সাইজ। পানি অত্যান্ত স্বাদু। তিনজনে পেট পুরে খেলাম। ভেতরের সাদা শাস খেতে আরো মজার। রাস্তায় বসে গল্প গুজব করে আবার রওয়ানা। ক্যান্ডি নিকটে আসছে বুঝা যায়। উঁচু নিচু পাহাড় কাটা রাস্তা। গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ না হলেও সূদুরের হাতছানি। গাড়ী ঢুকলো ক্যান্ডি শহরে। কেমন যেন চেনা চেনা লাগে। হয়তো মনের ভেতরে কোথাও ঘুমিয়ে ছিলো। লোক সমাগম বেশ। দুপুরের পর পর হোটেলের সামনে। চমৎকার হোটেল। কাঠের প্যানেল দেয়া রুম। মেঝেতে কাঠের প্ল্যাংকিং। কথা ছিল প্রথমেই বৌদ্ধ মন্দির যাব। টুথ টেম্পল। গৌতম বুদ্ধের একপাটি দাঁতের একটি দাঁত এই মন্দিরে সুরক্ষিত আছে। অত্যন্ত পবিত্র এই মন্দির। লাঞ্চ শেষ করে মাহেন্দ্র’র সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে রওয়ানা দিলাম মন্দিরের উদ্দেশ্যে। কাছেই। বরঞ্চ গাড়ী নিয়ে গেলে পার্কিং ঝামেলা। বিশাল কমপ্লেক্স। বিভিন্ন স্থাপনা। লাইন দিয়ে টিকেট কেটে মূল মন্দিরে ঢুকলাম। দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গার পর্যটকে ভর্তি। কিন্তু কোলাহল নেই। সবাই নিরব। দোতালায় বিশাল কাঠের ফ্লোরে সারি সারি বসে আছেন ভক্তবৃন্দ। আলো ছায়ার খেলা। মনে হয় বসে থাকি। কিন্তু সব জায়গায়ই একই সমস্যা। সময় কম। অনেক কিছু আছে এই মন্দিরে দেখার মতো। বিভিন্ন দেশের গ্যালারী আছে। বাংলাদেশ গ্যালারী অন্যতম। ভলানটিয়ারের চোখে বাংলাদেশের নাম শুনে এক ধরনের আন্তরিকতা। বিদেশে এই অনুভূতি খুবই ভাল লাগে। পাকিস্তান, ভারত, চীন, আফগানিস্তান, কোরিয়া, জাপান সহ সব দেশের গ্যালারী আছে। এক সময় গৌতম বুদ্ধের বাণী এভাবেই দেশে দেশে ছড়িয়ে যায়। গ্যালারী, স্থাপনা দেখতে দেখতে কখন যে সময় চলে যাচ্ছে টের পাইনি। আছে লাইব্রেরী, দুষ্প্রাপ্য সব বই। জ্ঞানের ভান্ডার জীবনে পূর্ণ হয় না। জীবন শেষ হয়ে যায়। যখন বাইরে এলাম তখন সূর্য দেব পাটে যেতে বসেছেন। পাশের লেকে পাখির কিচির মিচির। ওপাড়ে শান্ত লোকালয়। লেকের জলে ফুল ও হাঁস। অনেক কিছু বলার রইলো। পরের সংখ্যায় হবে। একটু সুস্থ হয়ে নেই। (চলবে)
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক।