স্বপন কুমার দেব
বিদায় মালদ্বীপ ও লংকা যাত্রা
দিনটি শুক্রবার। আজ শ্রীলংকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। মালদ্বীপ সময় বিকেল ৩.২৫ মিনিটে উড়ান (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪.২৫ মি.), কলম্বো পৌঁছাবো শ্রীলংকান সময় ৫.২০মি.। অর্থাৎ মালদ্বীপ সময় ৪.৫০মি.। দেশে দেশে সময়ের হেরফেরে একধরনের জটিল হিসাব। যাইহোক আমাদের পৌঁছালেই হলো। একসময়ে শ্রীলংকা পরিচিত ছিল লংকা নামে। মহাকাব্য রামায়ণের মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে অযোধ্যার রাজা শ্রী রামচন্দ্র কর্তৃক লংকার রাজা রাবণের হাত থেকে পতœী সীতা দেবীকে উদ্ধার হওয়া নিয়ে। বিশাল যুদ্ধ ছাড়াও আছে নানা আনুষাঙ্গিক কাহিনী। রাবণ ছিলেন রাক্ষস রাজ। বিশ মাথাওয়ালা। সর্বকালের সেরা ভিলেনদের মধ্যে একজন। রামায়ণ মহাকাব্য পড়লে মনে হয় এখনও আধুনিক। বিচিত্র সংসার জীবনের নানা খুঁটিনাটি। একই সঙ্গে সত্যের পথে চলার এক আদর্শ মানদন্ডের দিক্নির্দেশনা। এক সময় প্রবাদ বাক্য ছিল ‘যে যায় লংকায় সেই হয় রাবণ’। এখনও প্রবাদ বাক্যটি প্রচলিত থাকলেও বাস্তবতা আর নেই। আধুনিক শ্রীলংকার মানুষজন খুবই ভালো। লংকা শব্দের বহুল প্রচার এখন আর না থাকলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নামটি ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে লংকাÑবাংলা নামে একটি যৌথ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভালো ব্যবসা করছে। আমরা ছাত্র থাকাকালীন শ্রীলংকাকে ‘সিলোন’ নামে চিনতাম। বিশেষত রেডিও ‘সিলোন’ এ হিন্দি গানের আসর সবাইকে পাগল করে রাখত। তবে জানা যায় আসলে এটি ‘সিলোন’ বা শ্রীলংকার কোন নিজস্ব প্রচার ছিল না। বোম্বের একটি প্রতিষ্ঠান ‘সিলোন’ বা শ্রীলংকার একটি বেতার তরঙ্গ ভাড়া করে দিনরাত্রি চব্বিশ ঘন্টা জনপ্রিয় সব হিন্দি গানের অনুষ্ঠান পরিচালনা করতো। ফৌজিদের জন্য ছিল অনুরোধের আসর। সেই নস্টালজিক ‘রেডিও সিলোন’ অনেকদিন হলো বন্ধ হয়ে গেছে। এখন তো রেডিও বা বেতারেরই যায় যায় অবস্থা। যাবার আগে সকালে এক চক্কর হেঁটে এলাম দ্বীপে। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ যথা নিয়মে খাওয়া হলো। একটু আগে আগে বেরুবো বলে মালপত্র নিয়ে হোটেল লবিতে নেমে আসি। মালদ্বীপ, শ্রীলংকা এসব জায়গায় হোটেলগুলিতে একটা নিয়ম চালু আছে। অতিথি যখন প্রথম হোটেলে ঢুকেন তখনই গ্লাস ভর্তি ফলের জুস দিয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করা হয়। জুস পান করতে করতে চলে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা। আমরা ‘হুলুমালে’ দ্বীপের হোটেল ‘কোরাল ইন’ এ যখন প্রথম ঢুকি তখন সময় রাত ১২টা পেরিয়ে গেছে। সম্ভবত কিচেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদেরকে জুস খাওয়ানো হয়নি। এবারে বিদায়বেলায় দুই গ্লাস অরেঞ্জ জুস খাইয়ে দেয়া হলো। স্বাদ চমৎকার। কোন ভেজাল নেই। ম্যানেজার রাজুকে জানালাম আমরা রেডি, ট্যাক্সি ডাকেন। রাজু যেন একটু লজ্জিত হলো। বিনীতভাবে বলল ঘন্টাখানেক পরে রওয়ানা দিলে হয় না, ফ্লাইটের তো দেরি আছে। কি ব্যাপার ? আজ যে শুক্রবার সেটি রাজুর মনেই ছিল না। শুক্রবার দিন জুম্মার নামাজ উপলক্ষে দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ থাকে। এখন উপায় ? রাজু ঝট করে একটা বিকল্প উপায় বের করে ফেলল। ট্যাক্সি বন্ধ থাকলেও গণপরিবহণের বাস চলাচল করে। সামনেই স্টপেজ। ১০ মিনিটের মধ্যে একটা বাস ছেড়ে যাবে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। বেয়ারা দিয়ে মালপত্রসহ রাজু আমাদের পাঠিয়ে দিল। রাজুর উপর রাগ করে আর লাভ নেই। হাসি মুখে বিদায় জানিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসস্টপে চলে এলাম। ট্যাক্সির অভাবে অনেক যাত্রী বাসে উঠছেন। আমরাও টপাটপ বাসে উঠে গেলাম। নইলে সিট মিলবে না। লালরঙ্গের চমৎকার লাক্সারী এসি বাস।
ট্যাক্সির চেয়ে ভালো। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় বাস ছেড়ে দিল। সুন্দর রাস্তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো অধিক সুন্দর বাস। বাস চলছে আর আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলছে বাম পাশের নীল সমুদ্র। একটানা গর্জন আর নয়নাভিরাম দৃশ্য। মালদ্বীপের সঙ্গে সাগরের বন্ধুত্ব সারাজীবনের। নীলের সঙ্গে সবুজের। একদিন কি সাগরে মিশে যাবে দ্বীপ? মনে হয় না। নানা বৈজ্ঞানিক যুক্তি কারণ ইত্যাদি বারবার বলছে মালদ্বীপ একদিন সাগরে তলিয়ে যাবে। আমার তা বিশ্বাস হয় না। ছোট দ্বীপ বন্ধুকে বিশাল সাগর পরম মমতায় আর যতেœ যুগ যুগ ধরে সাগর জলে ভাসিয়ে রাখবে। অকৃত্রিম বন্ধুত্বের এটাই তো নিয়ম। আপন মনে এসব ভাবতে ভাবতে পৌঁছে যাই ইব্রাহিম নাসির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। দিনের বেলা দৃশ্য অন্যরকম। বেশ ভীড় আছে। তবে সাগর এতো কাছে যে অনবরত হাওয়া এসে ধুয়ে দিচ্ছে সমস্ত মলিনতা। ভেতরে না ঢুকে কিছুক্ষণ সাগর পাড়ে দাঁড়ালাম। আসন পাতা আছে তবে জায়গা নেই। সাগরের জল এখানে নীল। ঢেউ আছে উথাল পাতাল। উড়োজাহাজ যদি উড়ার সময় কিংবা নামার সময় হিসেবের একটু হেরফের করে তাহলে সোজা সাগরে ঝাঁপ দিবে। তবে এধরনের ঘটনা এখন অব্দি ঘটেছে বলে শোনা যায়নি। এয়ারপোর্টের ভিতরে সব জায়গায় একই নিয়ম। এখানেও তাই। লাগেজ দুভাবে চেকিং হয়। বড় যেগুলি বক্সে যাবে সেগুলি এক মেশিনে চেক করে আলাদা নিয়ে যায়। গন্তব্যে গিয়ে ঘুর্নায়মান বেল্ট থেকে সেগুলি সংগ্রহ করতে হয়। হ্যান্ড ব্যাগ, জুতো, মোজা, বেল্ট, কোট, মোবাইল এগুলির চেকিং শেষ গেইটে। এরপর আর চেকিং নেই। এবারে শেষ চেকিংয়ে আমার হ্যান্ডব্যাগ আটকে গেল। আবার মেশিনে ঢুকানো হলে একই অবস্থা। সন্দেহজনক সিগন্যাল আসছে। এবারে ব্যাগের চেইন খুলে চলল ঘাঁটাঘাটি। তছনছ অবস্থা। ঔষুধপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। সমস্যা পাওয়া গেল প্লাস্টিকের টর্চে। অন্য সময় কিছু হলো না এখন যে কেন বেগড়বাই করছে তাও বুঝা গেল না। যাই হোক টর্চ নিষিদ্ধ নয়। ছাড়া পাওয়া গেল। সস্তির নি:শ্বাস নিলাম। লাউঞ্জে ঢুকে এবার অপেক্ষা কখন ফ্লাইটে উঠার ডাক পড়বে। ঝাঁকে ঝাঁকে বিদেশী পর্যটক। এতো লোক মালদ্বীপ বেড়াতে আসে তা যেন ভাবা যায় না। একেকটি ফ্লাইটের ঘোষণা হচ্ছে আর একেক দল যাত্রী উঠে যাচ্ছেন। অবশেষে আমাদের পালাও এসে গেল। উঠে গেলাম উড়োজাহাজে। এয়ারহোস্টেসদের দৌড়াদৌড়ি। আসন দেখিয়ে দিচ্ছেন। উড়োজাহাজের ভেতরে ঢুকলেই এক বিশেষ অনুভূতি হয়। একধরণের অপার্থিব মৃদু গুঞ্জন দূর থেকে ভেসে আসে। মাটি থেকে আসন্ন বিচ্ছেদের আশংকায় যেন কিছুটা ভয় ভয় ভাব। এক সময়ে প্লেনে চড়তে আমার খুবই ভয় হতো। মনে হতো অন্তর্জলি যাত্রা বা প্রকারান্তরে শেষ যাত্রা। এখন আর এতটা হয় না। তবুও আকাশ যাত্রা আমার কাছে আতংকের। অনেকেরই এমনটা হয়ে থাকে। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা থেকে জীবন্ত ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। একদল খেলোযাড় উঠেছে প্লেনে। তাদের মধ্যে যথেষ্ট হইচই। সম্ভবত ফুটবল টিম। মালদ্বীপে ফুটবল খুবই জনপ্রিয়। আমাদের দেশের মতোই লীগ খেলা হয়। দেশে বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মালদ্বীপ ফুটবল টিম খেলে থাকে। তবে জলের দেশে জলের খেলা অধিক জনপ্রিয়। সাঁতার, ডাইভিং, ওয়াটার পলো ইত্যাদি অনেক খেলার আয়োজন । এছাড়া এ্যাথলেটিক, দৌড়, বাস্কেটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন এমনকি ক্রিকেট খেলারও ভালো চর্চা হয় মালদ্বীপে। দেখতে দেখতে উড়োজাহাজ দৌড়াতে শুরু করে দিল। ছবির মতো এয়ারপোর্ট ক্রমশ: দূরে সরে সরে যাচ্ছে। একটু থেমে চূড়ান্ত দৌঁড়ে রানওয়ে থেকে শূন্যে উড়াল দিল বায়ুযান। বিদায় মালদ্বীপ। সেই একই রকম খাওয়া দাওয়া আর চা কফি। প্রায় দেড় ঘন্টা পর কলম্বোর বন্দরনায়েকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে স্থির হলো আকাশ যান। ডিসেম্বর মাসের সন্ধ্যা তখন নেমে গেছে। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক