- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভ্রমণ কাহিনী- মালদ্বীপ, শ্রীলংকা-সাত দিনের সাতকাহন-৭

স্বপন কুমার দেব
কলম্বোয় প্রথম রাত
প্লেন থেকে নামার সময় শ্রীলংকান এয়ার লাইনস এর এয়ার হোস্টেসরা বিন¤্র নমস্কারের ভঙ্গিতে ‘ভবতু:’ জাতীয় কিছু বলে যাত্রীদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। আমরা প্রতি নমস্কার জানিয়ে নেমে গেলাম। সামনে শাটল্ বাস রেডি। একটানে নিয়ে এলো এয়ারপোর্টের দরজায়। দ্রুত দোতলায় উঠেই ডান দিকে ‘অন এরাইভ্যাল ভিসা ডেস্ক’। শ্রীলংকায় সর্বত্রই ইংরেজী ভাষার চল আছে। নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথাবার্তা বললেও ভিন্ দেশের লোকদের সঙ্গে ইংরেজীতে কথাবার্তা চালাতে শ্রীলংকানরা সাবলীল ও পটু। তাদের ইংরেজী উচ্চারণ আমাদের মতোই। কাজেই মোটামুটি ইংরেজী জানলে কাজ কর্ম ও ভাবের আদান প্রদান চালাতে অসুবিধা হয় না। ডেস্কে বসা কর্মকর্তাকে ভিসা পাওয়ার নিয়ম কানুন জানতে চাইলে প্রথমে পাঠিয়ে দিলেন আরেকটি ডেস্কে। সেখানে ফর্ম পূরণের কাজ চলছে। আগত বেশিরভাগ যাত্রীই অন এ্যারাইভেল ভিসা নিয়ে ঢুকবে। এয়ারপোর্টগুলিতে নানা ধরনের ফর্ম পূরণ করা একটা নিত্য নৈমিত্তিক কাজের মতো। পাসপোর্ট সম্পর্কিত তথ্য, সিগনেচার ও হোটেল বুকিং হলো আসল জিনিস। কিছু কিছু কলাম আছে না যায় বুঝা না যায় পূরণ করা। এগুলি অনেকে খালি রেখে দেয়। কর্তৃপক্ষও এনিয়ে মাথা ঘামায় না। ফর্ম পূরণ করে আবার প্রথম ডেস্কে এসে জমা দিলাম। অফিসার শুধু বললেন ফিফ্টি ডলার। মানে দুই পাসপোর্টের জন্য পঞ্চাশ ইউএস ডলার জমা দিতে হবে। ডলার জমা দিয়ে রশিদ নিয়ে আবার অন্য এক কাউন্টারে। সেখানকার অফিসার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পাসপোর্ট ও রশিদ নাড়াচারা করে পাসপোর্টে দু সপ্তাহের জন্য অন এ্যারাইভেল ভিসার গোল স্টিকার সেঁটে দিয়ে প্রয়োজনীয় সিল ছাপ্পর মেরে দিলেন। আমরাও সোজা নিচ তলায় নেমে এলাম। তখন সংশ্লিষ্ট বেল্টে আমাদের দুটো সুটকেস ঘুরপাক খাচ্ছে। হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা এয়ারপোর্টের বাইরে। তখন সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে সময় এগুচ্ছে রাতের দিকে। এয়ারপোর্টের বহিরাঙ্গন ভেতরের মতোই আলো ঝলমল। সম্পূর্ণ অজানা অচেনা পরিবেশ। মালদ্বীপে বাঙালিদের হাক ডাক ছিলো। এখানে তাও নেই। নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্টের লোক আসার কথা। মহা উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। কিন্তু কেউ আসলো না। নিরাশা থেকে ভয়ের সঞ্চার হলো। এখন কি হবে কোথায় যাই। আমাদের বুকিং দেয়া হোটেলের নাম ‘কনকর্ড’। কলম্বো শহরে সেটি কোথায় কেউ বলতে পারে না। একজন পুলিশকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম কলম্বো নগরটি এয়ারপোর্ট থেকে চল্লিশ কি.মি দূরে। এবারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে দ্রুত। আমরা আবার এয়ারপের্টের ভেতরে ঢুকে গেলাম। সারি সারি মানি এক্সচেঞ্জের বুথ। ডলার ভাঙ্গাতে হবে। তারপর ট্যাক্সি ভাড়া করে ছুটতে হবে কলম্বো নগরীর উদ্দেশ্যে। মাথায় তখন এটাই একমাত্র চিন্তা। একশত ডলারের এক্সচেঞ্জ করে পাওয়া গেল প্রায় ত্রিশ হাজার শ্রীলংকান রূপী। অনেক টাকা। মনে মনে খুব খুশী। এত টাকা। পাঁচ হাজার রূপীর নোট আছে শ্রীলংকায়। এত টাকার মাজেজা পরে বুঝেছিলাম। যাই হোক ডলার ভাঙ্গিয়ে পেছনে ফিরতেই এক সুঠাম দেহী দেবদূতের দর্শন। মধ্যবয়সী একজন স্মার্ট ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। হাতের প্ল্যকার্ডে আমাদের নাম সংক্ষেপে লেখা। বুঝে গেলাম সব কিছু। উনি খুঁজছেন আমাদেরকে আর আমরা খুঁজছি উনাকে। অবশেষে মাহেন্দ্রক্ষণে দেখা। আলাপ পরিচয় হলো। ভদ্রলোকের নাম মাহেন্দ্র জয়বর্ধনে। স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট প্রেরিত লোক। বাহন সঙ্গে নিয়ে এসেছেন আমাদের হোটেলে নিয়ে যাবার জন্য। এতক্ষণ কেন দেখা হলো না এটা দু’পক্ষেরই দুর্ভাগ্য। মালদ্বীপের   মতো কলম্বোতেও শীত নেই। মাহেন্দ্র জয়বর্ধনের পরনে প্যান্ট ও হাফ শার্ট। বেশ লম্বা চওড়া। আগেই বলেছি সুঠাম ও সুদেহী। গাইড কাম ট্যাক্সি ড্রাইভার বলে আদৌ মনে হয় না। বলতে গেলে আমরাই বরং ওর কাছে ¤্রয়িমান। মাহেন্দ্রকে জানালাম একটা শ্রীলংকান মোবাইল সিম কিনে নিলে ভালো হয়। সারাক্ষণ ব্যবহার করা যাবে। এয়ারপোর্টের ভেতরেই অনেক মোবাইল কোম্পানীর শো রুম আছে। আমরা একটিতে ঢুকলাম। দাম শুনে হতবাক। দেশে এবং বিদেশে কথা বলা যাবে এমন একটি সিমের দাম পড়বে প্রায় দুই হাজার শ্রীলংকান রুপী। কোথায় আমাদের দেশে একশত থেকে দেড়শত টাকা। ভারতেও দাম আমাদের মতো। আর শ্রীলংকায় এতো দাম। ডলার ভাঙ্গিয়ে বেশ কিছু টাকা পেয়ে যে আনন্দ পেয়েছিলাম এবারে তা কিছুটা বোধগম্য হতে শুরু করে। ডলারের মূল্যমানে শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ প্রায় সমপর্যায়ের হলেও জিনিসপত্রের দামে এতো ফারাক কেন? দেশ থেকে কিছু শুনে গিয়েছিলাম আর গিয়ে কিছু শিখলাম। অর্থনীতি জিনিসটা এমনিতেই জটিল। দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন নিজস্ব পলিসি আছে। শ্রীলংকান রুপীর ইউনিটের হিসাব বা পরিমাণ অনেক ছোট। যার ফলে সামান্যতেই অনেক রুপী হয়ে যায়। আবার বাজার করতে গেলে সেই পরিমাণ রুপী কিছুই না। পরের একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে রাখছি। আমাদের দেশের ত্রিশ টাকা দামের পাউরুটি আর নব্বই টাকা দামের একটি বাটার বা মাখনের প্যাকেট কিনেছিলাম পাঁচশত শ্রীলংকান রুপী দিয়ে। জাপান অনেক উন্নত দেশ হলেও জাপানী মুদ্রার অবস্থাও নাকি এরকমই। যাইহোক সিম না কিনেই মাহেন্দ্র জয়বর্ধনের সঙ্গে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ওর ট্যাক্সিতে উঠলাম। বিমানবন্দর এরিয়া অতিক্রম করতেই অন্ধকার গ্রাস করে নিলো। বুঝা যায় দু’ধারে গ্রাম, গাছ-গাছালি আর নিরবতা। শুধু হাইওয়েতে আলো আর হুস হুস করে গাড়ী আসা যাওয়া। মাহেন্দ্র জয়বর্ধনের সঙ্গে চললো টুকটাক আলাপচারিতা। চল্লিশ কি.মি রাস্তা পাড়ি দিয়ে কলম্বো সিটি। এক প্রান্ত দিয়ে ঢুকে আরেক প্রান্তে আমাদের হোটেল ‘কনকর্ড’। বেশ কিছু সময় চলার পর আমরা নগরীর প্রান্তে। লোক চলাচল, যানবাহন, আলোর মালা এগুলির সংখ্যা বাড়ছে। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের গাড়ীর গতি কমে এলো। মাঝে মাঝে ছোট খাটো ট্রাফিক জ্যাম। মাহেন্দ্র জানালেন, অফিস ফেরতা লোকজনের বাড়ী ফেরার চাপ থাকবে আরো বেশ কিছুক্ষণ। কলম্বো সিটি আয়তনে বেশ বড়। চলতে চলতে আমরা বাজার এলাকায় ঢুকলাম। এখানে জ্যাম অনেক বেশি। আমরাও তখন অধৈর্য্য হয়ে পড়েছি। অবশেষে হোটেল ‘কনকর্ড’ এর ভিতরে  গাড়ী পার্ক করালেন মাহেন্দ্র। শ্রীলংকান সময় রাত তখন সাড়ে ৮টা হবে। বাংলাদেশ সময় রাত নয়টা। হোটেল রিসেপশনে আনুষ্ঠানিকতা সারতে আরো বিশ মিনিটের মত লাগলো। আমার স্মার্ট ফোনে ওয়াইফাই  কোড্ তাদের দিয়েই সেট করিয়ে নিলাম। মাহেন্দ্র পরের দিন সকাল নয়টায় আসবেন বলে বিদায় নিলেন। আমরা দোতলায় উঠে নির্দিষ্ট রুমে ঢুকেই মোবাইলের ইন্টারনেটের ভাইবার দিয়ে ঢাকায় মেয়েদের জানান দিলাম আমরা কলম্বোতে আছি। হোটেলটি যথেষ্ট স্ট্যান্ডার্ড। থ্রি স্টার। আসন্ন ক্রীসমাস উপলক্ষে আলো আর ফুল দিয়ে সেজেছে হোটেল। আমাদের রুমটিও চমৎকার। কমপ্লিমেন্ট বা সৌজন্য হিসেবে ফ্লাক্সে গরম জল এবং দু কাপ করে চা এবং কফির যাবতীয় সরঞ্জাম টেবিলে সাজানো আছে। হাত, মুখ ধোয়ে ডিনার করব বলে নিচে হোটেলের রেঁস্তোরায় নেমে এলাম। ইতোমধ্যে দর দামের একটা আন্দাজ পেয়ে গেছি। কাজেই সাবধান। নিচে হোটেলের রেঁস্তোরার মেনু দেখে রাইস, ভেজিটেবল আর কি একটা লংকান তরকারী দিয়ে ডিনার সেরে নেই। নারকেলের আধিক্য আছে। পেট ভরেছে আবার একহাজার রুপীর বেশি লাগেনি। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম টেবিলে টেবিলে প্রায় সবাই খাবার সঙ্গে মদ্য পান করছেন। বুঝা যায় এসব এখানে খোলামেলা। রুমে ফিরে এসে আর দেরি না করে সব চিন্তা আপাতত বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের চেয়ে শান্তি আর কিছুতে বোধ হয় নেই।
(চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক

  • [১]