রোকেস লেইস
উমিয়াম লেক বা বারাপানি লেক এ’টি একটি কৃত্রিম লেক, উমিয়াম নদীতে বাঁধ দিয়ে এর সৃষ্টি। যা সাধারণভাবে বারাপানি নামেই পরিচিত। জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরবর্তী, শিলং গোয়াহাটি হাইওয়ের পাশে, এই লেক। আধা ঘন্টার মধ্যেই পৌছে গেলাম। মূল সড়কে বেশ কয়েকটি ভিউ পয়েন্ট আছে। প্রতিটি পয়েন্ট থেকে ভিন্ন ভিন্ন মনকাড়া রূপ। তবুও যেনো দেখার তৃপ্তি মেটে না। বেশ খানিক সামনে গিয়ে ওর্কিড পার্কে ঢুকলাম। গাড়ি ছেড়ে নেমে টিকেট নিয়ে ভিতরে ঢুকে একদম লেকের তীরে গিয়ে দাঁড়াতেই, নৈসর্গিক অপার সৌন্দর্য চোখের সামনে। ছোট বড় পাহাড় নীলাভ সবুজ। পাহাড়ের গা জুড়ে পাইন আর রকমারী বৃহৎ গাছগাছালি। আর, পাহাড়ের ঘেরাটোপে জল টলমল অনন্য সুন্দর জলের আধার এই উমিয়াম লেক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩১০০ ফুট উচ্চতায় ২২০ স্কয়ার কিলোমিটারেরও বেশী এলাকা জুড়ে রয়েছে, এই অনিন্দ সুন্দর জলাশয়। যার তুলনা করা হয় স্কটল্যান্ড এর হ্রদ সৌন্দর্যের সাথে । আর এরই কারণে শিলং কে “প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড” ও বলা হয়। ১৯৬৫ সনে বাঁধ তৈরীর দ্বারা সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদের পানি থেকেই নর্থ ইষ্ট ইন্ডিয়ার প্রথম হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি প্ল্যান্ট এর যাত্রা শুরু। হ্রদের পানি প্রাকৃতিক মাছের বিরাট উৎস। হ্রদে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা রয়েছে। বহু দর্শনার্থী সৌন্দর্য পিপাসু নৌকায় চড়ে বেড়াচ্ছেন। উমিয়াম’ স্থানীয় শব্দ যার অর্থ ‘কান্নার জল’। প্রচলিত মিথ হচ্ছে, স্বর্গ থেকে দু’বোন নেমে আসার মনস্থ করে, এক সাথে নামতে থাকে। এক বোন অজানায় হারিয়ে যায় চিরতরে, অন্য বোন নেমে আসে মেঘালয়ের পর্বত মালাময় এই ভূমিতে। বোনের বিচ্ছেদ সইতে না পারা, চোখ ফেটে বেরিয়ে আসা জলই এই উমিয়াম বা ‘কান্নার জল’। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত অপর নাম বারাপানি অর্থ ‘বিগ ওয়াটার’ বা বড় পানি। উমিয়াম লেক মেঘালয় এবং আসাম রাজ্যের মধ্যবর্তী। হাইওয়ের ঠিক বিপরীত পাড়ে হোটেল রাই কুনজাই যা গভীর ঝোপঝাড়ময় নিভৃত এলাকায় অসাধারণ নির্মাণ শৈলীতে প্রস্তুত। গোয়াহাটি মুখী বেশ অনেকটা পথ পেরিয়ে যেতে হয়। এ পথে যেতে লেকে নির্মিত বাঁধ, যা সেতু হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে সেটিও পেরিয়ে গেলাম। শিলং ঢোকার পথে রাত থাকায় মেয়েকে দেখাতে পারিনি। আজ রোদময় স্বচ্ছ দিনে, আগে দেখা ছিলো তাই বর্ণনা করে যাচ্ছি। আর সাথে তো অতি উৎসাহী ধারা ভাষ্যকার সামছুল রয়েছেই। আজ সে আরো বেশী জড়তাহীন, বাংলা ভাষী খাসি তরুণ সামছুল। সে যতটা বুঝে তার চেয়ে বেশী বোঝানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় লিপ্ত হয়। এটাও ঠিক এ স্থানগুলো দেখতে দেখতে অনেক কিছুই তার জানা। তবে, রাই কুনজাই দেখতে যখন জংগল এর পথে ঢুকছি, তখন সে যেনো ক্যামন চুপসে গেলো। কারণ, এটা তার কমন পরে নাই। যাহোক ওখানে পৌঁছে জানা গেলো, আগে থেকে বুকিং ছাড়া ভিতরে যাওয়া যাবে না। যা,অতি সম্প্রতি চালু হয়েছে। আগের বার এমন কোনো নিয়ম ছিলো না, সে কারণেই গিয়েছিলাম। হোটেলটি লেকের পাড়ে নির্মিত, কোনো কোনো রুমের দেয়াল গ্লাসের তৈরী। আর গ্লাসে, লেকের ছবি এমনভাবে প্রতিফলিত হয়ে আছে, যা সত্যি অতুলনীয়। যেনো রুমের ভিতরে লেক চলে এসেছে। হোটেলটির দেয়ালে ব্যবহৃত কাঠ যেনো সোনায় মোড়ানো, এতোটাই দৃষ্টিনন্দন। আর অনেকটাই লেকের উপরে, বসার ব্যবস্থা করে তৈরী কাঠের পাটাতন, চতুর্দিক খোলা, উপরে ছাদ। ওখানে বসে চা, কফি পানের আমেজই অন্যরকম। হোটেলটি যথেষ্টই কস্টলি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মেয়েকে দেখানো সম্ভব হলো না। ফেরার পথে সামছুলের স্বগতোক্তি, আক্ষেপ বিদেশীরা খবর জানে অথচ সে জানে না, সেজন্য। ওখান থেকে ফেরার পথে সোজা গেলাম রবীন্দ্রনাথ দর্শণে অর্থাৎ ‘রবীন্দ্র আর্ট গ্যালারী’। গতরাতে বাইরে থাকা কবিগুরুর স্ট্যাচু’র ছবি নিয়েছিলাম। আজ প্রথমেই ভিতরে গেলাম রুমে রুমে বিশ্বকবির ব্যবহার্য আসবাবপত্র, পারিবারিক ছবিসহ অনেক দুর্লভ ছবি, আর কবির নিজ হাতে আঁকা অসংখ্য জল রং, তেল রং প্রোট্রেট ফ্রেমে বাঁধানো। ভাবগম্ভীরতা এতোটাই প্রকট ঘুরে ঘুরে শুধু দেখতেই ইচ্ছে হয়। এখানেই রাখা আছে ‘শেষের কবিতা’র পান্ডুলিপি। পরিদর্শন বইয়ে কিছু লিখার লোভ তো ছিলোই, লিখতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম তারিখটা তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলা ভাষার আরো এক দিকপাল, বিশ্বকবির স্নেহধন্য বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আজ জন্মদিন। লিখলাম, “বিদ্রোহী কবির জন্মদিনে/তোমার বিশালতার একটুকু পরশ”। বের হতে মন চায় না তবু ফিরতে হলো। বাসায় ফিরে, পম্পা রেডিই ছিলো ওকে নিয়ে বেরিয়ে পরি। গন্তব্য, হাসিনার সাথে স্বাক্ষাত। আগের রাতেই প্রোগ্রাম হয়ে ছিলো, হাসিনার সাথে কথা বলে। একটু পিছনে যেতে হয়, প্রথম বার শিলং যাবার সময় জাহানারা’র মোবাইল নাম্বার পরিচিত একজনের কাছ থেকে কথা প্রসঙ্গে পেয়ে যাই। জাহানারার বাবা শুক্কুর মাহমুদ সুনামগঞ্জে আত্মীয়তা আছে, মূলত উনি সিলেটের লোক । এক পর্যায়ে খাসি বিবাহ করে বালাটে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেকেই উনার বালাটের বাড়িতে ছিলেন, কাঠের প্ল্যাঙ্কিং করা ঘর। সুনামগঞ্জ স্বাধীন হওয়ার পর পরই বালাট গেলে, ঐ বাড়িতে এক রাত ছিলাম। জাহানারা আইনজীবী, শিলং হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন। এটুকু জানা থাকায় শিলং পৌছেই তাকে মোবাইলে পাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু নেট এতো খারাপ যে হ্যালো’ পর্যন্তই কথা হচ্ছিল। ঐ রাতে আসামের একজন প্রাক্তন মন্ত্রী মহোদয়ের বাসায় আমাদের ডিনার ছিলো। ওখানে কথাবার্তা চলছে একজন মেয়ে এসে বসলেন, ওর সাথে কথা বলতে গিয়ে জানা গেলো উনি জাহানারার আপন ছোট বোন হাসিনা। ঐ যে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি যেমন। এখানে জাহানারাই ওকে নামিয়ে দিয়ে গেছে। পরদিন স্বাক্ষাত হলো জাহানারার সাথেও। এইবার, আমরা যাওয়ার ক’দিন আগেই হাসিনা বাংলাদেশে এসেছিলো জাহানারার মেয়েসহ। ঢাকা থেকে সিলেট হয়ে ফিরবে জানতে পেরে, সিলেটে গেলে ওর সাথে দেখা হয়। তো, বিকালে হাসিনার অফিসে দেখা করতে গেলাম। শত ব্যস্ততা মাঝেও সে এতোটাই উষ্ণ আর আন্তরিক, সত্যি অভিভূত হতে হয়। ওর বাসায় ডিনারে যেতে এমনভাবে ধরলো, যা এড়ানো গেলো না। বাসায় ফিরে দেখি জামাই বাবাজি বাসায়, বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিতে। হাসিনার নিমন্ত্রণ এবং বিশেষভাবে বলেছে নিয়ে যেতে, বলার পর বাবাজি যেতে সম্মত হওয়ায়, সামছুলকে ছুটি দেওয়া হলো। বাবাজি গাড়ি বের করলো আমরাও উঠে পরি। বেশ অনেকটা পথ যেতে হলো, হাসিনা বাসার সামনেই অপেক্ষায় ছিলো। ঘরে গিয়ে ওর অশীতিপর বৃদ্ধা মা’য়ের সাথে কথা হলো, জাহানারাও ছিলো। বেশ আনন্দ স্ফূর্তিতে খাওয়া দাওয়া হলো। অবাক হতে হলো হাসিনার কর্মতৎপরতায়, সারাদিন অফিস করে এতো অল্প সময়ে এতো প্রচুর আয়োজন করেছে, তাও নিজ হাতে। ওর বড় ভাই হোসেনের সাথে আগেই পরিচয় ছিলো, এবার ছোট ভাই আজাদের সাথেও পরিচয় হলো। হোসেন বালাট আছে, ইচ্ছা ছিলো বালাট দেখতে যাবো ওর সাথে মোবাইলে কথাও বলেছিলাম। কিন্তু রাস্তা না-কি মোটেই ভালো না, তাই বাদ দিতে হলো। প্রচুর আড্ডা হলো বেশ রাতে বাসায় ফিরলাম। বাসায় ফিরে গল্পে গল্পে যথারীতি আজও রাত দু’টোয় ঘুমাতে গেলাম। পরদিন যাবো চেরাপুঞ্জি, বিশ্বের প্রধানতম বৃষ্টিবহুল এলাকা। সকালে উঠে প্রস্তুত হতেই সামছুল হাজির। পম্পা কাজ থাকায় যেতে পারছে না। আজ অনেকটা সকাল সকাল বেরিয়ে পরি। রোদ্রস্নাত ঝলমল আকাশ শিলং থেকে ৫৩ কিলো মিটার দূরত্বে চেরাপুঞ্জি। রাস্তা এতোটাই মসৃণ যে বলার অপেক্ষা রাখে না। দু’পাশে, কাছে দূরে পাহাড় আর পাহাড়ে সবুজের গালিচা পাতা। পথে বেশ ক’টা ভিউ পয়েন্ট আছে, থামলাম দেখলাম । চা,কফি পান করা হলো। প্রচুর গাড়ি সামনে পিছনে একই পথে ; গন্তব্য একটাই, এশিয়ার দ্বিতীয় এবং ভারতের উচ্চতম জল প্রপাত ‘নও খালিকা’ই দেখতে যাওয়া, যা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১১১৫ ফিট উচ্চতায়। পথে যেতে চোখে পড়লো দু’জন ইউরোপীয় মেয়ে সাবলীল পায়ে হেঁটে যাচ্ছে, যখন সকলেই যাচ্ছে গাড়িতে। চেরাপুঞ্জির মূল রূপ মেঘ ভেসে বেড়ানো, সেটাই অনুপস্থিত আজ। যা, প্রথমবার দেখতে পেয়েছিলাম। প্রথমবার গিয়ে জলপ্রপাতটি দেখে ক্যামেরা ঠিক করছি আর মেঘ এসে ঢেকে দিলো। উপরে, নীচে, সামনে পিছে শুধু মেঘ আর মেঘ এমনভাবে ছেয়ে গেলো, আর ছবি তুলাই হয়নি। খুবই কষ্ট নিয়ে ফিরেছিলাম, মুহূর্ত কয়েক মাত্র জল প্রপাতটি দেখতে পেয়েছি বলে। আর আজ ভরা বর্ষা হলেও চিত্র ভিন্ন, মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। খুবই পরিচ্ছন্ন ছবি তুলা গেলো। তবে মেয়ের জন্য আফসোস থেকে গেলো মেঘের বাড়ি এসে মেঘ না দেখতে পাওয়ায়। ওখান থেকে ফিরে আসছি ফাঁকা রাস্তায় মেয়েগুলোকে পেয়ে গাড়ি থামালাম। কথা বলে জানা গেলো ওরা এসেছে আমেরিকা থেকে। মেয়ে ওদের সাথে ছবি উঠাতে চাইলে, বেশ আগ্রহ নিয়েই পোজ দিলো। প্রায় দশ কিলোমিটার পথ ওরা স্বাচ্ছন্দ্যে হেঁটে যাচ্ছে। যা এখানে অনেক পুরুষও সাহস করবে না। ফেরার পথে চেরাপুঞ্জি শহরের ভিতর দিয়ে ফিরলাম, এবারের গন্তব্য শহর থেকে প্রায় ছ’কিলোমিটার দূরের ‘মাওসামাই কেব’ বা গুহা। ওখানে গিয়ে টিকেট নিলাম গুহা দেখতে সিড়ি বেয়ে অনেকটাই উপরে উঠে গুহামুখ পাওয়া গেলো। সামছুল সবজান্তা বক্তব্য ঝাড়ছে, বেশ ক’বার এসেছে, তার কথা থেকে ভালোই ধারণা পাওয়া গেলো। আমরা ভিতরে ঢুকলাম, ১৫০ মিটার দূরত্ব পেরিয়ে বিপরীত পাশে গিয়ে বেরুতে হবে। ভিতরটা অসমতল এবরোথেবরো, পাথর চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ায় যথেষ্টই পিচ্ছিল। কোথাও কোথাও এতোটাই সংকীর্ণ যে রীতিমত জড়সড়ো হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। এ এক দুর্লভ দুষ্প্রাপ্য অভিজ্ঞতা। এ ক্ষেত্রে সামছুল যথার্থই গাইড। মাঝে মাঝে উপর দিয়ে চামচিকা বা এ’জাতীয় পাখির উড়াউড়ি, ভীতিপ্রদ।। ভিতরে ইলেকট্রিসিটির আলো থাকার পরও আদি ভৌতিক পরিবেশ যেনো। অনেক জায়গাতেই পাথরের গর্তে পানি জমে আছে। মানুষেরা অন্ধবিশ্বাসে টাকা, আধুলি, সিকি, ছুঁড়ে দেয়ায় পনির নীচে ভালোই স্তুপ জমে আছে। টাকা নয় বিশ্বাসই এখানে মূখ্য, হয়তো কেউ পেয়েছে কখনো কোনো আরাধ্য। হয়তো পায় নাই, হয়তো পাবেও না। তবু মানুষ আঁকড়ে থাকে বিশ্বাস নিভৃত একান্তে।