এনাম আহমদ (অ্যাডভোকেট)
স্থানীয় সময় বিকেল সোয়া পাঁচটা। কাঠমন্ডুর আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। মেঘের ফাঁক গলে আমাদের বিমানটি কোথাও নামার চেষ্টা করেও সুবিধা করতে পারছে না। শুধু উপরে চক্কর দিচ্ছে। আমরা একই সাথে আনন্দিত ও আতঙ্কিত। এক পর্যায়ে কাঠমন্ডুর ত্রিভুবন বিমান বন্দরে আমরা প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। এমনিতেই ত্রিভুবনের চারিদিকে পাহাড় থাকায় এটি পৃথিবীর অন্যতম বিপদজনক বিমানবন্দর। অপরদিকে বড় ভূমিকম্পের কারণে রানওয়ে এখনও পুরোপুরি মসৃন নয়। এছাড়া এটিই ইউ.এস.বাংলা এয়ারলাইনসের এই রুটের প্রথম ফ্লাইট। পাইলট সাহেব পরিস্থিতি না বুঝায় সম্ভবত ঝাঁকুনিটা একটু বেশিই লাগলো। বিমানে যখন ঘোষণা শুনলাম আমরা কাঠমন্ডুতে নামছি, তখনও কোন সমতল ভূমি চোখে পড়েনি। পরে বুঝা গেল অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ‘মন্ডুর’ একটি অংশকে কোনমতে ‘কাঠ’ করা হয়েছে।
নামার আগ পর্যন্ত আমরা সুখেই ছিলাম। প্রথম ফ্লাইট হওয়ায় ্আমাদের টিকেট ফেয়ারও কম লেগেছে এবং বিমান কর্তৃপক্ষ আমাদের আদর যতেœ অতিষ্ট করার চেষ্টা করছে। কিন্তু রোজা মাস থাকায় তাদের সব আপ্যায়ন আমাদের শুকনো মুখে সহ্য করতে হয়েছে। আমরা কাঠমুন্ডু এসেছি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আইনজীবী সম্মেলনে যোগ দিতে। ৭ সদস্যের প্রতিনিধি দলে আমাদের দলনেতা সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আখতার-উল-ইসলাম। ছোট ছিমছাম বিমানবন্দর। সর্বত্র সূক্ষ্ম রুচিবোধের পরিচয় মেলে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সামান্যই। পোর্ট এন্ট্রি ভিসা। আমাদের প্রায় কাছাকাছি সময় নেমেছে লেবাননের আইনজীবী প্রতিনিধি দল। সবাইকে স্বাগত জানালেন সম্মেলনের হোস্টরা। মানবতাবিরোধী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর অ্যাড. জেয়াদ আল মামুন আমাদের দলে থাকায় বিমানবন্দরে এলেন বাংলাদেশ দূতাবাসের ফাস্ট সেক্রেটারী সুশান্ত। আমরা সবাই নির্ধারিত গাড়িতে করে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ড্রাইভার রাম আশেপাশের বিভিন্ন জায়গার বর্ণনা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। জানালার দুই পাশে আমরা কাঠমন্ডু দেখার চেষ্টা করলাম। চাকচিক্য বর্জিত মলিন একটি শহর।
মানুষের পোশাকআশাকও মলিন। বিদেশীদের বহনকারী প্রতিটি গাড়ির স্টিয়ারিং এর সামনে কাঁচের ভেতরে নেপালীরা তাদের জাতীয় পতাকাটি রাখে। যা নেপালী জাতীয়তাবাদের বহি:প্রকাশ। রাম জানালো কাঠমন্ডুর প্রধান সমস্যা যানজট। কিন্তু আমাদের প্রায় ১ ঘণ্টার যাত্রায় গাড়িটি কোন সিগনালেই ৫ মিনিট বেশী থামেনি। এটাকেই যদি রাম যানজট বলে তাহলে সে ঢাকায় গাড়ি চালালে তো হার্টফেল করবে। অবশেষে আমরা পৌঁছলাম পর্যটন এলাকা খ্যাত থামেলের ‘ভাসাইল’ হোটেলে। আমাদের আগেই বেশ কয়েকটি দেশের আইনজীবীগণ এসে পৌঁছে গেছেন হোটেলে। এর মধ্যে জাপান ও ফিলিপাইনের প্রতিনিধি দল সর্ববৃহৎ। সবার কলকাকলিতে ভাসছে ‘ভাসাইল’ হোটেলের লবি। বচন পারদর্শি বাঙালি এতে যোগ দেয়ায় আসর নতুন প্রাণ পেল। পরের দিন বিকেল ৫টায় সম্মেলনের উদ্বোধন। সকালটা নষ্ট না করে আমরা চলে গেলাম কাঠমন্ডুর উপকণ্ঠ নাগরকোটে। টেক্সি প্রতি ২৪০০ নেপালী রুপি। নেপালী রুপির মান বাংলাদেশের টাকার চেয়ে কিছুটা কম। নাগরকোটে পৌঁছাতে ১ ঘণ্টা লাগলো। অনেকটা আমাদের বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে ওঠার মতো। ফিরে এসে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে চলে গেলাম অনুষ্ঠানের ভেন্যু হোটেল ‘মাল্লায়’। প্রধানমন্ত্রী আসছেন কিন্তু নিরাপত্তাবাহিনীর কোন বাড়াবাড়ি চোখে পড়ল না। রাস্তার যানবাহনও কত স্বাভাবিক। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী এলেন। হলরুমে ঢুকার আগে শুধু আমাদের শরীর একবার চেক করা হল। অনুষ্ঠানে ২১টি দেশের অন্তত তিন শতাধিক আইনজীবী যোগ দেন। অনুষ্ঠান শুরু হয় নেপালী জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। শুরুতেই দেশভিত্তিক সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। ইংরেজী অক্ষর অনুসারে অস্ট্রেলিয়ার পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে আমরা বাংলাদেশের সবাই পরিচিত হলাম। আইনজীবীগণের সম্মেলনকে নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। কারণ নেপালের রাজতন্ত্র উচ্ছেদের পর নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার জন্য এ সম্মেলনকে তারা ভাল সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাছাড়া নতুন সরকার দেশগুলোর আন্তরিক সহযোগিতাও চায়। নেপালে রয়েছে ১২৬টি জাতিগোষ্ঠী। এর মধ্যে এক গোষ্ঠী এখনও পুরোপুরি জঙ্গলে থাকে। প্রধানমন্ত্রী জানালেন, নেপালের সংবিধান প্রণয়নের পূর্বে এ বিষয়ে তাদের মতামতও নেয়া হয়েছে। সংবিধান বাস্তবায়ন নিয়ে তারা চিন্তিত। কারণ ভারত এ সংবিধানের বিরোধিতা করছে তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থে। নেপালের উপর ভারতের প্রভাব অত্যন্ত বেশী। প্রণীত সংবিধানে বাধা দিতে ভারত নেপালের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করেছে। নেপালের জনগণ ক্রমেই ভারতের বিরুদ্ধে খেপে যাচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান, অ্যাটর্নী জেনারেল সহ আরও কর্মকর্তাবৃন্দ। প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ বক্তব্য দিলেন। পরবর্তী দুই দিন আমরা কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর সেমিনার করলাম। শেষদিন কাঠমন্ডু ঘোষণার মধ্যে দিয়ে সম্মেলনটি সমাপ্ত হয়। সম্মেলন নিয়ে বিস্তারিত আর লিখলাম না। কারণ কাঠমন্ডু ঘোষণার মাথামুন্ডু খুব সহজ না।
সম্মেলন শেষ করেই আমাদের দলের বেশিরভাগ সদস্য দেশে ফিরে গেলেন। আমরা থেকে যাওয়ায় পরের দিন ভোরে রওয়ানা হলাম নেপালের অ্যাডভান্সড রাজধানী হিসেবে খ্যাত পোখরা শহরে। বাসে করে প্রায় ৮ঘণ্টা ভ্রমণ শেষে আমরা পৌঁছলাম পোখরা শহরে। পথে পাহাড়ের কোল ঘেষে দুইবার যাত্রা বিরতি হল খাওয়া দাওয়ার জন্য। কাঠমন্ডু থেকে পোখরা পুরো জার্নিটাই অসাধারণ। বেশ কিছু পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে হয় গাড়িকে। গাড়ি যখন কোন পাহাড়ের চূড়ায় উঠে তখন অনেক নিচে মেঘ দেখা যায়, আর যখন গাড়ি নিচে নামতে থাকে তখন কোমল মেঘ ধাক্কা দেয় গাড়ির জানালার গ্লাসে। শুধু এ অসাধারণ দৃশ্যটি দেখার জন্য হলেও একবার নেপাল যাওয়া যায়। পোখরা কাঠমন্ডুর তুলনায় অনেক জৌলসপূর্ণ চকচকে শহর। প্রকৃতিও দু’ হাতে ভরিয়ে দিয়েছে এ শহরকে। আমরা হোটেলে ব্যাগ রেখে দ্রুত বেরিয়ে পড়ি কাছেই অবস্থিত লেক সাইডে। অসাধারণ সৌন্দর্য্য। লেকের পেছনে অন্নপূর্ণা-হিমালয় পর্বতমালা। এটিকে অতিক্রম করতে পারলে এভারেস্ট দেখা যেত। তা আপাতত সম্ভব না। সড়ক যোগাযোগ নেই। হয় কাঠমন্ডু থেকে প্লেনে গিয়ে শুধু উপরে চক্কর দিয়ে আসা যায়, নয়তো হেঁটে যেতে নাকি ৭দিন লাগবে। পোখরায় আরো কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। সময়ের অভাবে আমরা তেমন আর ঘুরতে পারলাম না। পোখরায় পশ্চিমা পর্যটকরা রীতিমতো গিজগিজ করছে। তাও নাকি এটা অফ সিজন। এ পর্যটকরা শহরের পরিবেশটাও নিজেদের মতো তৈরী করে নিয়েছে। তাদের ‘হালকা’ চলনে, বলনে ও পড়নে প্রতি মুহূর্তে আমাদের রোজা ‘হালকা’ হওয়ায় উপক্রম। পানির চেয়ে ‘পানীয়’র মূল্য কম। আর আমরা পানির কাছেই যেতে পারছি না। আর……..।
হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাদের জানালেন, নেপালের অর্থনীতি টিকে আছে এই বিদেশী পর্যটকদের কল্যাণে। নেপালীরা ভাত খায়। কিন্তু অর্ধেক দেশ ঘুরেও আমরা ধান ফলানোর মতো তেমন জায়গা দেখলাম না। নেপালে প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। মিল ফ্যাক্টরী নেই। সব কিছুই আমদানী নির্ভর। এ জন্য পর্যটকরা তাদের কাছে দেবতার মতো। পর্যটকদের তারা সর্বোচ্চ সহায়তা করছে। দেশে চুরি, হাইজ্যাকিং নেই। অনেক রাতে পর্যটকদের ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। দরিদ্র দেশ, কিন্তু এতো দিনে কোন ভিক্ষুক দেখলাম না। ব্যবসা বাণিজ্যে চালায় পরিবারের সকলে মিলে। যে হোটেলেই খেতে গেছি, দেখা গেল হোটেল সামলাচ্ছেন স্ত্রী। কিছুক্ষণ পর স্বামী বাজার নিয়ে ফিরলেন। কোন আইটেম কম পড়লে তাদের ছেলে বা মেয়ে গিয়ে নিয়ে আসে। সবজিই নেপালের মানুষ বেশী খায় বলে মনে হলো। দাম আমাদের দেশের মতোই। এই বিদেশ বিভূইয়ে পরিচিত সবজি সীম, পটল, মূলা দেখে নিজের আত্মীয় স্বজনের মতোই আপনজন বলে মনে হলো। বাংলাদেশের প্রাণ কোম্পানীর কিছু আইটেম যেমন চিপস, ফ্রুটিকা দোকানে দোকানে দেখে মনটা ভরে গেল। বাঙালিকেও তারা বেশ সম্মান করে বলে মনে হলো। পরের দিন ফিরে আসলাম কাঠমন্ডু। সন্ধ্যায় উঁকি দিলাম কিছু দোকানে। সবকিছুই আমদানীকৃত পণ্য বলে মূল্য অত্যন্ত চড়া। বিখ্যাত নেপালী টুপি খুঁজলে দোকানদার জানালেন এ গুলোকে তারা বলেন ঢাকাইয়া টুপি। ঢাকা থেকে আমদানী হয় বলে নাকি এটির এ নামকরণ। এ নাম শুনে কিনতে আরও বেশী প্রফুল্ল হলাম।
অবশেষে শুরু হল ফিরে আসার পালা। আমাদের দলনেতার সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের যোগাযোগ হলে, তিনি আমাদের দূতাবাসে আমন্ত্রণ জানান। তবে আমাদের দুপুর ১টার মধ্যে বিমানবন্দরে রিপোর্ট করতে হয় বলে দূতাবাসে যাওয়া হয়নি। বাংলাদেশের স্থানীয় সময়ের চেয়ে নেপালের সময় ১৫ মিনিট এগিয়ে। নেপালে সর্বত্রই তাদের দর্শনীয় স্থান সমূহের সুন্দর সুন্দর ছবি টাঙিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। আমরা ঢাকা পৌঁছার পর কোথাও আমাদের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত বা সুন্দরবনের ছবি না দেখে বন্ধু অ্যাডভোকেট মাসুক দুঃখ করে বলল,‘ভাই, আমরা কবে আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বিশ্বময় তুলে ধরব?
লেখক: আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও সহকারী সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর।