- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভ্রমণ- দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি

অ্যাড. এনাম আহমদ
(৫ম পর্ব)

শারজাহ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৩য় বৃহত্তম শহর। দেশটির সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসাবে খ্যাত এ শহরে রয়েছে প্রচুর ইন্ডাস্ট্রি। ইন্ডাস্ট্রিগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হওয়ায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেনি। এজন্য অধিক ইন্ডাস্ট্রি পরিবেষ্টিত হওয়া সত্বেও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা শারজাহকে স্বাস্থ্যকর সিটি হিসাবে ঘোষণা করেছে। আমি ভুল করে কাতারের বাসে উঠে পড়লেও গুরুতর কোন সমস্যা হয়নি। এমনকি আমার বহু কাঙ্খিত দুবাইয়ের পুলিশও দেখতে হয়নি। বড় কর্তৃপক্ষ আমার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিপূর্ণ ছিলেন। দুবাইয়ে জঙ্গী বা অন্যান্য সন্ত্রাসী কর্মকা- নাই বললেই চলে। এজন্য সামান্য ঘটনায় কেউ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে না বা অস্থিরতা সৃষ্টি করে না। তাছাড়া এ বাস সরাসরি কাতার যায় না। সীমান্তে অত্যন্ত সুন্দর হাত্তা নামক স্থানে সবাইকে নেমে যেতে হয়। তারপর সেখানে হয় কাতারের ইমিগ্রেশন। আর আমার ভুল বাস দুবাই ছেড়ে খুব বেশী অগ্রসরও হয়নি। পারিপাশির্^ক পরিস্থিতি আসামীর পক্ষে থাকায় আমার জন্য সুবিধাজনক একটি বাসস্টপে আমাকে নামিয়ে দেয়া হয়। আমি বাস ধরে সেখান থেকে শারজাহ পৌঁছাতে পারব কিনা, সে বিষয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। দুবাইয়ের সামগ্রিক ব্যবস্থা অত্যন্ত পর্যটক বান্ধব বলে প্রতিয়মান হলো। পুরো বিষয়টি আমার জন্য শাপে বর হয়েছিল। আমার ভুলই নতুন জায়গা দেখার মূল হলো। এবার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শারজার সঠিক বাসে উঠলাম। ওয়েস্টার কার্ড পাঞ্চ করে বাসের উপরের তলায় আসন নিলাম। যাত্রীরা বেশীরভাগই উপমহাদেশীয়। আমার কাছাকাছি দু’জন ভারতীয় তরুণ। তাদেরকে শারজাহ স্টেডিয়াম কিভাবে যাব জিজ্ঞেস করায় তারা পরস্পর মুখ দেখাদেখি করলেন। নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ আলোচনা করে স্টেডিয়াম কোথায় তা না জানায় দুঃখ প্রকাশ করলেন। কিছুটা বিচলিত হলাম! ভারতীয়রা ক্রিকেট স্টেডিয়াম চিনে না, তো কে চিনবে? অবশ্য এ তরুণরা শারজাহ স্টেডিয়ামের নব্বই দশকের উন্মাদনার সময়কালে পৃথিবীতে না জন্মানোয় স্টেডিয়াম সম্পর্কে ধারণা করতে পারছে না। যা হোক যাত্রা পথে মনোযোগী হলাম। রাস্তার দু’পাশে নিচু মাঝারি ভবন। সব ভবনের সাইনবোর্ড ইংরেজিতে লিখা। শারজা পৌঁছা পর্যন্ত পুরোটাই শহরাঞ্চল। বিস্তীর্ণ মরুভূমি বা কোন গ্রাম চোখে পড়ল না। ঘণ্টাখানেক অতিক্রান্ত হওয়ার পর ভবনগুলোর উচ্চতা বাড়তে লাগলো এবং বাসের গতিবেগ কমতে থাকলো। সাইনবোর্ডগুলো জানান দিলো শারজাহ পৌঁছে গেছি। এরমধ্যে দৃষ্টিসীমার মধ্যে এলো কিং ফয়সল মসজিদ। সৌদি বাদশার স্মৃতি রক্ষার্থে এটি শারজার একটি দর্শনীয় স্থাপনা। কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি অঞ্চলটিতে উঁচু ভবনের বাড়াবাড়ি নেই। দৃষ্টিসীমা অবারিত। কিছু জায়গায় কৃত্রিমভাবে চাষ করা হয়েছে সবুজ ঘাষ। আরবে এই প্রথম সবুজ দর্শন! স্ট্যান্ডে বাস থামার পর পারিপাশির্^কতা পর্যবেক্ষণ করলাম। কাছাকাছি খোলা জায়গায় বসার জন্য চেয়ার রাখা। কিছু স্ট্যান্ড ফ্যান চক্রাকারে রাখা। আরব মরুর উত্তাপ তাপদাহকে বশে রাখার একটি মধ্যপ্রাচ্যিয় প্রচেষ্টা। শারজা কোথায় কোথায় ঘুরব তার একটি দীর্ঘ তালিকা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু সময় কাতার রোডে কাটা যাওয়ায় শুধু শারজাহ স্টেডিয়াম ও আর দুই তিনটি দর্শনীয় স্থাপনা দেখে বিদায় নেয়ার পরিকল্পনা করলাম। সন্ধ্যা ৬টার পর শারজা থেকে দুবাইয়ের বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায় বলে আমার এই তাড়াহুড়া। আবার উঠতে হলো দ্বিতল সিটি বাসে। শারজা শহরের ভেতরে কিছুক্ষণ পরপর বাস জ্যামে পড়ছে। উন্নত দেশের এ অনুন্নত ব্যবস্থাপনায় আমি যার পর নাই আনন্দিত। জ্যাম নেই, এমন কোন দেশ নেই। এ নিয়ে শুধু শুধু বাংলাদেশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। শারজাতে মেট্রো রেল কোথাও চোখে পড়লো না, এজন্যই সম্ভবত জ্যাম বেশী। এক পর্যায়ে পৌঁছে গেলাম ঐতিহাসিক শারজাহ স্টেডিয়ামে। দুইশত ছত্রিশটি এক দিনের ম্যাচ সম্পন্ন হওয়া এটি পৃথিবীর একমাত্র স্টেডিয়াম। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টেডিয়ামটি উপমহাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের হৃদয়ের মনিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে। ’৮৭-৮৮ সালে আমাদের কৈশোর অতিক্রমকালীন ভারতের সুনীল গাভাস্কার, আজহার উদ্দিনদের সাথে পাকিস্তানের ইমরান খান জাবেদ মিয়াদাঁদদের তুমুল লড়াই দেখার প্রতীক্ষায় আমরা থাকতাম। নৈসর্গিক ’৯০ সালের পর থেকে লড়াইয়ে নতুন মাত্রা আনেন ভারতের কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলী ও পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ার, ওয়াকার ইউনুস প্রমুখ। তখন এশিয়া কাপ, শারজাহ কাপ সহ বিভিন্ন নামে এই মাঠে টুর্নামেন্ট চলতে থাকতো। সুনামগঞ্জে তখন ডিশ এন্টেনার সংস্কৃতি সবেমাত্র শুরু হয়েছে। এবং বিত্তশালী ভাগ্যবান কেউ কেউ তাদের বাসাবাড়িতে এন্টেনা স্থাপনও করে ফেলেছেন। ডিশ লাইন ছাড়া এসব খেলা দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। শহরে তখন এখনকার মতো নির্দিষ্ট কোনো স্থান থেকে ডিশ লাইন সংযোগ দেয়া হতো না। আর ক্রিকেট যেহেতু সারা দিনের খেলা এবং দেখতেও হয় সারা দিনব্যাপী, তাই কোনো বাসায় সারাদিন ধরে খেলা দেখলে নানাবিধ সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সর্বোপরি অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। আমরা কৈশোর উত্তীর্ণ কিছু সদ্য তরুণ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে কিছু বাসায় খেলা দেখতাম। সেগুলোর মধ্যে সুনামগঞ্জের কিংবদন্তি অ্যাড. হুমায়ুন কবির জাহানুর, সিটি ফার্মেসির কফিল ভাই ও অ্যাড. অলক বাপ্পা সাহেবের বাসা উল্লেখযোগ্য। বিশেষত যেদিন ভারত পাকিস্তানের খেলা থাকতো, সে দিন ঐ বাসাগুলোতে উৎসব উৎসব ভাব থাকতো। এ মাঠটি সরাসরি চোখে দেখে সত্যিকার অর্থে ফিরে যাই কৈশোরে। বাংলাদেশ দলও তাদের প্রথম দিকে কিছু একদিনের ম্যাচ খেলে এ স্টেডিয়ামে। এ জন্যই এই মাঠটি আমাদের জন্য আলাদা আবেগের। স্টেডিয়ামকে পেছনে ফেলে আবার চলতে শুরু করলাম। শারজাকে বলা হয় আরব আমিরাতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। শারজায় রয়েছে আর্ট মিউজিয়াম, সায়েন্স মিউজিয়াম, মুসলিম স্থাপত্য কলা, অনেক হেরিটেজ ভবন প্রভৃতি। সময়ের অভাবেই এর কোনটিতেই প্রবেশ করা গেলো না। শারজার জাতীয় উদ্যানটি অনেক জায়গা নিয়ে পরিবেষ্টিত। ভেতরে ঢুকতে না পেরে এর পাশ দিয়ে যেতে যেতে যতটুকু দৃষ্টিগোচর হয়, ততটুকুর স্মৃতি নিয়েই ফিরলাম। দূর থেকে দেখলাম কৃত্রিম হ্রদ সৃষ্টি করে তার পাশে লন্ডন আইয়ের আদলে চমৎকার নাগরদোলা ঘুরছে দর্শনার্থিদের নিয়ে। তাড়াহুড়া করে শেষ মুহূর্তে এসে দুবাইগামী বাসটি ধরলাম। ‘বাসস্ট্যান্ডের মানুষ বাস ফেল করে’। জনশ্রুত এই ডাকের কথাটি ভুল প্রমাণ করলাম। দেড় ঘন্টার মধ্যে দুবাইয়ের ইউনিয়ন স্টেশনে ফিরলাম। শুধু শুধু রুমে ফিরে না গিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে ঘোরার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রচুর ফাস্ট ফুড, চকলেট, খেজুর এবং পর্যটকদের ব্যবহার উপযোগী কিছু সামগ্রীর দোকান। লোভে পড়ে বেশ কিছু চকলেট ও খেজুর কিনে সাথে থাকা সব দিনার শেষ করে ফেললাম। ডরমেটরীতে ফেরার একমাত্র ভরসা তখন ওয়েস্টার কার্ড। বাসস্ট্যান্ডে যখন পৌঁছালাম, দেখা গেল সিটি বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে। ভরসা তখন ট্যাক্সি। কাক্সিক্ষত ট্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারের সঙ্গে যথারীতি গল্প জুড়ে দিলাম। এ ড্রাইভার সাহেব কেনিয়ার নাগরিক। কিছুটা গম্ভীর টাইপের। কেনিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম, তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে জানতে চাইলাম। আলাপে আলাপে আধঘন্টার মধ্যে ডরমেটরির সামনে এসে গেলাম। মিটারে ভাড়া উঠল ২৮ দিনার। ভাড়া পরিশোধের জন্য ওয়েস্টার কার্ডটি বের করে দিলাম। তিনি আকাশ থেকে পড়লেন! জানালেন এই কার্ড দিয়ে শুধু ট্রেন ও সিটি বাসের ভাড়া পরিশোধ করা যায়, ট্যাক্সির না। তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে দ্রুত রুমে গিয়ে দেখি রুম বন্ধ, ছোট ভাই জুসেফ ফিরবে অনেক রাতে। আমি নিরুপায় হয়ে আস্তে আস্তে ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে ফিরছি। কিছুক্ষণ আগে ড্রাইভারের জীবন কাহিনী শুনতে চেয়েছিলাম। এবার সম্ভবত তাকে শোনাতে হবে আমার জীবনের কাহিনী………..(চলবে)

  • [১]