অ্যাড. এনাম আহমদ
(৬ষ্ঠ পর্ব)
দুবাইয়ে শুক্রবার পেলাম এই প্রথম। ছোট ভাই জুসেফ প্রস্তুতি নিল আমাকে নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াবে বলে। দীর্ঘ এক যুগ যাবৎ সে দুবাই অবস্থান করছে। প্রতিটি অলিগলি তার চেনা। এমন কাউকে নিয়ে নতুন স্থানে ঘুরার মজাই আলাদা। এদিকে গতদিনের ট্যাক্সি ভাড়া সংক্রান্ত সমস্যাটির সমাধানও করে দেয় জুসেফ। ডরমেটরির রিসিপশনে জুসেফের নাম্বার থাকায়, তাকে ফোন করে দুর্ঘটনাটি জানালে সে ডরমেটরিতে অবস্থান করা এক বন্ধুর মাধ্যমে এর সমাধান করে দেয়। সকাল বেলা নাস্তা খেয়েই আমরা বের হয়ে পড়ি জুসেফের প্রাইভেট কারে। গাড়িটি সে নিজেই চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে গাড়ির স্টিয়ারিং থাকে বামদিকে। বাংলাদেশে গাড়ির যেদিকে ড্রাইভার বসেন, সেদিকে যাত্রী হিসেবে বসে বড়ই অস্বস্তিতে পড়লাম। কেবল মনে হতে থাকলো নিজেই গাড়িটি চালাচ্ছি। এতোদিন দুবাই অবস্থান করলেও আজ থেকে শুরু হলো প্রকৃত দুবাই দর্শন। গাড়ি দ্রুত ছুটে চলেছে। রাস্তার পাশে ধূসর বালি চিকচিক করছে। তারপরেও রাস্তায় কোন ধুলো নেই। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন শহর। আবাসিক এলাকাগুলোতে কোথাও একক বিশাল বাড়ি আবার কোথাও আমাদের পূর্বেকার গ্রামের মতো হাটিবাঁধা বাড়ি। সবগুলোই অত্যন্ত অভিজাত। গত কিছুদিন একা একা ঘুরে মনের মধ্যে যে প্রশ্নের উদ্রেগ হয়েছিল, জুসেফের সাথে বের হয়ে এই সব প্রশ্নবাণে তাকে জর্জরিত করলাম। রাস্তাঘাটে আরবের মানুষজনের উপস্থিতি এত কম থাকার কারণ হিসেবে জুসেফ জানালো, আমিরাতে প্রায় এককোটি জনসংখ্যার মধ্যে পচিশ লক্ষই ভারতীয়। পাকিস্তানী অন্তত: ১২/১৩ লক্ষ এবং বাঙালি ৮/১০ লক্ষ। এছাড়া আফ্রিকার প্রচুর মানুষ অবস্থান করছে এখানে। স্থানীয় জনসংখ্যা মাত্র ১২/১৩ লক্ষ। তাদের অনেকে ইউরোপ আমেরিকায় পড়ালেখা করে। যারা দেশে থাকে তারা বিশেষ সুবিধা পায়। চাকুরী ক্ষেত্রে অন্যান্যদের তুলনায় স্থানীয়দের বেতন বেশী। যারা চাকরী বাকরীর ধার ধারেনা, তাদেরও রাষ্ট্র থেকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়। তাদের বিশেষ কিছু করতেও হয় না। এজন্য শহরে এ প্রজাতিকে বিশেষ দেখা যায় না। কয়েকদিন অবস্থান করার পরও পুলিশ না দেখা প্রসঙ্গে সে জানালো,
দুবাই প্রায় অপরাধ শূন্য শহর। সিসি ক্যামেরাসহ নানা মাধ্যমে পুলিশের বিশেষ নজরদারি থাকায় প্রকাশ্যে পুলিশকে অযথা দৌড়ঝাঁপ করতে হয় না। এছাড়া একটু এদিক-ওদিক হলেই এখানে বড় মাপের জরিমানা গুনতে হয়। এজন্য কেউ এখানে আইন ভাঙ্গতে সাহস করে না। প্রচ- গরমে কোন ভবনের বাইরে এসি’র বক্স না থাকা প্রসঙ্গে সে জানায়, এখানকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যাধুনিক। যা ভবনগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই রুমের বাইরে আলাদা বক্সের প্রয়োজন হয় না। এবিষয়ে আমেরিকার অরিজোনাতে কিছুদিন কাটিয়ে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সিনিয়র আইনজীবী বজলুল মজিদ খসরুও অরিজোনায় ঐ ধরনের ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেন। সড়ক ডিভাইডারে মাটি ফেলে ছোট ছোট গাছ লাগানো আছে। নিরিহ এই গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছে তারা। মাটির সমান্তরালে পানির পাইপ টানা। পাইপটি অন্তত দশফুট পরপর ছিদ্র করা। তা দিয়ে ছোট ছোট ফোয়ারা আকারে অনবরত পানি বের হয়ে তীব্র দাবদাহ থেকে গাছগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। এরমধ্যে দেখলাম দুটি শালিক পাখি এই ফোয়ারার মধ্যে গোসল সেরে নিচ্ছে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। শহরের মধ্যে কিছু স্থানে কয়েকটি বেড়ালকে ঘুরাঘুরি করতে দেখলাম। এগুলোর স্বাস্থ্য আমিরাতের সুদৃশ্য অর্থনীতির মতোই দৃঢ়। ঝলমলে অভিজাত ভবনগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝলমল করছে স্বচ্ছ নীল আকাশ। সম্ভবত পরিচ্ছন্ন শহরের আকাশও পরিচ্ছন্ন থাকে। প্রচুর ফ্লাইওভার, বহুতল ভবন এখনও নির্মাণাধীন। শহরে মসজিদের সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে মনে হলো। সম্ভবত প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। তবে যতগুলি মসজিদ চোখে পড়েছে সবগুলোই বিশাল এবং অপূর্ব স্থাপত্য কলা সম্পন্ন। শহরে প্রচুর জাতীয় পতাকা উড়তে দেখলাম। এমনকি কিছু বাসা বাড়ির জানালা থেকেও তাদের জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হতে দেখলাম। সেটি তাদের তীব্র জাতীয়তাবোধ, না-কি সাময়িক উত্তেজনা বুঝতে পারলাম না। এরমধ্যে জুম্মার আযান হলো। একটিমাত্র মসজিদের আযান কানে এলো। ঘুরতে ঘুরতে নামাজ শুরুর প্রারম্ভে একটি মসজিদ খোঁজে বের করলাম। প্রচুর মুসল্লি। নামাজ পড়লাম ঢাকাইয়া কায়দায় রাস্তার ফুটপাতে। ইমাম সাহের পরিচিত ছোট দুটি সুরা নামাজে পড়লেন। দীর্ঘ কোন সুরা পড়ে বাহাদুরি করলেন না। সেখান থেকে গেলাম পারস্য সাগরের তীরবর্তী জুমেইরা বীচে। জুসেফ গাড়ি পার্ক করে পার্কিং স্লটটি দেখল। ছুটির দিন থাকায় গাড়ি পার্কিং ছিল ফ্রি। কিছু দিরহাম বেঁচে যাওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। রাস্তা থেকে আধা কিলোমিটার দূরত্বে সমুদ্রে বিচের বালিতে পা রেখেই শিহরিত হলাম। সামনে ঐতিহাসিক বুরজ আল আরব। সমুদ্র তীর থেকে ২৮০ মিটার ভেতরে কৃত্রিম একটি দ্বীপের উপর এ ভবন তৈরি করা হয়েছে। পুরনো পালতোলা জাহাজের অনুকরণে বানানো ভবনটি আরবের ঐতিহ্য বহন করে। ভবনটির ছবি দেখলেই যে কেউ বলতে পারেন, এটি দুবাই। এটি সাত তারকা বিশিষ্ট হোটেল। কোন কোন সুবিধা থাকলে একটি হোটেল সাত তারা বিশিষ্ট হয়, সে সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। এর ভেতরের কারুকার্যে প্রচুর সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। এটি পৃথিবীর সপ্তম উঁচু ভবন। এ ভবনের ছাদে নির্মাণ করা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু লাল টেনিস গ্রাউন্ড। আর এদিকে সাগর একেবারে শান্ত। আমাদের কক্সবাজারের মতো তর্জন-গর্জন নেই। তবে পর্যটকরা সবাই রীতিমতো অশান্ত। পশ্চিমা পর্যটকরা উষ্ণ বিচ পাওয়ায় তাদের এই মুখরতা। তাদের এই উদারতা আমাদের প্রাচ্য দেশীয় চোখে মোটেও অভ্যস্ত নয় বলে এক পর্যায়ে চোখ বন্ধ করে সামনে এগুতে থাকলাম। আর তাতেই বাধলো বিপত্তি। দ্রুত হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ কিসে যেনো পা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হোচট খেয়ে বিচে পড়ে গেলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় হন্তদন্ত হয়ে চোখ মেলে যা দেখলাম তাতে আমার বঙ্গদেশীয় পা আর প্রাচ্যদেশীয় মন দুই-ই অসার হয়ে গেল…(চলবে)