- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভ্রমণ- দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি

অ্যাড. এনাম আহমদ
(৭ম পর্ব)

আরব আমিরাতে প্রসিদ্ধ সমুদ্র সৈকতগুলোর মধ্যে জমুইরা বিচ অন্যতম। দুবাইয়ের অন্যতম প্রতীক পালতোলা জাহাজের আকৃতির ভবন বুরজ আল আরব এই বিচে থাকায় এটি বিখ্যাত। অনিবার্য কারণে চোখ বন্ধ করে বিচে হাঁটতে গিয়ে একজন লোকের ঘাড়ে হোছট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। তিনি বালির ভেতরে পুরো শরীর ঢুকিয়ে শুধু গলাটা বের করে রেখেছিলেন। আর তাতেই আমি হোছট খাই। আমার এই অসতর্কতার জন্য তিনি বেশ ব্যাথা পেলেও কোন প্রতিকার নিতে পারেননি। কারণ বালি থেকে রাতারাতি বের হওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই সুযোগে বিচ থেকে আমিও কেটে পড়ি। ডরমেটরিতে লাঞ্চ সারতে এসে মুখোমুখি হই এক এলাহি কারবারের। পৃথিবীর সব মহাদেশের লোকজন যেহেতু এখানে খাওয়া দাওয়া করে এজন্য সবার চাহিদার কথা মাথায় রেখে অন্তত একশত পদের খাবার সাজানো হয়েছে। বুফে সিস্টেমে তা পরিবেশিত হচ্ছে। প্লেইট হাতে নিয়ে পরিবেশিত সব খাবারের সামনে উঁকি দিয়ে এক পর্যায়ে আঁতকে উঠলাম। সালাদ কর্ণারে বিভিন্ন নাম জানা অজানা সালাদের মধ্যে কুচিকুচি করে পেঁয়াজ কাটা! বাংলাদেশে পেয়াজের কেজি তখন তিনশত টাকা। জানা গেল দুবাইয়ে পেয়াজের কেজি আমাদের টাকায় পঁয়তাল্লিশ টাকা। উন্নয়নের জোয়ারে যে বাংলাদেশ! খাবার শেষ করে বেড়িয়ে পড়লাম আবারও পথে প্রান্তরে। এরমধ্যে ছোট ভাই জুসেফ তার প্রাইভেট কারে পেট্রোল নিল। প্রতি লিটার বাংলাদেশী টাকায় পঞ্চাশ টাকা।তাইতো বলে আরবে পেট্রোলের চেয়ে পানির দাম বেশী। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য জুসেফ যেখানে কাজ করে সেই রিসোর্ট আটলান্টিস দ্যা পামে। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও ব্যয়বহুল রিসোর্ট। পারস্য উপসাগরে বাঁধ দিয়ে পাম গাছ আকৃতির যে কৃত্রিম দ্বীপ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই দ্বীপের শেষ প্রান্তে এই রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়। রিসোর্টটির সামনে পেছনে দুদিকেই সাগর। সে এক অভূতপূর্ণ দৃশ্য। এতে মোট রুমের সংখ্যা পনেরশতটি। পৃথিবীর বিরাশিটি দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করে এখানে। মূল স্থাপনার সাথে রয়েছে অত্যাধুনিক শপিং কমপ্লেক্স, ওয়াটার পার্ক, বিশাল অ্যাকুরিয়াম। অ্যাকুরিয়ামের আকৃতি এতো বিশাল যে, বেশ কিছু মানুষ অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে সেখানে নেমে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে! সেখানে রয়েছে পৃথিবীর নামকরা চব্বিশটি রেস্টুরেন্টের শাখা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইংল্যান্ডের গডেনরামজি, ইটালির জর্জেও লুকাটেনি, স্বটল্যান্ডের রায়মন্ড প্রভৃতি। গাড়ি নিয়েই পৌঁছে যাওয়া গেল পাম দ্বীপে। রাস্তার দুপাশে পৃথিবীর ধনকুবের মানুষজনদের বাড়ি। এরমধ্যে একটি বাড়ি দেখিয়ে জুসেফ জানালো সেটি বলিউড তারকা শাহরুখ খানের বাড়ি। রিসোর্টটির তৃতীয় তলা থেকে উপরের পুরোটাই আবাসিক। সেখানে সাধারণের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নেই। জুসেফও অনিশ্চয়তায় ছিল আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাবে কি-না। এমনই ভাসা ভাসা আশা নিয়ে আমরা রিসোর্টটির রিসিপশনে পৌঁছলাম। জুসেফ সেখানে অনুমতি আদায়ের জন্য লড়তে লাগলো। আমি নিরাপদ দূরত্বে থেকে কোন ব্যাটসম্যান যেভাবে থার্ড আম্পায়ারের রান আউটের সিদ্ধান্ত জানার জন্য ব্যাটে ভরদিয়ে চরম উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করে, ভবনের পিলারে ভর দিয়ে আমিও সেভাবে অপেক্ষায় থাকলাম। সবুজ বাতি জ¦লে উঠল, হ্যাঁ, ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পেলাম। নাতিশীতোষ্ণ ¯িœগ্ধ বিকেলে সবকিছুকেই ¯িœগ্ধ মনে হলো। এক বিপন্ন বিস্ময় নিয়ে চারিদিক অবলোকন করলাম। নিয়মিত চর্চার অভাবে অসহ্য সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায় না, লিখে বুঝানোও যায় না। সম্ভবত উচিতও না। এক ঘোর লাগা সন্ধ্যায় মোহাবিষ্ট হয়ে ডরমেটরিতে ফিরে এলাম। পরেরদিন শনিবার সকাল বেলা গেলাম দুবাই স্টেডিয়ামে। এ স্টেডিয়ামটি ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পঁচিশ হাজার দর্শক ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়ামটি দুবাই স্পোর্টস সিটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসাবে পরিচিত। পাকিস্তান এ মাঠটিকে হোম গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করেছে প্রায় দশ বছর। মূল স্টেডিয়ামের বাইরে আমাদের মিরপুর স্টেডিয়ামের মতো প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ফুটবল ও গলফ মাঠ। পাশেই খেলোয়াড়দের থাকার জন্য বিশাল এক আবাসিক হোটেল। এক কথায় এটি একটি বিশাল ক্রীড়া কমপ্লেক্স। এশিয়া কাপে এ মাঠেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল শ্রীলংকাকে পরাজিত করেছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল আইসিসির সদর দপ্তর এ কমপ্লেক্সেও পাশেই অবস্থিত। এখান থেকেই বিশ^ ক্রিকেটকে পরিচালনা করে ক্রিকেটের এই প্রধান সংস্থাটি। ফিরে এসে মধ্যাহ্ন ভোজনের পর ছোটভাই জুসেফের কাছ থেকে বিদায় নেই। পরবর্তী সপ্তাহ আমি থাকবো হোটেল রউভ ইন্টারন্যাশনালে। সেখানে আমার সঙ্গে যোগ দেবেন ইংল্যান্ড থেকে আসা আমার মূল দলটি। যাদের জন্যই মূলত আমার দুবাই আসা। হোটেলের উদ্দেশ্যে অনেকগুলো ব্যাগ নিয়ে মেট্রো স্টেশনে পৌঁছলাম। অনেকগুলো ব্যাগ একা টানতে পারছিনা দেখে অনেকে এগিয়ে এসে সাহায্য করলেন। রউভ হোটেলে পৌঁছে আগে থেকে কনফার্ম করা তিনটি রুমের দখল নিয়ে নেই। রাত এগারোটায় দুবাই এয়ারপোর্টে যাই আমার পার্টিকে রিসিভ করতে। এর কাছাকাছি সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এয়ারপোর্টে অবতরণ করার কথা দুবাই এয়ার শো ২০১৯ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য। তিনি দুবাইয়ের শাংরিলা হোটেলে অবস্থান করবেন বলে জানা যায়। সতের নভেম্বর থেকে একুশ নভেম্বর পর্যন্ত দুবাইয়ের আকাশে এয়ারশো অনুষ্ঠিত হবে। আমি কিছুটা আতঙ্কিত। কারণ এয়াপোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন থাকবে? ঢুকতে পারর কি-না। এতো বড় এয়ারপোর্টে আমার পার্টিকে কোথায় খুঁজে পাব। তাদেরকে চমকে দেয়ার জন্য আরবি পোশাক পড়ে ফুলের তোড়া নিয়ে এয়ারপোর্টে হাজির হলাম। এয়ারপোর্টে ঢুকলাম, কোন নিরাপত্তাকর্মী নেই। কী আশ্চর্য্য! আমিরাতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ কর্মীদের তোড়া হাতে ছুটাছুটি করতে দেখলাম। তাদের কাছ থেকেই খবর পেলাম, প্রধানমন্ত্রী ভিআইপি গেট দিয়ে বের হয়ে গেছেন। আমি অপেক্ষায় থাকলাম নিকটাত্মীয় বাংলাদেশী বংশদ্ভোত ব্রিটিশ রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালিক, উনার সহধর্মিনী সালেহা শিরীন, ইংল্যান্ডের সুনামধন্য চার্টার একাউনটেন্ট মোনাবিল হাসান, যার একাধিক অফিস রয়েছে লন্ডনের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যিক এলাকা কেনরি ওয়ারর্ফ, টাওয়ার ব্রীজ প্রভৃতি স্থানে এবং লন্ডনের ওয়েলফেয়ারকর্মী নাইসা তাসনিমের জন্য। কিন্তু তাদের প্লেন পৌছালো অনেক বিলম্বে। আমি অপেক্ষা করতে করতে এক পর্যায়ে চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়লাম। আর ঠিক তখনই তারা আমাকে অতিক্রম করে গেলেন। আমার গায়ে ঐতিহ্যবাহী আরবি পোশাক থাকায় তারা আমাকে চিনতে পারেননি!…..(চলবে)

  • [১]