এনাম আহমেদ
(৫ম পর্ব)
জালাল ভাই আমাদের দুবাই বিমানবন্দরের ৫নং গেইট সংলগ্ন আসনে সবাইকে বসতে বলেন। কারণ এই গেইট দিয়ে বের হয়েই আমাদের মস্কোগামী বিমানে উঠার কথা। দুবাই এ তখন স্থানীয় সময় রাত ১টা। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে দুপুর ১টা। শপিং মলের, রেস্টুরেন্টের সব কর্মকর্তাদের মধ্যে চাঙ্গা ভাব। আর আমরা যারা মাত্রই এসে পৌঁছলাম, নতুন দেশে আসার আনন্দে তো আমরা সব সময়ই চাঙ্গা। সবার মধ্যেই জমজমাট ভাব। আমাদের মোবাইলে সময় দেখাচ্ছে রাত ৩টা। দুবাইয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি রাত ১টা হিসেবে। তার মানে আমাদের জীবনে ২ ঘন্টা যোগ হলো। আমাদের ক্ষুদ্র জীবনে অতিরিক্ত দু’ঘন্টা যোগ হওয়ায় সবাই দারুণ উচ্ছাসিত। যেহেতু আমাদের যাত্রা ক্রমশ: পশ্চিমমুখী, তাই মস্কো পৌঁছামাত্র আমরা এভাবে আরও কয়েক ঘন্টা সময় জীবনের ঝুলিতে করায়ত্ব করতে পারবো বলে আমাদের বিশ্বাস। জীবনে অনেক সময় নষ্ট করার পর পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে বলে এবং আমরা পশ্চিম দিকে যাচ্ছি বলে এই কয়ক ঘন্টা সময় আমাদের সঞ্চয়। দুবাই বিমানবন্দরে ঘাঁটি গেড়ে আমরা প্রথমে খুঁজতে থাকলাম মোবাইল চার্জ দেয়ার সরঞ্জাম। জার্নিতে অন্তত: কয়েক হাজার ছবি তুলতে নিজেদের চার্জ না গেলেও মোবাইলের চার্জ চলে গেল। এর পরেই আমরা দৌড়ালাম ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমের চিহ্ন দেখে দেখে বিভিন্ন গ্রুপে আমরা অগ্রসর হলাম। কেউ কেউ চিহ্ন না বুঝে নিশ্চিন্ন হয়ে গেল। এক পর্যায়ে আবিস্কার করলাম সারি সারি বেসিন। তার উপর পাইপ লাগানো কিন্তু পানি ছাড়ার জন্য কোন নব খোঁজে পাওয়া গেল না। উপর-নীচ সব দিকেই খুঁজলাম, কোন সুইচ খুঁজে না পেয়ে হাতড়াতে থামলাম এক যুগ আগের স্মৃতি। ভাসা ভাসা আশা নিয়ে হাত রাখলাম পাইপের নিচে। সাথে সাথে পানি পড়তে শুরু করল। হাত সরিয়ে নিলে পানি বন্ধ। পানির অপচয় রোধ করার জন্য চমৎকার ব্যবস্থা। সেনসর প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই আধুনিক ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করেছে। ইষদোষ্ণ পানি দিয়ে হাত মুখ ধৌত করায় আমাদের মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। ফ্রেস হয়ে ঘাঁটিতে ফিরে এসে আসল টান অনুভব করলাম। “জীবন আসলে বাঁধা পাকস্থলীতে”, কবির সুমনের বিখ্যাত গানের এই লাইনটি ঘুরে ফিরে সত্য হিসেবে আবির্ভূত হল। সমৃদ্ধ ও জৌলুসপূর্ণ বিমানবন্দর আমাদের মন ভরাতে পারল না, পেট ভরা না থাকার কারণে। আমরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে খেতে গেলাম। উপমহাদেশীয় রুচির খাবারের দোকান তিনটি। ম্যাগডোনালস, কে.এফ.সি ও একটি ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত খাবারের দোকান। যার যেটিতে পছন্দ আমরা সেভাবেই খেলাম। সিলেটের কয়েকজনকে নিয়ে গ্রুপ গঠন করে আমরা সাধারণ তহবিল গঠন করি। আমাকে এই গ্রুপের অবৈতনিক ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। কিছু আর্থিক সুবিধা নেয়ার হীন উদ্দেশ্যে এ দায়িত্ব নিয়ে ভয়ংকর বিপদে পড়লাম। বিপদের ধরনটি বৈশ্বিক। যেমন বিমানবন্দরে আসার ও নাস্তার ব্যয় মেটাতে হয় টাকায়। প্লেনে খাবার কিনতে হয় ডলারে। দিলাম ডলার। দুবাইয়ে খাবার খেয়ে দিলাম ডলার। তারা ফেরত দিল দিনার। মস্কোতে ভাঙ্গালাম পাউন্ড, দিল রাশিয়ান করেন্সি রোবল। মস্কো এয়ারপোর্টে ‘ইউরো’ তেও লেনদেন করা যায়। পিনাক একবার এনে জমা দিল ৫০ ইউরো। অর্থাৎ আমাদের গ্রুপে টাকা, ডলার, দিনার, পাউন্ড, রোবল, ইউরো এই ৬ প্রকার কারেন্সির লেনদেন হয়। আমি অন্তত: ছয়বার ম্যানেজারি থেকে পদত্যাগ করি। পদত্যাগপত্র গৃহিত হয়নি। দেশে এসে হিসেব দেয়ার ভয়ে বর্তমানে পলাতক আছি। 
যাই হোক খাওয়া দাওয়া শেষ করতে আমাদের রাত ৩টা বেজে গেল। বিমানবন্দরের ভেতরে দিন-রাত বুঝার কোন উপায় নেই। দুবাইয়ের সময় অনুযায়ী সকাল ৯টায় আমাদের ফ্লাইট। রিপোর্ট করতে হবে সকাল ৭টায়। জালাল ভাই আমাদের সকাল ৬টার মধ্যে বিমানবন্দর দর্শন শেষ করতে বললেন। তার মানে সময় মাত্র ৩ ঘন্টা। আমরা যার যার মতো ঘুরতে শুরু করে দিলাম। এক এক করে বিভিন্ন দোকানে ঢুকতে থাকলাম, চোখ ধাঁধানো সব আয়োজন। নাজিয়া ভাবির সঙ্গে স্বর্ণের একটি দোকানে ঢুকলাম। দুবাইয়ের স্বর্ণের অনেক নাম শুনেছি, এবার দাম দেখলাম। না দেখাই ভাল ছিল! গ্লাসের ভিতরে বিভিন্ন চকলেট, ড্রিংকস সাজিয়ে তার নিচে এর দাম লিখে রেখে দিয়েছে। পাশের ছিদ্র দিয়ে দিনার ঢুকিয়ে দিয়ে নাম্বার পুশ করলে ঐ খাবারটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে নিচে পড়ে। খাবারের চেয়ে প্রক্রিয়াটি বেশ মজার। আমাদের নেশা ধরে গেল। কিছুক্ষণ পর পর দিনার ঢুকাই এবং চকলেট নিয়ে আসি। ফ্লাইট উঠা নামার বিশাল একটি স্কিন দেয়ালে আটকানো। সেখানে দেখতে পেলাম ৩৭টি ফ্লাইট ঐ রাতে আমাদের টর্মিনাল থেকে বিভিন্ন দেশে ছেড়ে যাবে। এর মধ্যে সরাসরি একটি ফ্লাইট সিলেট গেল রাত ১টায়। বোর্ডে সিলেট নামটি দেখে আমরা রোমাঞ্চিত হলাম। ভোরের দিকে একটি ফ্লাইট যাচ্ছে ঢাকায় অন্যটি চট্টগ্রামে। শুধু বাংলাদেশেই ‘ফ্লাই দুবাই’ এর ব্যবসা দেখে অভিভূত হলাম। অথচ বাংলাদেশ বিমান বছরের পর বছর লোকসান গুনছে। চাইলে তাদের টিকেট নাই। আর বিমানে উঠলে দেখা যায় যাত্রী নাই। পুরোই তেলসমাতি কারবার। এই টার্মিনাল থেকে এশিয়াতেই তারা বেশী ফ্লাইট পরিচালনা করে। অদ্ভূত অদ্ভূত সব শহরের নাম দেখলাম স্কিনে, যে শহরগুলোর নামই কোনদিন শুনিনি। কয়েকটি ফপ্লাইট আছে ইউরোপে। আমাদেরটি যেমন।
আমরা যখন দুবাই পৌচ্ছি, তখন বিমান বন্দর অনেক ফাঁকা ছিল। রাত যতই গভীর হতে লাগল, যাত্রীদের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকল। এরমধ্যে শ্রীলঙ্কা থেকে যুব উৎসবে যোগ দিতে আসা দলের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে গেল। বৈশ্বিক উৎসবের উষ্ণ হাওয়া আমরা দুবাইয়েই টের পেলাম। ভারত থেকে আসা একদল টকবগে তরুন-তরুণী প্রথমবারের মতো স্টুডেন্ট ভিসায় রাশিয়া যাচ্ছে। ভিডিও কলে তাদের মায়েদের সাথে কথা বলছে। বিদেশে পড়তে যেতে পেরে তারা আনন্দিত, আবার মাকে ছেড়ে যাচ্ছে বলে ব্যথিত। এক অদ্ভুত অনুভূতি। একটি ঘটনায় একই সঙ্গে আনন্দ-বেদনার অনুভূতি শুধু উপমহাদেশীয় মানুষেরই পক্ষে সম্ভব। বিমান বন্দরে ক্রমেই যাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকে। এতে আমাদের একক আধিপত্য ক্ষুন্ন হয়। মোবাইল চার্জের কিছু সুইচ বেহাত হয়ে যায়। হঠাৎ একটি পয়েন্ট আবিষ্কার করলাম একটি পিলারের অন্তত ১০ফুট উচুতে। লাফ দিয়ে চার্জার লাগালাম। কিন্তু চার্জারে মোবাইল লাগানোর পর তা অনেক উচুতে উল্টো হয়ে ঝুলতে লাগল। যে কোন সময় মোবাইলটি পড়ে ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকায় মোবাইলের সম্ভাব্য পতনের স্থানে ব্যাগ রেখে দিলাম। এর পাশে বসে নাজিয়া ভাবি মোবাইল পাহাড়া দিচ্ছেন, সে এক দর্শনীয় দৃশ্য। সকাল ৭টার কিছু আগেই আমাদের ডাক পড়ল। দলনেতাকে অনেক বেগ পেতে হল সবাইকে জড় করতে। লাইনে দাঁড়িয়ে মোটামুটি নির্বিঘেœ ইমিগ্রেশন পাস হয়ে গাড়িতে উঠলাম। বাস কিছুক্ষণ চলার পর ড্রাইভার কনফিউজড হয়ে গেলে। কারণ সারি সারি প্লেন দাঁড় করানো। সবগুলোতেই সিঁড়ি লাগানো। তার মানে সবগুলোই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে। পিনাক ড্রাইভারের কাছে গিয়ে খাঁটি বাংলায় বললো, ভাই, আর যা-ই করেন ভুল করে ঢাকার প্লেনে তুলে দিয়েন না! ড্রাইভার সাহেব কথা বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হলনা। কারণ উনি দেখতে অনেকটা জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের মতো।
হৈ চৈ করে প্লেনে উঠলাম। আমার সিট আবারও জানালার কাছে। এবারের জার্নি পুরোটাই দিনের বেলায়। উপর থেকে ৬/৭টি দেশ দেখে দেখে যাব, সেই আনন্দই আমি আত্মহারা। অবশ্য আকাশে যদি বেশি মেঘ না থাকে। এই প্লেনটি আগের প্লেনের থেকে অনেক আধুনিক। প্রতিটি সিটের সামনে মনিটার যুক্ত। মনিটারে গেইম খেলা যাবে, টিভি দেখা যাবে, সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে প্লেনের অবস্থান, গতি, উচ্চ ইত্যাদি মনিটরে প্রদর্শিত হবে। ঢাকা-দুবাই ফ্লাইটে এ ব্যবস্থা ছিলনা। যদিও একই এয়ার লাইনস। এশিয়া থেকে ইউরোপের জার্নি উন্নততর করে দুই মহাদেশের পার্থক্য বুঝিয়ে দিল এশিয়ারই একটি এয়ার লাইনস! আবারও জানানো হলো প্লেনের ভেতরের গদ বাধা নিয়ম-কানুন। অন্তত: একশবার বলার পরও আমরা কেউই মোবাইল অফ করলাম না। বরং চারিদিক ভিডিও করতে শুরু করলাম! পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে দেখে কেবিন ক্রু’রা রণে ভঙ্গ দিলেন। প্লেন যখন চলতে শুরু করল তখন আমাদের মোবাইলে সকাল ৯টা বাজে। দুবাইয়ে ওয়াই-ফাই ব্যবহার করায় আমাদের মোবাইলের সময় অটো পরিবর্তিত হয়ে গেছে! প্লেন রানওয়ের পাশে এসে বিরাট জ্যামে পড়ল। এক ঘন্টায় অন্তত ৩০টি ফ্লাইট আমাদের চোখের সামনে দিয়ে উড়ে গেল। এক পর্যায়ে এল আমাদের পালা। দুবাই থেকে শেষ পর্যন্ত আমরাও উড়াল দিলাম। আকাশ থেকে দিনের আলোয় একযুগ পর দুবাই দেখলাম এবং আবারও হতাশ হলাম। মরুভূমিতে শত চেষ্টা করেও তারা প্রাণের স্পন্দন আনতে পারেনি! আধুনিক অট্টালিকা, রাস্তা-ঘাট সব বালুতে ম্লান হয়ে গেল। দুবাইকে কখনও আকর্ষণীয় মনে হয়নি সবুজের সমারূহ না থাকায়। কিছুক্ষণের মধ্যে আরব সাগরের একটি অংশ অতিক্রম করে আমরা ইরানের আকাশ সীমায় প্রবেশ করলাম। আমাদের সৌভাগ্য যে আকাশ অত্যন্ত পরিষ্কার। বিস্তৃত অঞ্চলে মরু পাহাড়। আধ ঘন্টা পর কিছু লোকালয় ও রাস্তা-ঘাট দেখা গেল। মনিটর দেখাচ্ছে প্লেনের গতি ঘন্টায় পাচশ মাইল, উচ্চতা ৯ মাইল, বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস ৫৫ ডিক্রি! ক্রমে আমরা ইরানকে পেছনে ফেলে তাজাকিস্হান,কিরগিজস্হান, বেলারুশের উপর দিয়ে গিয়ে কাঙ্খিত রাশিয়ার আকাশে প্রবেশ করলাম। ফেলে আসা দেশ গুলোর তুলনায় রাশিয়ার এ অংশকে অনেক সবুজ মনে হল। কিছুক্ষণে মধ্যে এক দীর্ঘ নদী দৃষ্টিগোচরে এলো। এটি রাশিয়ার বিখ্যাত বলগা নদী হওয়ার সম্ভাবনা। আরও এক ঘন্টা রাশিয়ার উপর থাকার পর পাইলট সাহেব জানালেন আমরা মস্কোতে নামছি। উপর থেকে মস্কো দেখলাম, মনোমুগ্ধকর! এমনকি একযুগ আগে আকাশ থেকে দেখা লন্ডন, বার্লিনের চেয়েও সুন্দর! মুগ্ধ হলাম মূলত মস্কোর অরণ্য দেখে। শীত আসায় গাছের পাতাগুলো হালকা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। কিছু কিছু গাছের সব পাতা লাল। প্লেন অনেক নীচু দিয়ে একটি চক্কর দেয়ায় সবকিছু স্পষ্ট দেখা গেল। যেন শিল্পীর তুলির শৈল্পিক আচর! প্লেন নিরাপদে অবতরণ করল। রীতি মাফিক আমরা হাততালি দিয়ে পাইলট সাহেবদের অভিনন্দন জানালাম। আবারও প্রায় ৫ ঘন্টার প্লেন জার্নির অবসান হল। জানলাম, মস্কোর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি আমরা এসেছি ৩৮ ডিক্রি থেকে। তবে এ তাপমাত্রা আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। আমরা প্লেন থেকে সুরঙ্গ পথে সরাসরি বিমান বন্দরের ভেতরে চলে যাব। নামতে গিয়ে ইউরোপের সব বিমান বন্দরের ন্যায় সশস্ত্র পুলিশ মহোদয় দাঁড়িয়ে! উনাকে সালাম দিয়ে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার মাটিতে মতান্বরে রাশিয়ার টাইলস এ পা রাখলাম…(চলবে)