- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভ্রমণ- রাশিয়া থেকে ফিরে

এনাম আহমেদ
(নবম পর্ব)
অবশেষে আমাদের ট্রেনটি কাঙ্খিত বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছল। সময় খুব বেশী হাতে নেই। তবে আমাদের আনন্দের সীমা নেই। কারণ হারতে হারতে শেষ পর্যন্ত সবাই স্টেশন পর্যন্ত পৌছতে পেরেছি। দ্রুত বিমানবন্দরে প্রবেশ করে বোডিং কার্ড সংগ্রহ করে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমাদের প্লেনের নাম এস. সেভেন। ৮১ নং গেইট দিয়ে গিয়ে তাতে আরোহন করতে হবে। তখনও টেক অফ করার আধঘন্টা বাকি। জালাল ভাই তাড়া দেয়ায় তখনই আমরা প্লেন ধরতে রওয়ানা হয়ে যাই। কিন্তু ৮১নং গেইট খোঁজে পেতে আমাদের রীতিমতো হিমসিম খেতে হয়। শেষ পর্যন্ত যখন খোঁজ পাই  তখন বোডিং এর একেবারে শেষ সময়। ঐ সময় রওয়ানা না দিলে আমাদের এই ফ্লাইটও মিস হয়ে যেত। আড়াই ঘন্টা ভ্রমণের পর পাইলট জানালেন আমরা কৃষ্ণ সাগরের উপরে আছি এবং অলিম্পিক নগরী সোচিতে নামছি। ঠিক সন্ধ্যার পর আলো ঝলমল সোচিতে নামলাম। কাছাকাছি সময় আরও কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি নামলেন। পুরো বিমানবন্দর বিশ্ব যুব উৎসবে প্রতিনিধিগণের দখলে। এখানে এক ঝাঁক স্বেচ্ছাসেবক আমাদের স্বাগত জানালেন। বিমানবন্দরেই আমাদের আবাসনের রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেল। উৎসবে অংশগ্রহণকারী এক এক মহাদেশের জন্য এক এক কাউন্টার। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দেখি এলাহী কারবার। ১০টি বাস দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বহন করার জন্য। কারণ ১০টি দেশের প্রতিনিধিরা তখন আবাসনের জন্য অপেক্ষামান। বাসগুলো উৎসবের লগোতে মুড়ানো। অনেকটা জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বহনকারী বাসের মতো। বাসে যেতে যেতে শহর দেখার চেষ্টা করলাম। অত্যন্ত সাজানো গুছানো। পুরো শহর উৎসবের রঙে রাঙা। আমাদের ঠাঁই হল রক্সিডম এর হোটেলে। থ্রি-স্টার হোটেল। প্রতিটি ৫ তলা। প্রতিটির সামনে খেলার মাঠ। কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী এভাবে অন্তত: তিন শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। আমরা খাওয়া দাওয়া শেষ করে ওয়াই ফাই ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়াগামী আমাদের পরবর্তী দুটি টিমকে জানিয়ে দিলাম যে মস্কো থেকে সোচির ফ্লাইট আমরা মিস করেছি। মস্কো শহরে অসম্ভব জ্যাম। তারা যেন অহেতুক বিলম্ব না করে। তারা ফিরতি ম্যাসেজ দিয়ে আমাদের নিয়ে হাসি ঠাট্টা করল। তারা ফল পেল পরের দিনই। তাদেরও ফ্লাইট মিস। বাকি রইল আমাদের সর্বশেষ টিম। ফ্লাইট মিস হওয়া দুটি টিমই আমরা তাদের ম্যাসেজ দিয়ে আমাদের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানালাম। তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিল। তারা জানালো, ফ্লাইট মিসের আশংকায় তার মস্কো এয়ারপোর্টেই রাত কাটাবে। হোটেলে যাবে না। কিন্তু এতেও তাদের শেষ রক্ষা হল না। ফ্লাইট মিসের চেইন রিয়েকসনে তারাও পড়ে গেল। তাদের ফ্লাইট মিসের কাহিনী আমাদের চেয়েও হৃদয় বিদারক। মস্কো এয়ারপোর্টে রাত কাটিয়ে তারা বোর্ডিং কার্ড নিয়ে নিল। কার্ডে লিখা ১৫নং গেইট দিয়ে প্লেনে উঠতে হবে। তারা দুই ঘন্টা আগ থেকে ১৫ নং গেইটে অবস্থান নিয়ে নিল। কিন্তু ১ ঘন্টা পরই কর্তৃপক্ষ মাইকে ঘোষণা দিয়ে গেইট পরিবর্তন করে নিলেন। কিন্তু ঘোষণাটি রাশান ভাষায় দেয়ায় আমাদের বন্ধুরা তা বুঝতে পারেননি। ফলস্বরূপ তাদেরও ফ্লাইট মিস। আমাদের ফ্লাইট মিসের ষোলকলা পূর্ণ হল।
যা হোক বিশ্ব যুব উৎসবের ভেন্যু সোচিতে পৌঁছে গেছি। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে আমরা দীর্ঘ বিশ্রাম নিলাম। আমাদের দলনেতা রিয়াদ ভাই উৎসবে আমাদের রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করলেন। আমাদের হোটেল থেকে হাঁটা দূরত্বে ইতিহাস খ্যাত কৃষ্ণ সাগর। সাগর প্রকৃতিগত কারণেই মানুষকে কাছে টানে। প্রথম দিকের পর্বে কৃষ্ণ সাগরকে নিয়ে অনেক কিছু লিখায় এখানে তা নিয়ে আর কিছু লিখলাম না। মস্কোর চেয়ে সোচির তাপমাত্রা অনেক বেশী সহনীয়। রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ উৎসবে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের যাবতীয় সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। খাবার দাবারের ক্ষেত্রে ছিল এলাহি কারবার। সকাল. দুপুর, রাত তিন বেলাতেই ছিল অন্তত: শতাধিক খাবারের আইটেম। বিভিন্ন ফলের অসাধারণ ড্রিংসের স্বাদ ছিল অতুলনীয়। রেজিস্ট্রেশন কার্ডের সাথে কর্তৃপক্ষ আমাদের প্রচুর উপহার সামগ্রী দেন। রাশিয়ার অসহনীয় শীত ঠেকানোর জন্য একাধিক হুডি, জ্যাকেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদি। পরের দিন বিকাল ৩টায় সোচির ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ১৮৫টি দেশের প্রায় ২৫ হাজার প্রতিনিধি এই রঙের পোষাক পড়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করি। পুরো উৎসবের ক্যাম্পাস অন্তত ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। প্রথমে সেখানে ঢুকতে মুখোমুখি হতে হয় নিরাপত্তা তল্লাসীর। সেটি পেরিয়ে যখন স্টেডিয়ামে ঢুকব তখন শুরু হয় আবার নিরাপত্তা তল্লাসী। আমরা পরিস্থিতি দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত। অনুষ্ঠান শুরু হলে বুঝা গেল কেন এই অত্যাচার। স্বয়ং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্রাদিমির পুতিন যে এসেছেন এ উৎসব উদ্বোধন করতে! আমাদের সবার পোষাক হলুদ থাকায় পুরো স্টেডিয়ামই হলুদ। উপর থেকে আমাদের উপর বিভিন্ন রঙের আলো ফেলে ক্ষণে ক্ষণে গ্যালারির রং পরিবর্তিত হতে লাগল। রাশিয়ান জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের উদ্বোধনী বক্তব্যের পর শুরু হয় আকর্ষনীয় ডিসপ্লে। অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মানের এই পর্ব চলে প্রায় দুই ঘন্টা। পরে শুরু হয় সংগীত পর্ব। বিশ্বের বাঘা বাঘা সংগীত শিল্পীরা এতে অংশ নেন। প্রায় ৪ ঘন্টা শ্বাস বন্ধ করে অনুষ্ঠান উপভোগ করে আমরা রুমে ফিরে আসি।
পরের দিন সকাল ৬টায় সব দেশের অংশগ্রহণে প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে হয় র‌্যালি। র‌্যালিতে যার যার দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী জাতীয় পতাকা নিয়ে বর্ণিল সাজে সবাই অংশগ্রহণ করে। বিশ্ব যুব উৎসবের মূল ভেন্যুর নাম মেইন মিডিয়া সেন্টার। অন্তত ২ বর্গ কিলোমিটার ব্যাপ্তি নিয়ে নির্মিত এই সেন্টারে রয়েছে অন্তত পাঁচ শতাধিক কক্ষ। ১৮৫ দেশের ২৫ হাজার তরুণকে এক সাথে পেয়ে রাশিয়ান সরকার তাদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাফল্য, প্রযুক্তি সব মেলে ধরেছে। তাদের সামরিক শক্তি সম্পর্কে আমাদের কিছু কিছু ধারণা দিতে প্রতিদিনই সোচির আকাশে মিগ২৯ সহ অত্যাধুনিক সব যুদ্ধ বিমান আকাশে কসরত দেখিয়ে গেছে। নিরাপত্তা জনিত কারণে আমরা মাথায় হাত দিয়ে তা উপভোগ করেছি। সকল দেশের জন্য আলঅদা আলাদা স্টল বরাদ্দ ছিল। তারমধ্যে বাংলাদেশের স্টলটি ছিল অত্যন্ত জমজমাট। ছোট ছোট বর্ণিল পালকি, রিক্সা, কুড়েঘর ইত্যাদি দেখে সব দেশের প্রতিনিধিরা উপচে পড়েছে আমাদের স্টলে। বাংলাদেশের স্টলের ডানদিকে ছিল মেসিডোনিয়ার স্টল আর ডানদিকে বিশ্ব সা¤্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের স্টলে আকর্ষনীয় আইটেম ছাড়াও উদীচী শিল্পীদের ঢোল-ঢপকি নিয়ে ছিল আকর্ষনীয় দেশজ সংগীত। আমাদের অত্যাচারে মেসোডোনিয়া ২য় দিনই তাদের স্টল বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। দুই দিন মাটি কামড়িয়ে টিকে থেকে ৩য় দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও রণে ভঙ্গ দেয়। তারা কিছু বই দিয়ে স্টলটি সাজিয়েছিল। স্টল গুটিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে নি:প্রাণ হাসি দিয়ে বিদায় নিলে আমরা বিজয় উল্লাসে মেতে উঠি। ট্রাম্পের দেশের স্টল দখল করা কম কথা নয়। ৪র্থ দিন আমাদের স্টল প্রসারিত করি মেসোডোনিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত। মেইন মিডিয়া সেন্টারে ১২টি ব্লকে বিভক্ত। প্রতিটি ব্লকে রয়েছে ১০টি করে কক্ষ। ১১টি ব্লক রাশিয়ান সরকারের দখলে। পুতিন সরকার বাংলাদেশের বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মতোই জনপ্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে কেউ তেমন কিছু বলার সাহস পায় না…...(চলবে)

  • [১]