বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু (পূর্ব প্রকাশের পর)
এরিজোনা ষ্টেটে আসার আগেই ইন্টারনেটে এই ষ্টেটের উপর কিছু তথ্য নিয়েছিলাম। প্রথমেই যেটা লিখা ছিল সেটা হচ্ছে এই ষ্টেটটা হচ্ছে গ্রান্ড ক্যানিয়ন ষ্টেট। স্বাভাবিকভাবেই এই গ্রান্ড ক্যানিয়নকে জানতে আবার গোগলে সার্চ দিতে হল। গোগলের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে আমার লোভ বেড়ে যায়। আমি গ্রান্ড ক্যানিয়ন দেখার বাসনা পোষণ করতে থাকি। তাছাড়া উইক এন্ড ছাড়া দীপকে পাওয়া যাবে না। জায়গাটিতে যেতে হলে আমার ছেলের ছুটি থাকতে হবে। আমার কথা বার্তায় দীপ বুঝে গিয়েছিল গ্রান্ড ক্যানিয়নে আমাকে নিয়ে যেতে হবে। সে ঐ এলাকার হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং জায়গাটিতে যাওয়ার রাস্তা সহ আনুষাঙ্গিক সব তথ্যই সংগ্রহ করে রেখেছে। গ্রান্ড ক্যানিয়ন ভালভাবে দেখতে হলে আমাদের একদিন সেখান রাত্রি যাপন করতে হবে। তাই হোটেল, মোটেল, রেষ্ট হাউসে রুম পাওয়ার জন্য সার্চ করছিল । আবার রুম পাওয়া গেলেও সেটা একজন বা দুজনের থাকার একটি রুম পাওয়া যাচ্ছে। দীপ নিশিকে নিয়ে আমরা আছি পাঁচজন। আমরা যখন কানেক্টিকাট ষ্টেটে অবস্থান করছি তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রীষ্ণের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। তাই গ্রান্ড ক্যানিয়নে পর্যটকদের ভিড় লেগেই আছে। পর্যটকরা ঐ এলাকার হোটেল, মোটেল, রেষ্ট হাইসগুলোতে প্রায় বছর খানেক আগে থেকেই বুকিং করে রেখে দিয়েছেন। দীপ আর নিশি থাকার জায়গা খুঁজতে ব্যস্ত থাকলেও কোনভাবেই মিলাতে পারছিল না। থাকার কোন জায়গা না পেলেও আমরা গ্রান্ড ক্যানিয়নে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। প্রয়োজনে আমরা পার্কিং এরিয়ায় গাড়ীতে রাতটা কাটিয়ে দেব। যদিও গ্রান্ড ক্যানিয়নে বন্য পশু সহ বিভিন্ন প্রজাতির পোকা মাকড় থেকে সাবধান থাকতে বলা আছে।
গ্রান্ড ক্যানিয়নের বাংলা করলে দাঁড়ায় গভীর গিরিখাত। বিশ্বে অনেকগুলো আশ্চর্যজনক জিনিষ আছে। আমরা জানি ভারতে আগ্রার তাজমহল, চীনের প্রাচীর, ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান, মিশরের পিরামিড এগুলো অনেক আগে থেকেই পৃথিবীতে আশ্চর্যজনক স্থান হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে। প্রতি বছরই আবার নুতন আশ্চর্যজনক জায়গার কথা জানতে পারছি। বর্তমান সময়ে ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত সমুদ্রের নীচ দিয়ে যে রাস্তা তৈরী করা হয়েছে সেটা বিশ্ব্রে আশ্চর্যজনক স্থান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো সবই মানুষ সৃিষ্ট করেছেন। প্রাকৃতিকভাবে আপনাআপনি যে সকল আশ্চর্য স্থান তৈরী হয়েছে তার মধ্যে গ্রান্ড ক্যানিয়ন একটি। অনেকের মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে কি আছে এই গিরিখাতে। গিরিখাত তো হতেই পারে, তাতে আশ্চর্যজনক কি আছে সেখানে। এটাই আসলে এই লেখার বিষয়বস্ত। এই জায়গাটি রুক্ষ পাথরে গড়া পাহাড় আর পাহাড়। তাও সাধারণ পাহাড় নয়। বিচিত্র রংয়ের বিচিত্র সব পাহাড়। আর এই গিরিখাতটা হচ্ছে পাহাড়ের গায়ে ফাটল, তাও ছোটখাটো ফাটল নয় এগুলো বিশাল বিশাল ফাটল। এক এক জায়গায় এই ফাটলগুলো মাইল খানেক হয়ে আছে। এই ফাটলগুলো তৈরী হতে একদিন বা একবছরে তৈরী হয়নি । কোটি কোটি বছর ধরে আস্তে আস্তে তৈরী হয়েছে এই ফাটল। আমরা যে গ্রান্ড ক্যানিয়ন দেখতে যাব সেটা সৃষ্টি হতে এক কোটি সত্তর হাজার বছর লেগেছে বলে আমেরিকান গবেষকরা মনে করেন। এই অদ্ভূত গিরিখাতটির মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে কলোরাডো নদী। এই নদীর অনেক শাখা প্রশাখা ছিল। আস্তে আস্তে সেই নদীর পাড়ে পলি জমল। সেই পলিমাটি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে পরিণত হলো পাথরে। স্ইে সব পাথরগুলোই এক সময় নদীর গতিপথ পাল্টে দিলো। প্রায় ৩-৪ বিলিয়ন বছর আগে ভূ-প্রাকৃতিকভাবে খর¯্রােতা কলোরাডো নদীর প্রচন্ড ¯্রােত ও টেকটনিক প্লেটের ঘর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খাঁজের আকারে গিরিখাতটির সৃষ্টি হয়।
অদ্ভূত গভীর গিরিখাতটি দেখার জন্য আমরা একটা প্রোগ্রাম করে ফেললাম। বড় আকারের একটা গাড়ী রেন্ট এ কার থেকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হল। দীপ রেন্ট এ কারের সাথে যোগাযোগ করে সব কিছু ঠিক করে ফেলল। আমাদের সাথে খাবার দাবার, পানি সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ নেওযা হল। এমনো হতে পারে রাতে যদি আমরা না ফিরি তাহলে গাড়ীর মাঝেই যেন রাত কাটিয়ে দিতে পারি। দীপ আর নিশি পালাক্রমে গাড়ী চালাবে। মাঝে মাঝে আমরা বিরতিতে থাকব। সকাল ৫ টার মাঝে আমাদেরকে বের হতে হবে তাই সবাই দেরী না করে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার যেন রাত যেতে চাইছে না। সকালে ঘুম থেকে উঠার জন্য মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখলাম। সকালে উঠে বাসায় নাস্তা বা চা পান না করে তাড়াতাড়ি রওয়ানা হয়ে গেলাম। পথে ড্রাইভ থ্রো থেকে নাস্তা নিয়ে গাড়ীর মাঝেই নাস্তা সেরেছি। ড্রাইভ থ্রো এর কথা আগের লেখায় বলেছি। আমার কাছে রেস্টুরেন্টগুলোর এই সেবা ভালই লাগে। রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে ঝিমুনির চাইতে নিজের গাড়ীতে বসে খাওয়া ভাল। তাছাড়া যদি নিজেদের তাড়াহুড়া থাকে তাইলে তো ড্রাইভ থ্রো এর সেবা নেওয়া উত্তম। গাড়ী থেকে না নেমে অর্ডার দিয়ে নাস্তা এবং পানীয় নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি। আমাদের শহর চ্যান্ডলার থেকে প্রায় ৪৫০ মাইল দূরে এই গ্রান্ড ক্যানিয়ন। একটানা ড্রাইভ করলেও অনুমান ৬ ঘন্টা লেগে যাবে। এভাবে তো একটানা ড্রাইভ তারা করতে পারবে না, তাদেরকেও রেস্ট দিতে হবে। চ্যান্ডলার শহর থেকে বেরিয়ে আমরা হাইওয়েতে উঠেছি। ইতিমধ্যেই গাড়ীর লাইন শুরু হয়ে গেছে। মনে হল আমাদের মত অনেকেই সকাল সকাল রওয়ানা হয়েছেন। হাইওয়েটি উপরের দিকে উঠছে। পাহাড়ের উপরের দিকে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আমাদের গাড়ী চলছে। আমার কাছে এটা একটা ভুতুরে পরিবেশ লাগছে। অন্ধকারের মাঝে সরকারী কৃত্রিম বৈদ্যুতিক বাতি থাকলেও কেমন জানি ভয় ভয় লাগে। আমরা শুধু উপরের দিকে উঠছি। পথে পথে কর্ত্তৃপক্ষ সাবধান বাণী হিসাবে সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে রেখেছেন। হিং¯্র পশু যে কোন সময় হাইওয়েতে চলে আসতে পারে তাই এই সাবধান বাণী। হাইওয়েতে সবাই গাড়ী একটু বেগে চালান। যে কোন সময় হরিন, বাঘ, সিংহ ইত্যাদি প্রাণী সামনে চলে আসলে প্রাণীটি বেঘোরে মারা যায় কিন্তু গাড়ীতে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটায়। এতে প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকে। আমরা যাওয়ার সময় দেখলাম একটি বন্য হরিন হাইওয়ের পাশে কাতরাচ্ছে। মনে হল হরিনটি হাইওয়েতে দুর্ঘটনায় পড়লেও হাইওয়ে পুলিশ এটাকে পাশে নিয়ে রেখেছে। একটু পরেই হরিনটাকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যাবে। আশে পাশে শুধুই জঙ্গল। এক সময় আমরা প্রায় ৬০০০ ফুট উপরে উঠে গেছি। গাড়ির জিপিএসে কত ফুট উপরে উঠেছি সেটা দেখাচ্ছে। দীপ আর নিশি পালাক্রমে গাড়ী চালানোয় তাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। হাইওয়ের পাশেই পার্কিং এরিয়ায় গাড়িতে বসেই সাথে আনা খাবার খেয়ে ক্ষিধা নিবারণ করতে হয়েছে। সকাল ১১ টার দিকে আমরা গ্রান্ড ক্যানিয়ন বা গভীর গিরিখাতের পাশে চলে এসেছি। আমেরিকাতে সব জায়গায়ই ডলার দিতে হবে। যেভাবে রোজগার আছে সেভাবে খরচ। ঘরের বাইরে বের হলেই হাতটা খুলতে হবে, মানিব্যাগ থেকে কার্ড বের করে পাঞ্চ করতে হবে। সিকুইরিটিরা গাড়ি থামাচ্ছেন আর চেকআপ করার পর গাড়ি প্রতি ২৫ ডলারের টিকেট করতে হয়েছে। আজকে এত পর্যটক এসেছেন যে গাড়ী পাকির্ংয়ের কোন জায়গাই পাওয়া যাচ্ছে না। অগত্যা আমরা অনেক দূরে গাড়ি রেখে গ্রান্ড ক্যানিয়নের গাড়িতে উঠলাম। পাহাড়ের উপরে চারিদিকে ঘুরার জন্য কর্ত্তৃপক্ষ গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন। এত বিরাট এলাকা পায়ে হেঁটে কেউ যেতে পারবে না। তাছাড়া আছে উঁচু নীচু এলাকা। পর্যটকদের সুবিধার জন্য গাড়িগুলো এক একটি স্পটে যাচ্ছে আর পর্যটকরা উঠানামা করছেন।
এই অদ্ভূত গভীর গিরিখাতটির দৈর্ঘ ২৭৭ মাইল, প্রস্ত ১৮ মাইল আবার কোনো কোনো জায়গায় ২ মাইল। আর গভীরতা শুনলেই প্রাণটা আঁতকে উঠে। গভীরতা হচ্ছে ১ থেকে দেড়মাইল। নীচের দিকে তাকালে মাথাটা ঘুরে যায়। এখান থেকে পড়লে কারো অস্থিত্ব থাকবে না। আমি একবার তাকিয়ে ভয়ে আর দ্বিতীয়বার তাকাইনি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এই গিরিখাতটি সংরক্ষণে এবং পর্যটকদের দেখার জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা করে দেন। তিনি ভ্রমণে এবং শিকারের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর একবার আসতেন। গ্রান্ড ক্যানিয়নের চূড়া থেকে আমরা যখন নীচের দিকে তাকালাম তখন কলোরাডো নদীকে একটি ছোট নালার মত মনে হয়েছে। এই গ্রান্ড ক্যানিয়ন বা গভীর গিরিখাত কিন্তু এক সময় এই রকম ছিল না। পৃথিবী যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে এটাই তার প্রমাণ। মনে প্রশ্ন জাগে আসলে এই পাথরের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে কি মানুষ বসবাস করে। পৃথিবীর উত্তর মেরুতে যেভাবে প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝে এস্কিমোরা বসবাস করে ঠিক একই ভাবে পাথরের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে নাকি পুয়েরু নামক আমেরিকান আদিবাসিরা থাকে। যদিও এরকম কোনো আদিবাসিদের আমরা দেখতে পাইনি। ইউরোপিয়ানদের আমেরিকা আসার বহু বছর আগে থেকেই এই আদিবাসিরা এই পাহাড়ে বসবাস করে। তাদের নাকি নিজস্ব ভাষা আছে। গ্রান্ড ক্যানিয়ন নাকি তাদের তীর্থ স্থান। মুসলমানদের যেমন মক্কা, খৃষ্টানদের জেরুজালেম ঠিক তেমনি পুযেরু উপজাতিদের তীর্থস্থান এই গ্রান্ড ক্যানিয়ন। পাথর আর পাহাড়ের দেশ হলেও এটার সৌন্দর্যই আলাদা। পাহাড় আর পাথরগুলো বিভিন্ন রংয়ের। সূর্য উঠলে পড়ে পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আভা লেগে আরো উজ্জল হয়ে উঠে। বাসে করে সাউথ রিমের কিছু স্পটে আমাদের নেওয়া হল। সেখান থেকে এই গভীর গিরিখাতটি দেখতে অপূর্ব লাগে। কলারোডা নদীর ¯্রােতে পাহাড়ের গায়ে ভাস্কর্য সৃষ্টি হয়েছে। মনে হয় কোনো গুণী শিল্পী এই ভাস্কর্য তৈরী করেছেন। আমাদের ছেলে মেয়েরা ছোট প্লেটে উঠে ছবি উঠছে আর আমি মহান আল্লাহতালাকে ডাকছি। এই প্লেটগুলো হচ্ছে পাহাড়ের ঠোটের মত। পাহাড়গুলো পাথরের থাকায় এগুলো খুবই মজবুত। এই ঠোটের মাঝে উঠে অনেকেই সেলফি তুলেন। আমার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত বিপদজনক মনে হয়। এখান থেকে পিছলে গেলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। মাঝে মাঝে নাকি আমেরিকানরা আত্মহত্যা করতে এখানে আসে তাই সতর্ক সিকুইরিটির লোকজন। আমাদের তেমন সন্দেহ না করলেও চোখের মাঝেই রেখেছে দেখলাম। আমাদের হোটেল বুকিং নাই তাছাড়া এখানে নাকি ফরেষ্টের লোকজন রাতে গাড়ি থাকতে দেয় না তাই আমরা সূর্যাস্ত না দেখে বিকালেই চ্যান্ডলারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে দিলাম।
(চলবে)