- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভ্রমণ- লিংকনের আমেরিকায় কিছু দিন

বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু
এবারের আমাদের পুরো আমেরিকা সফরটি ছিল নিশি দীপের বদৌলতে। তারাই আমাদের সমস্ত খরচ বহন করে। আমাদের যাওয়ার জন্য টিকেটটা দিয়েছিল কুয়েত এয়ারলাইন্সে। আমেরিকা যেতে স্বাভাবিকভাবে ২৫/২৬ ঘন্টা বিমানে থাকতে হয়। এছাড়া পথিমধ্যে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের যাত্রা বিরতি আছে। সেটা ৫ থেকে ৭ ঘন্টা পর্যন্ত হয়। কিন্তু কুয়েত এয়ারলাইন্সে যাত্রা বিরতিটা অনেক কম। কুয়েত এয়ারপোর্টে এক ঘন্টা এবং ইংল্যান্ডের হিথ্রো এয়ারপোর্টে এক ঘন্টা যাত্রা বিরতি। এই বিবেচনায় কুয়েত এয়ারলাইন্সে টিকেট পাঠিয়েছিল যাতে আমদের কষ্ট কম হয়। আমাদের যাওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ মে। কে-ইউ-২৮৪ নাম্বার ফ্লাইটটি যাবে ঢাকা থেকে সোজা কুয়েত। এই ফ্লাইটটিতে মূলত আমাদের মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসিরা যান। ঢাকা থেকে আমাদের ফ্লাইট ছাড়বে সকাল ০৫-৩০ টায়, কিন্তু আমাদেরকে রিপোর্ট করতে হবে তিন ঘন্টা আগে অর্থাৎ রাত তিনটায়। সিলেট থেকে একটি হাইয়েজ ভাড়া করা হয়েছে। ড্রাইভার আনোয়ার হোসেন। এটা তার নিজস্ব গাড়ি। ব্যাংক থেকে লোন করে গাড়িটি কিনেছে। দক্ষিণ সুরমায় পৈত্রিক বাড়ি বন্ধক দিতে হয়েছে ব্যাংককে। গাড়িটা নতুন এবং ভাল এসি থাকায় সনামগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটা আরামদায়ক জার্নি হয়েছে।  সুনামগঞ্জ থেকে বিকাল ৪ টায় রওয়ানা হয়ে উত্তরাতে আমার ছেলে দীপের শ্বশুড়ের বাসায় উঠলাম। রাত প্রায় ১২টায় আমরা উত্তরায় পৌছি। খাওয়া দাওয়া করে একটু রেস্ট নিতে না নিতেই রাত দুটো বেজে যায়। আমাদের যেহেতু তিনটায় রিপোর্ট করতে হবে তাই আস্তে আস্তে তৈরি হতে থাকি। উত্তরার বাসা থেকে এয়ারপোর্ট পনেরো মিনিটের রাস্তা। রাত আড়াইটার দিকে আমরা রওয়ানা হয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছে মালামাল নামিয়ে গাড়ি ছেড়ে দেই। ঢাকা  
এয়ারপোর্টে লাগেজগুলো প্রথমে স্কেনিং মেশিনে ঢুকাতে হয়। স্কেন করার পর তারা একটি স্টিকার দিয়ে দেয়। এটাই লাগেজের চেক আপ করার গ্রিন সিগন্যাল। তার মানে প্রথম পরীক্ষা শেষ হয়েছে। লাগেজের ভিতরে নিষিদ্ধ কোন জিনিষ না থাকলেই এই স্টিকার লাগানো হয়। হ্যান্ড লাগেজগুলো রেখে বাকিগুলোকে কার্গোতে দিয়ে দিলাম। বিমানটির বেশির ভাগ যাত্রীই মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করছেন। এই প্লেনেই দেখলাম চারজন মহিলা শ্রমিক যাচ্ছেন। এরা যাবেন বাহরাইন। সিলেটের খাদিমনগরের দিকে বাড়ি। একদম সাদাসিদে মহিলা এরা। বাসার কাজের ভিসা নিয়ে তারা বাহরাইন যাচ্ছেন। তাদের সাথে আলাপ করে ভালই লাগল। এরাইতো আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ করে রেখেছেন। আমি তাদের এম্বারকেশনের কার্ড পূরণ করে দিলাম। ঢাকা থেকে কুয়েত এয়ারলাইন্সের এই ফ্লাইটটি ছয়টায় ছাড়ার কথা থাকলেও সেটা প্রায় এক ঘন্টা বিলম্ব করল। সকাল সাতটায় ঢাকা হযরত শাহজালাল বিমান বন্দর থেকে বিমানটি যাত্রা শুরু করল। আমি ইতিপূর্বে অনেক এয়ারলাইন্সে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি কিন্তু কুয়েত এয়ারলাইন্সের সিটগুলো আমার কাছে একদম ছোটখাট মনে হল। তাছাড়া তাদের পরিবেশিত খাবারও আমার খুব পছন্দ হয়নি। তারপরেও যাত্রাবিরতি কম থাকায় এটাকেই আরামদায়ক মনে হয়েছে। কুয়েত সময় দুপুর ১২.৪৫ মিনিটে আমরা কুয়েত বিমানবন্দরে পৌঁছি। untitled-1
কুয়েত এয়ারপোর্টে আমাদেরকে বিমানটি পরিবর্তন করতে হবে। ইংল্যান্ডের হিথ্রো বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে যে বিমানটি যাবে সেটা তৈরি ছিল। এই ফ্লাইটে আমরা ছাড়া  গোটা দশেক যাত্রী আছেন যারা ইমিগ্রেন্ট ভিসায় আমেরিকায় যাচ্ছেন। আমরা তিনজনই বেড়াবার উদ্দেশ্যে আমেরিকা যাচ্ছি।  কে-ইউ ১০১, বোয়িং ৭৭৭ বিমানটি তৈরি আছে। আমাদেরকে আবার গেইট নং ৫ এ যেতে হবে। কুয়েত এয়ারলাইয়েন্সের এই বিমানটিতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের নিয়ে যাবে। তাদের অনেকেই এসেছেন ভারত. পাকিস্তান. ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে। সবাইকে একত্রিত করে এখান থেকে বিমানে তুলা হচ্ছে। যাত্রীদের কেউ যাবেন ইংল্যান্ড আর বাকীরা যাবেন আমেরিকা। বিমানটি ছাড়ল কুয়েত সময় দুপুর ২ টায়। এবার আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে ইংল্যন্ডের হিথ্রো বিমানবন্দরে। সব এয়ারপোর্টেই চেক-ইনের একটা বিড়ম্বনা আছে। হাতের লাগেজে কোন ধরনের লিকুইড থাকতে পারবে না, এমনকি টুথপেষ্ট পর্যন্ত নয়। চেক-ইনে এসে সব ধরনের মেটালের জিনিস খুলে আলাদাভাবে একটা বাক্সে দিতে হবে। হাতের আংটি, প্যান্টের বেল্ট, ঘড়ি, সব ধরনের সুগন্ধি, বডি ¯েপ্র , মানিব্যাগ, গায়ে কোট থাকলে সেটা, মহিলাদের অলংকার এমনকি জুতা পর্যন্ত খুলে সেই বাক্সে দিতে হবে। এগুলো স্কেন হয়ে যাওয়ার পর মেশিনের অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে যাবে। এইগুলো সংগ্রহ করে পড়তে বেশ সময় লেগে যায়। আবার যাত্রীদেরকে স্কেনিং মেশিনে মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনার পর প্রত্যেকটি এয়ারপোর্টেই বেশ কড়াকড়ি করা হয়েছে। ইংল্যান্ডের হিথ্রো এয়ারপোর্টে পৌছলাম তাদের সময়ে রাত ৯-৩০ টায়। এখানে আমাদের আবার নামতে হবে। কুয়েত থেকে যে বিমানটি এসেছে সেটাই যাবে নিউইয়র্ক, তবে হিথ্রোতে ক্রুরা পরিবর্তন হবে। যারা ইংল্যান্ড যাবেন তারা এম্বারকেশন কার্ড পূরণ করে দিয়েছেন। আমরা যাব আমেরিকার জন. এফ. কেনেডি এয়ারপোর্টে, তাই আমাদের কোন কার্ড পুরণ করতে হবে না। তারপরেও নাকি আমাদের নামতে হবে। হিথ্রো এয়ারপোর্টে আরো কড়াকড়ি। মনে হয় ন্যাংটা করেই ছেড়ে দেবে। মেটাল ডিটেকটর দিয়ে পুরো শরীর চেক আপ করা সহ আবার হাতের লাগেজগুলোকে মেশিনে দিতে হবে। এমনিতেই ঘুমে কাতরাচ্ছি তার উপর এই চেক আপকে এক সময় অসহ্য মনে হয়েছে। বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় আমরা নিউইয়র্কের জে,এফ, কে এয়ারপোর্টে নামি। হাতের লাগেজগুলো বিমান থেকে নামিয়ে ছুটছি প্রথম ইমিগ্রেশনের দিকে। এখানে আবার আরেক পরীক্ষা। সব ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে একটা ক্ষমতা দেয়া আছে। ভিসা থাকলেও তারা যদি মনে করে যাত্রীকে ঢুকতে দেওয়া যায় না তাহলে তারা আবার ফিরিয়ে দিতে পারে। যারা ইমিগ্রেন্ট ভিসা নিয়ে এসেছেন তাদের জন্য এক লাইন আর যারা বেড়াবার উদ্দেশ্যে এসেছেন তাদের আলাদা লাইন। আমার কাছে মনে হচ্ছে লাইনটা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে অনেকগুলো ফ্লাইট নেমেছে মনে হল। এশিয়ার লোকজনকে দেখলেই চেনা যায়। তবে আমার মনে হল অনেকগুলো ইউরোপিয়ান ফ্লাইট একসাথে নেমেছে। আমরা যেহেতু প্রথমবার আমেরিকা এসেছি তাই একটু দেরি হচ্ছে। আমার মেয়ে  নির্দেশনাগুলো পড়ে আমাদের জানাচ্ছে। এক জায়গায় গিয়ে দেখলাম ইমিগ্রেশনের সময় কমানোর জন্য আলাদাভাবে কম্পিউটার, স্কেনার ইত্যাদি রাখা আছে। সব যাত্রীরা নিজেরাই স্কেনারে পাসপোর্ট ঢুকিয়ে তার পরে কি জানি প্রিন্টেড কাগজ বের করছেন আর সেটা নিয়ে কাউন্টারে দৌঁড়াচ্ছেন। একে তো এই প্রথম আমেরিকায় আসা তারপরে অন্য কোন দেশে এরকম কোন ব্যবস্থা না দেখায় কিছুটা খটকার মধ্যে পড়ে গেলাম। এয়ারপোর্টে ডিউটিরত একজন অফিসারকে বলায় তিনি নিজেই এসে আমাদের পাসপোর্ট ভিসা স্কেন করলেন। আমাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে সব ঠিকঠাক হলেও আমার মেয়ের ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলছিল না। একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তখন সেই কর্তব্যরত অফিসারটি বললেন, অনেক সময় এটা হতে পারে তাতে ঘাবড়ানোর কিছু নাই। কাউন্টারে যে অফিসার আছেন তিনি আবার সেটা দেখবেন। আস্তে আস্তে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি কাউন্টারের দিকে। আমাদের হাতে পূর্বের স্কেন করা কাগজ। আমি ও মুনমুন এগুলো দেখাতেই এন্ট্রি পেতে খুব একটা সময় লাগলনা। দীয়ার ফিঙ্গার প্রিন্ট আবার তারা মেশিনে ঢুকিয়ে দেখল। এবার একবারেই সবকিছু ঠিকঠাক। একটা নির্মল হাসি দিয়ে মেয়েটা বুঝাতে চাইল তার কোন অসুবিধা হয়নি। এবার আমাদের লাগেজ নিতে হবে। কুয়েত এয়ারওয়েজে যারা এসেছেন তাদের লাগেজ নিতে হবে ৮ নং বেল্ট থেকে। সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের লাগেজগুলো একা একাই বেল্টের উপর ঘুরপাক খাচ্ছে। লাগেজর জন্য ট্রলি আনতে গিয়ে পড়লাম আরেক বিপাকে। ট্রলি আসতে চাইছে না। আমাদের দেশে যত্রতত্র ট্রলি পড়ে থাকে। টান দিয়েই ট্রলি নিয়ে আসা যায়। এখানে আবার দেখলাম সব ট্রলি অটোমেটিক তালাবদ্ধ । একটু তাকিয়ে দেখলাম লিখা আছে- প্রতিটি ট্রলির জন্য ছয় ডলার করে দিতে হবে। দশ অথবা বিশ ডলারের নোট ঢুকালে বাকী ডলারগুলো বেরিয়ে আসবে আর সাথে সাথে একটা ট্রলির বন্ধন খুলে যাবে। আমার কাছে সবগুলোই একশত ডলার নোট। পড়লাম মহা মুস্কিলে। একটু দূরে দেখলাম এয়ারপোর্টের একজন কর্মচারী দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমার বিষয়টা বুঝতে পেরে আমাকে ভাংতি দিয়ে আপাতত উদ্ধার করলেন। এবার আমরা ইমিগ্রেশন থেকে বেরিয়ে যাব। (চলবে)

  • [১]