বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু (পূর্ব প্রকাশের পর)
প্রায় তিন ঘন্টা গাড়িতে করে আমরা কানেক্টিকাটের উইন্ডসর শহরে চলে এসেছি। আমাদেরকে একটা দ্বিতল বাড়ির সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। সুন্দর পরিপাটি একটি বাড়ি। সামনে পিছনে প্রচুর জায়গা। বাড়িটা নাকি রুমুদের। বাড়িটার নীচতলায় একটি পরিবার ভাড়া থাকে। উপরতলাতে নাকি ভাড়াটিয়া ছিল। মাস দুয়েক হয় আগের ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ায় নুতনভাবে কোন ভাড়াটিয়া দেয়া হয়নি। আর ভাড়া না দেওয়ার কারণ নাকি আমরা। আমরা যতদিন থাকি এ বাসাতেই থাকতে পারব। আমাদের অবশ্য কানেক্টিকাটে থাকার মেয়াদ হচ্ছে ছয় দিন। ৯ মে আমরা চলে যাব এরিজোনা ষ্টেটের চ্যন্ডলার নামক শহরে। জেট লেগ নামক একটি আধুনিক শব্দ এখন বহুল প্রচলিত। এটা মূলত ঘুমের সমস্যা সংক্রান্ত। আমাদের যখন রাত আমেরিকায় তখন দিন। স্বাভাবিকভাবে শরীর, মন এবং মস্তিষ্কের সব হিসাব উল্টা পাল্টা হয়ে যায়। ইচ্ছা করলেও রাতে ঘুমানো যায় না। আবার দিনে খুব ঘুম পায় আর সেটাকেই আধুনিক ভাষায় বলা হয় জেট লেগ। এই জেট লেগ থেকে উত্তরণ করতে স্বাভাবিকভাবে এক সপ্তাহ লেগে যায়। রুমুর স্বামী মার্ক এক নিমিষেই সবগুলো লাগেজ উপরতলায় তুলে নিল। বাড়িটিতে সেন্ট্রেল হিটিং এর ব্যবস্থা আছে। আমরা যখন কানেক্টিকাট স্টেটে যাই তখন সেখানে বেশ ঠান্ডা। ঘরের টেম্পারেচার বাড়ানো কমানো সব কিছু রুমু দেখিয়ে দিয়েছে। পুরো দুটি বেড রুম। প্রতিটি রুমের সাথে আছে ওয়াসরুম। ওয়াসরুম গুলিতে বাথটাব আছে। ইচ্ছে করলে গরম পানি ভরে ডুবে থাকা যায়। আমাদের চা নাস্তা করার জন্য সব ব্যবস্থাই করে রেখেছে তারা। শুধু আমাদের খাওয়া দাওয়ার জন্য রুমুদের বাসায় যেতে হবে। আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে রুমুদের বাসা খুর দূরে নয়। পায়ে হেঁটে যাওয়া যায়। নিশি আমাদের সাথে থাকায় তার গাড়িতে করেই আমরা যেতাম।
সাথে থাকায় তার গাড়িতে করেই আমরা যেতাম। একদিন সকালে আমার স্ত্রী ডিম ভাজছে। এই সময় প্রচন্ড শব্দ শুরু হল। কিসের শব্দ। কিছুই বুঝতে পারছি না। এই শব্দটাকে বন্ধ করার কোন পদ্ধতিই আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। আমাদের সাথে নিশি থাকত। সে ছিল ঘুমে। ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি জানালাগুলো খুলে দিল তাতে শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। পরে জানতে পারলাম ঘরটিতে স্মোক ডিটেক্টর আছে। ডিম ভাজতে গিয়ে বেশী ভাজা হওয়ায় স্মোক ডিটেক্টর বারবার সিগন্যাল দিচ্ছিল। রুমুদের বাসায় আরেকদিন খাওয়ার জন্য গেছি। সেদিন একটা মজার কাহিনী শুনলাম। রুমুর আম্মু তার জামাই অর্থাৎ মার্ককে আব্বু ডাকতেন। এই আব্বু ডাকটা মার্কের একদম পছন্দ হত না। মুখ খুলে কাউকে কিছু বলত না। অত্যন্ত ভদ্র এবং শিক্ষিত ছেলে হওয়ায় বিষয়টা নিয়ে সে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি। ভাবি যতবারই আব্বু সম্বোধন করে তাকে ডাক দিতেন ততবারই সে বিরক্ত হত। একদিন উপায়ন্তর না পেয়ে বিষয়টি সে রুমুর কাছে প্রকাশ করে। রুমু তাকে বারবার বলছিল তাতে অসুবিধার কি আছে। আমাদের দেশে ছেলেকে আদর করে আব্বু ডাকা হয়। তাতে মার্ক খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এক সময় মার্ক তার ক্ষোভের কারণ রুমুর কাছে প্রকাশ করে। মার্ক ডিজনির আলাউদ্দিন সিরিজটা কয়েকবার সে দেখেছে। সেখানে একটি বাদরের চরিত্র ছিল। এই বাদরটাকে আলাদিন খুব আদর করত। সিরিজটাতে আলাদিন বাদরটাকে আব্বু বলে ডাক দিলেই সে তার কোলে চলে আসত। আলাউদ্দিন তাকে আদর করত। খাবার দিত কিন্তু বাদরামি সে ছাড়ত না। মার্ক মনে করেছে তার শাশুড়ি সম্ভবত তাকে বাদর মনে করে তাই এভাবে আব্বু বলে ডাকে। বিষয়টি শুনার পর আমরা হাসাহাসি করলাম। পরে আমি সহজ সরল মার্ককে আব্বুর অর্থ বুঝানোর পর সে কিছুটা আশ্বস্থ হয়েছিল।
উইন্ডসর শহরটি তেমন বড় নয়। ছোট খাটো ছিমছাম শহর। বাড়ীগুলো একটু বাংলো প্যাটার্নের। বৃটিশদের তৈরী করা আমাদের দেশের বাংলোর মত না হলেও প্রায় একই ধরনের। নিউ ইয়র্কের দালানগুলি উচ্চতার প্রতিযোগিতায় থাকলেও এখানে সেটা নেই। প্রতিটি বাড়ির সাথে আছে বিস্তর ফাঁকা জায়গা। অনেকেই সুন্দর ফুল, ফলের বাগান করেছেন। এখন শহরটিতে শীতের আমেজ থাকলেও শীত বিদায় হওয়ার সময় এসে গেছে। মনে হয়েছে গ্রীষ্ম আসার একটা আগাম বার্তা পাচ্ছি। প্রতিটি গাছে গাছে পাতা গজিয়েছে। ফুলের গাছগুলোতে সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটছে। আমরা যে বাসায় আছি সে বাসাটিতে ওয়াই ফাই করা আছে। একটা পাসওয়ার্ড দিয়ে ইন্টারনেট জগতে প্রবেশ করা যায়। আমেরিকায় প্রতিটি বাড়িতেই এখন ওয়াই ফাই আছে। ইন্টারনেট জগৎটা এখন মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেট হচ্ছে বিশ্বজোড়া কম্পিউটারের নেটওয়ার্ক, পৃথিবীর যে কোনা কম্পিউটারের সাথে যে কোনা কম্পিউটারের যোগাযোগ করা যায়। সারা পৃথিবীর কম্পিউটারগুলো ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত।
কানেক্টিকাট ষ্টেটের এই এলাকাটিকে বৃটিশ অভিবাসিরাই আবাদ করেছেন মনে হল। প্রতিটি জায়গার নামের সাথে ইংল্যান্ডর অনেক শহরের নাম আছে। মানচেষ্টার, বার্মিংহাম, বোষ্টন, নিউ ক্যাসল ইত্যাদি নামে শহরগুলি। আমার মনে হয়েছে বৃটিশরা এই এলাকায় এসে আবাদ করার পর আস্তে আস্তে তাদের জাতি ভাইদের নিয়ে এসেছেন। আমেরিকাতো একটি দেশ নয় এটা একটা মহাদেশ। নিউ ইয়র্ক বা কানেক্টিকাট ষ্টেটে যখন ঠান্ডা তখন কালিফোর্নিয়া বা এরিজোনায় প্রচন্ড গরম। কালিফোর্নিয়া বা এরিজোনা ষ্টেট হচ্ছে মরুভূমি। যেহেতু আমরা কিছুদিন কানেক্টিকাটে থাকব তাই দুই ধরনের কাপড় চোপড় নিয়ে আমাদের আসতে হয়েছে। কানেক্টিকাটের জন্য শীতের কাপড় আবার এরিজোনার জন্য সুতির কাপড় চোপড়। ঘর থেকে বের হয়ে মনে হল আমি যে শীতের কাপড় নিয়ে এসেছি সেগুলোতে শীত কুলোচ্ছে না। অগত্যা দীপের পুরানো জেকেট গায়ে দিয়ে বেরুতে হল। রাতে খাবার খেতে হবে রুমুদের বাসায়। মান্নান ভাবীকে দেখি না প্রায় বিশ বছর। সেই কবে আমাদের বাসার পাশে ভাড়াটিয়া থাকার সময় তাদের সাথে পরিচয়। ভাবী ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। একজন গৃহিনী হিসাবে চুপচাপ বাসায় থাকতেন। বাচ্চাদের পড়াশুনা, ধর্মীয় শিক্ষা সহ গান বাজনা শিক্ষার জন্য শিক্ষক নির্বাচিত করা, তাদেরকে আপ্যায়ন করা এগুলোই ছিল তার কাজ। পুরোদমে একজন গৃহিনী ছিলেন ভাবী। এখন তিনি আমেরিকার নাগরিক, শুনেছি নিজে চাকুরী করেন। বাসায় তাদের ছেলে তানভির আছে। খাবার খেতে গেলে ভাবী আর তানভিরের সাথে দেখা হবে। এই তানভিরের জন্ম হয়েছিল সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে। মান্নান ভাই সেদিন হাওড়ের বাঁধ দেখতে গেছেন। ভাবীর প্রচন্ড প্রসব ব্যথা শুরু হল। সাথে সাথেই নেওয়া হল সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে। ফুটফুটে সুন্দর তানভির পৃথিবীকে আলোকিত করে আসল। এখন সে অনেক বড় হয়েছে। কানেক্টিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েশন করছে। এগুলো চিন্তা করতে করতেই রওয়ানা দিয়েছি রুমুদের বাসায়।
রুমু এবং মার্কের উইন্ডসর শহরে চারটি বাড়ি। আমেরিকানদের আবার বাড়ি কিনতে পুরো টাকা একসাথে দিতে হয়না। ভাল চাকুরী থাকলে ব্যাংক থেকে তাদেরকে লোন দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে কিছু বিনিয়োগ করলেই ব্যাংক বাকী টাকা দিয়ে দেয়। বাড়ি ভাড়া দিয়ে যা পাওয়া যায় তাতে এক সময় এই লোন পরিশোধ হয়ে যায়। জেট লেগের কারণে সারা দিনটাই ঘুমিয়ে কাটাতে হয়েছে। আমাদের থাকার জায়গা থেকে একদম কাছেই রুমুদের অপর বাসাটা। ভাবীকে দেখে আগের কিছুই খুজে পাচ্ছিনা। সেই সুন্দরী মহিলাকে এখন জানি কেমন লাগছে । তাছাড়া মুখ, ঠোট ফোলা, তাহলে কি কোন অসুখে ভুগছেন তিনি। মাঝে মাঝে হাঁচি দিচ্ছেন। আমাদের সাথে কথা বলতে কেমন জানি অস্বস্থিতে ভুগছেন। পরে জানলাম বসন্ত আসা শুরু হলেই ভাবীর এই অসুস্থতা শুরু হয়ে যায়। বসন্তকালে গাছে গাছে ফুল ফোটে, অপূর্ব তাদের সৌন্দর্য। কবিরা এই ফুল দেখে দিস্তার পর দিস্তা কবিতা লিখেন, শিল্পীরা প্রকৃতি দেখে ক্যানভাসের পর ক্যানভাস ছবি আঁকেন, গায়কেরা গলা ছেড়ে গান ধরেন কিন্তু ভাবীর এই আবহাওয়াটা মোটেও সহনীয় নয়। বসন্ত আসার আগাম বার্তা এলেই ভাবীর কষ্টটা বেড়ে যায়। ফুল থেকে অদৃশ্য পুস্পরেণু বাতাসে ভেসে বেড়ায় আর নিশ্বাসে সেটা যাচ্ছে তার শরীরে। শুরু হয়ে যায় এলার্জি। একদিকে হাঁচি আর অপরদিকে মুখ, চোখ ফুলে যায়। এলার্জির এই ভয়াবহ আক্রমণের ফলে তার শরীর, মন কিছুই ভাল থাকে না। ভাবী আমাদের সাথে কথা বলছেন সাবলিল ভাবে কিন্তু তারপরেও মনে হয় তিনি অস্বস্থিতে ভুগছেন। রাতের খাবারের মাঝে সালাদ, স্যুপ এর সাথে মার্ক আমার জন্য নিয়ে এসেছে ডায়েট আইসক্রিম। সে আমার ব্যাপারে জেনে গেছে। আমার সুগারের সমস্যা আাছে তাই সবার জন্য অন্য আইসক্রিম আনলেও আমার জন্য ডায়েট আইসক্রিম নিয়ে এসেছে। রাতে আমি শক্ত খাবার খাই না। এটা অনেক বছরের অভ্যাস তাই সালাদ এবং স্যুপ খেয়েই আমি রাতের খাবার শেষ করলাম।
পরদিন সকালে আমাদের উইন্ডসর শহরটাকে ঘুরে ফিরে দেখা। এই শহরে আর বাঙালি আছে বলে মনে হল না। মাঞ্চেস্টার আর নিউ উইন্ডসর শহরের মধ্যখানে একটা অগ্নিকুন্ড আছে যেখানে ঠান্ডার সময় সবাই আশে পাশে দাঁড়িয়ে গরমের স্বাদ নেন। আমাদের দেশে যেমন গরমের দিনে এসির ভেতরে থেকে একটা ঠান্ডার আমেজ নেওয়া হয় আমার কাছে মনে হল সে রকমই। অবশ্য ঘরের ভিতরে সবারই সেন্ট্রাল হিটিং থাকায় বাইরের ঠান্ডা বুঝা যায় না। আমরাও এই অগ্নিকুন্ডের পাশে গিয়ে বাইরের ঠান্ডাকে পাশ কাটিয়ে গরমের আমেজ নিলাম। এই অগ্নিকুন্ডটা প্রাকৃতিক নয়। এটা এই শহর প্রশাসন অর্থাৎ পৌর কর্তৃপক্ষের করা। (চলবে)