- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ- কালীবাড়ি মন্দিরের ভূমি গ্রাসের অপচেষ্টা

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি মন্দিরের ১ কোটি ৯০ লাখ টাকার মূল্যবান ভূমি বার বার নানাভাবে গ্রাস করার অপচেষ্টা করছে ভূমিখেকোরা। এবার ভয়াবহ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নতুন করে মন্দিরের ভূমি গ্রাস করার চেষ্টা করছে একটি চক্র। কিন্তু জালিয়াত চক্রের জাল-জালিয়াতির বিষয়টি ধরে পরে যাওয়ায় আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে।
যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত, সুনামগঞ্জ-এ স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করেছেন শ্রী শ্রী কালী বাড়ী মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অ্যাড. স্বপন কুমার দাস রায় (সত্ব মোকদ্দমা নং-৯৫/২০১৬)। গত ২৬ জুন মামলা দায়ের করেন তিনি।
মামলার আরজি মোতাবেক জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামের মৃত মুকুন্দ দাসের ছেলে বিন্দু দাস, জমির আলীর স্ত্রী সূচিত্রা বেগম, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার, বাংলাদেশ সরকার পক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক, সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ ৩৬ জনকে বিবাদী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আদালত মামলাটি গ্রহণ করে বিবাদীদের বিরুদ্ধে সমন জারীর নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিবাদীরা যাতে কালীমাতার ১৫৪৮ দাগের ভূমি সম্পর্কে কোন হস্তান্তরসূচক দলিল সৃজন করতে না পারেন তৎমর্মে কেন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে না এই মর্মে ৭দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর আদেশ দিয়েছেন। Kalibari-Mondir sk
মামলা সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার তেঘরিয়া মৌজার ১৪৪ নং জে,এল-এ ১৮২৬ নং এস,এ খতিয়ান ও  এস,এ ১৫৪৩, ১৫৪৪, ১৫৪৫, ১৫৪৮, ১৫৫২ ইত্যাদি দাগসমুহে ১৯ একর (উনিশ শতক) ভূমিতে  ১৩০২ বাংলা সনে শ্রী শ্রী কালীমাতা দেবীর মন্দির সহ নাট মন্দির ইত্যাদি স্থাপিত হয়। বৃটিশ শাসনামলে সেবাইত মারফতে এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে পূজারী মারফতে এবং পরিচালনা কমিটি মারফতে শ্রী শ্রী কালীমাতা দেবীর সেবা পূজা এবং ভূম্যাদি রক্ষণাবেক্ষণ হতে থাকে। এস.এ ১৫৪৮ দাগের ভূমি বাদী দেবতার মালিকানাধীন ভূমি । এস, এ জরীপের প্রাথমিক পর্যায়ে ১৫৪৮ দাগের সাকুল্য ১৯ শতক ভূমি বাদী দেবতার পক্ষে মন্দিরের তৎকালীন পুরোহিত মধুসূদন ত্রিবেদী নামে ডিপি খতিয়ানে প্রাথমিক রেকর্ড হয়। পরবর্তীতে উক্ত ১৯ শতক ভূমি ভুলবশতঃ সুখাইড়ের জমিদার পরিবারের অন্যতম সদস্য সুনামগঞ্জ শহরের মনোরঞ্জন রায় চৌধুরীর পিতা মথুর চন্দ্র রায় চৌধুরী নামে এস,এ ১৮২৬ নং ফাইন্যাল খতিয়ানে রেকর্ড হয়। এস.এ রেকর্ডের ভুলের বিষয়টি জানার পর দেবতা পক্ষে মনোরঞ্জন রায় চৌধুরীসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে এস,এ রেকর্ড সংশোধনের জন্য সুনামগঞ্জের তৎকালীন মুন্সেফ আদালতে ৮৯/১৯৭০ নং বিবিধ মামলা দায়ের করেন। ওই  মামলায় মনোরঞ্জন রায় চৌধুরী এবং তার আপন ভাই মনমোহন রায় চৌধুরী, পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ, সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক ও শত্রু সম্পত্তি বিভাগের তহশীলদার প্রতিপক্ষ ছিলেন। তৎকালীন মুন্সেফ এম,এম রুহুল আমিন ( পরবর্তীকালে প্রধান বিচারপতি) নালিশা দাগের সাকুল্য ভূমি বাদী দেবতার স্বত্ব দখলীয় দেবোত্তর সম্পত্তি মর্মে রায় প্রদান করেন। বিজ্ঞ মুন্সেফ দেবতা পক্ষের আনা উক্ত ৮৯/১৯৭০ নং মিস কেইস ০৮/০৬/১৯৭০ ইং তারিখের রায় আদেশ মূলে মঞ্জুর করেন এবং ওই ভূমি বাদী দেবতার নামে রেকর্ড প্রস্তুতের নির্দেশ দেন। কিন্তু ওই ভূমির মালিকানা সংশোধন করা হয়নি।
সম্প্রতি চলতি জুন মাসে ইব্রাহিমপুরের বিন্দু দাস এবং বিবাদী সুচিত্রা বেগম ১৫৪৮ দাগের ভূমি মনোরঞ্জন রায় চৌধুরীর উত্তরাধিকারী হিসাবে আর,এস জরিপে আপত্তি মামলা করে নিজেদের নামে তসদিককৃত খতিয়ান করে নেয়। এবং মন্দিরের ওই ভূমি অন্যত্র বিক্রয় করার উদ্যোগ নেয়। মিথ্যা উত্তরাধিকারী সনদপত্র সংগ্রহ করে নিজেদেরকে মনোরঞ্জন রায় চৌধুরীর কল্পিত ওয়ারিশ দাবি করার বিষয়টি কালীমাতার মন্দির পরিচালনা কমিটি জানতে পেরে আদালতে এই মামলা দায়ের করেন।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সুখাইড়ের বিখ্যাত জমিদার রায় বাহাদুর মথুর চন্দ্র রায় চৌধুরীর পুত্র মনোরঞ্জন রায় চৌধুরী ও মনমোহন রায় চৌধুরী। সুনামগঞ্জ শহরের বর্তমান ট্রাফিক পয়েন্ট অর্থাৎ আলফাত উদ্দিন স্কয়ারের কাছে তাহাদের বাসাবাড়ী ছিল। মনোরঞ্জন রায় চৌধুরী একজন আইনজীবী ও সংস্কৃতিমনা সঙ্গীত অনুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি একসময় সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরীর (বর্তমানে শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগার) সেক্রেটারী ছিলেন। মনোরঞ্জন রায় চৌধুরী পাকিস্তান আমলে এদেশ ত্যাগ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা শহরে চলে যান। তার পুত্র কন্যাগণ আগে থেকেই কলকাতাতে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে তিনি ভারতেই মারা গিয়াছেন। তার ভাই মনমোহন রায় চৌধুরী এদেশে মারা গিয়াছেন। তার নাতি মোহন চৌধুরী বাড়ীতে এবং সিলেট শহরে বসবাস করেন। মনোরঞ্জন রায় চৌধুরীর কোন পুত্র বা পুত্রের দিকের নাতি এদেশে বসবাস করেন না। বিন্দু দাস ও সুচিত্রা বেগম জমিদার মনোরঞ্জন রায় চৌধুরীর কোন উত্তরাধিকারী নয়। ভূমি খোকো ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ মদদে তারা মিথ্যা ও জালিয়াত কাগজপত্র সৃষ্টি করে কালীমাতার এস,এ ১৫৪৮ দাগের ভূমি গ্রাস করার উদ্দেশ্যে আর.এস জরিপ সংক্রান্ত কাগজপত্র জালিয়াতি করে সৃজন করেন।
মামলার বাদী কালী বাড়ী মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অ্যাড. স্বপন কুমার দাস রায় বলেন, ‘ইব্রাহিমপুর গ্রামের বিন্দু দাস ও সূচিত্রা বেগম সুখাইড়ের জমিদার মনোরঞ্জন রায় চৌধুরীর কোন উত্তরাধিকারী নয়। তারা সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় জাল-জালিয়াতি করে নিজের নামে জালিয়াতি কাগজ সৃষ্টি করেছে। তাই মন্দিরের পক্ষে জালিয়াতকারীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তাদের বিরুদ্ধে সমন জারীর নির্দেশ দিয়েছেন এবং তারা যাতে কালীমাতার ভূমি সম্পর্কে কোন হস্তান্তরসূচক দলিল সৃজন করতে না পারে তৎমর্মে কেন নিষেধাজ্ঞা হইবে না এই মর্মে কারণ দর্শানোর আদেশ দিয়েছেন।’

    

  • [১]