আকরাম উদ্দিন
প্রতি বছর সরকার মোটা অংকের রাজস্ব পেলেও দীর্ঘ ৮২ বছরেও ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলকাটা বাজারের আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি। বাজারের পরিকল্পিত উন্নয়ন না হওয়ায় বেচাকেনায় নানা ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। মঙ্গলকাটা বাজারের যথাযথ উন্নয়নের দাবি ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের।
মঙ্গলবার দুপুরে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সহ-সভাপতি মো. বশির আহমদ, সদস্য আব্দুল মোতালিব, শাহাজ উদ্দিন, আব্দুল লতিফ, হানিফ মিয়া ও একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এই মঙ্গলকাটা বাজার। কিন্তু বাজারের আশানুরূপ উন্নয়ন নেই। সুরমা নদীর উত্তরপাড়ের জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের মঙ্গলকাটা গ্রামের নামে এই বাজারের নামকরণ হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল ও বিভিন্ন পণ্য জেলার বাইরে রপ্তানী করার মাধ্যমে প্রায় ৮২ বছরে এই বাজার ঐতিহ্যবাহী হয়ে উঠে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন মঙ্গলকাটা বাজারের সুনাম ছড়িয়ে আছে। স্থানীয়রা ও আশপাশ এলাকার এবং সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জেলার বাইরের বিভিন্ন স্থানে সহজ পরিচয় দিতে গিয়ে মঙ্গলকাটা বাজারের নাম বলে থাকেন। এতে মানুষও সহজে চিনে নিতে পারেন।
এই মঙ্গলকাটা বাজার থেকে যানবাহন করে ঐতিহ্যবাহী কাংলার হাওরপাড়ের বনগাঁও বাজার, নৈগাং বাজার, হাসাউড়া বাজার, পাহাড়টিলায় অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বেষ্টিত আনারসবাগ, দর্পগ্রামের উঁচু টিলায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন প্রকৃতিপ্রেমিরা। মঙ্গলকাটা বাজার থেকে চলতিনদী পার হয়ে বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও অন্যান্য উপজেলায় সড়ক পথে যাওয়া যায়। মঙ্গলকাটা বাজার থেকে সড়কের দুই পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে দোয়ারাবাজার বাঁশতলা শহীদ মিনার ও ছাতক উপজেলার ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত অতি সহজে পৌঁছা যায়। সুরমার উত্তরপাড়ের বিভিন্ন স্থানে যেতে এই মঙ্গলকাটা বাজারটি একটি কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলকাটা বাজারটি দলাই নদীর উভয় পাড় জুড়ে অবস্থিত। এতে প্রায় ৫ শতাধিক স্থায়ী ব্যবসায়ী রয়েছেন। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী গরু-ছাগলের বাজার, মুরগের বাজার, মাছের বাজার, সবজির বাজার, ফলের বাজার, দুধের বাজার, বাঁশ বেতের বাজার রয়েছে। এই বাজারে সপ্তাহে দুইবার হাট বসে। রবিবার ও বৃহস্পতিবার এই বাজারের হাটবার। কিন্তু সারা সপ্তাহ চলে জমজমাট বেচাকেনা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের শাখা, কাজী অফিস, পল্লীবিদুতের অফিস সহ অন্যান্য বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার অফিস রয়েছে এই বাজারে। বাজারের ভেতরে রয়েছে জামেয়া মসজিদ। দলাই নদীর উভয়পাড়ে বিশাল এলাকাজুড়ে এই মঙ্গলকাটা বাজার অবস্থিত।
বাজারের ভেতরের ৮টি গলি যেন আবর্জনার ভাগাড়। গলির ভেতরের রাস্তার পাকাকরণ নেই। মাটি ভরাট নেই। এই কারণে প্রতিবছর বর্ষায় দলাই নদীর পানি প্রবেশ করে একাধিকবার তলিয়ে যায় পুরো বাজার। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন বাজারের সকল ব্যবসায়ী। বাজারের প্রবেশদ্বার দিয়ে বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসা সড়কেরও কোনো উন্নয়ন নেই। সামান্য বৃষ্টিতে পানি জমে কাদার সৃষ্টি হয়। এজন্য বাজারের টেকসই উন্নয়নের দাবি স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের।
মঙ্গলকাটা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বুরহান আহমেদ চৌধুরী বলেন, ঢলের পানি থেকে বাজার রক্ষায় দলাই নদীর উভয়পাড়ে বেরীবাঁধ নির্মাণের জন্য ২০১৯ সালের প্রথম দিকে ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছিল। কিন্তু ভাল কাজ হয়নি। বেরিবাঁধের কাজ সামান্য করা হয়েছিল। ২০০৪ সালে ৩০ লাখ টাকা সরকারী বরাদ্দ পেয়ে মাছের বাজার তৈরি করা হয়েছে। বাজার উন্নয়নে আমরা কোনো সময় আশানুরূপ বরাদ্দ পাইনি। আমরা নিজেরা বাজারের বিভিন্ন অংশের উন্নয়ন কাজ করেছি। অথচ প্রতি বছর সরকার লাখ লাখ টাকা এই বাজার থেকে রাজস্ব পায়। প্রতি বছরের মতো এবারও এই বাজার ৩২ লাখ টাকা ইজারা দেয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ উত্তর সুরমা উন্নয়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আব্দুর রব বলেন, সদর উপজেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলকাটা বাজার। কিন্তু এ পর্যন্ত এই বাজারের সরকারীভাবে আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি। এই বাজারের সুনাম ছড়িয়ে আছে জেলার বাইরের বিভিন্ন স্থানে। জেলা ও বাইরের পর্যটকদের চা-নাস্তা খাওয়ার কেন্দ্রস্থল এই বাজার। এই বাজারের সার্বিক উন্নয়ন জরুরি প্রয়োজন।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াসমিন নাহার রুমা বলেন, এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মঙ্গলকাটা বাজারের বিভিন্ন স্থানে সংস্কার কাজ হয়েছে। গরুর বাজারে ও শেড তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও কমিটির লোকজন বাজারের উন্নয়নের জন্য আমার কাছে আবেদন করলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবো।