- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রপতি- হাওর রক্ষায় নদীকে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করতে হবে

বিশেষ প্রতিনিধি
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন,‘নদীর গভীরতার চেয়ে হাওরের মাঝখানের গভীরতা এখন বেশি। হাওর বাঁচাতে হলে নদ-নদীর উৎসস্থল থেকে ভৈরববাজার পর্যন্ত ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় না আনলে হাওরাঞ্চলকে রক্ষা করা যাবে না। তাতে টাকা বেশি লাগবে। কিন্তু এর কোন বিকল্প নেই। মাটির বাঁধ বছরে বছরে দিতে হয় এবং দুর্নীতিও হয়। এভাবে হবে না।
সোমবার রাত সাড়ে ৯ টা থেকে প্রায় সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাসনরাজা মিলনায়তনে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিশিষ্টজনদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সময় রাষ্ট্রপতি এমন মন্তব্য করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন,‘হাওরাঞ্চলের বিপন্ন মানুষদের পাশে এবার প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নিয়ে না দাঁড়ালে কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকামুখী হবে সকল মানুষ। তখন রাজধানীও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে ওঠবে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন,‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে ইতিপূর্বে বলেছি, এবার গিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলবো’।
আগামী চৈত্র মাস পর্যন্ত খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্যের চাল বিক্রির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন,‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই মতবিনিময় সভায় সকলে যেভাবে বললেন-আপনারা বাঁধ নির্মাণের সময় সকলে এভাবে সোচ্চার থাকলে দুর্নীতি হতো না।’
রাষ্ট্রপতি মঞ্চে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে বলেন,‘আগামী  ২ মে হাওরাঞ্চলের দুর্যোগ নিয়ে সমস্বরে সংসদে কথা বলতে হবে। না কাঁদলে দাবি আদায় হবে না।’
রাষ্ট্রপতি বলেন,‘সুনামগঞ্জের মানুষ যখন হাওরের ফসল ডুবি নিয়ে কান্না শুরু করেন এর ২৪ ঘণ্টা পর আমাকে কাঁদতে হবে এমন প্রস্তুতি নিতে হয়। কারণ এখানকার পানি কিশোরগঞ্জের হাওরের দিকে গিয়ে নামে।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে জাতির দুর্যোগের সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার জন্য সুনামগঞ্জে এসেছিলাম। ঐ সময়ও        
জয়ী হয়েছি। আবার কারো দাওয়াত ছাড়াই দুর্যোগের সময় এসেছি। অবশ্যই এই আসায় কিছু না কিছু ফল হবে।’
বক্তব্যের শুরুতেই রাষ্ট্রপতি মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা স্মৃতিচারণ করে বলেন,‘সুনামগঞ্জের সঙ্গে বহুকাল পূর্বের সম্পর্ক আমার । ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে এসেছিলাম। ৪ দিন না খেয়ে ছিলাম। তাহিরপুরে আব্দুজ জহুর সাহেবের বাড়িতে গিয়ে সুটকি তরকারি দিয়ে পেট ভরে খেয়েছিলাম।’ তিনি যুদ্ধকালীন সময়ের নানা স্মৃতিচারণ করার সময় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুস সামাদ আজাদ, আব্দুজ জহুর, দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, আব্দুর রইছ, শামছু মিয়া চৌধুরী, আব্দুল হেকিম ও আব্দুল হক’এর নাম স্মরণ করে বলেন,‘তাঁরা কেউই এখন বেঁচে নেই।’ তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম হোসেন বখ্ত’এর ছেলে পৌর মেয়র আয়ুব বখ্ত জগলুল, দেওয়ান ওবায়দুর রাজার ছেলে দেওয়ান ইমদাদ রেজা এবং মরহুম আব্দুর রইছ’এর ছেলেদের দেখে নিজের ভাল লাগার কথা জানিয়ে বলেন,‘যুদ্ধকালীন সময়ে আমার অনেক ¯েœহাস্পদ সিরাজ, জগজ্যোতি ও করিম এই অঞ্চলের যুদ্ধে মারা গেছেন’। তিনি তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী’র কথাও বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন,‘সুনামগঞ্জে না আসার দুঃখ ছিল আমার। এবার সে সুযোগ হয়েছে। তবে এমন সুযোগ আমি চাই না। এমন দুর্যোগ যেন আর কখনো না হয়।’
রাষ্ট্রপতি বলেন,‘আমি বার বার নির্বাচিত হয়েছি, কিন্তু সরকারে থাকা হয়নি। ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার এবং রাষ্ট্রপতি এসব পদ নিরপেক্ষ।’ রাষ্ট্রপতি বলেন,‘হাওরাঞ্চলে ডুবন্ত সড়কের কাজ আমার চেষ্টায় শুরু হয়েছে। প্রথমে সংশ্লিষ্টরা বলেছিলেন, এটা সফল হবে না। কিন্তু এখন এটি সারাদেশেই হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি, মুহিবুর রহমান মানিক এমপি, ড. জয়া সেন গুপ্তা এমপি, ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এমপি রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক, অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ এমপি, অ্যাড. শামছুন নাহার বেগম শাহানা এমপি, বিভাগীয় কমিশনার ড. মোছাম্মৎ নাজমান আরা খানুম, ডিআইজি কামরুল আহসান, পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ্ খান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আয়ুব বখ্ত জগলুল, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড. আব্দুল মজিদ, শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে, হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, সাংবাদিক কামরুজ্জামান চৌধুরী সাফি, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, আবুল কালাম, অ্যাড. শামছুল আবেদীন, অবনী মোহন দাস, পঙ্কজ দে, বিজন সেন রায়, জেলা পরিষদ সদস্য সেলিনা বেগম, আল হেলাল প্রমুখ বক্তব্য দেন।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে মতবিনিময় সভা শুরু হয়। এরপর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা তাজুল ইসলাম, পবিত্র গীতা পাঠ করেন নেজারত ডেপুটি কালেকটর অঞ্জন দাস, পবিত্র বাইবেল পাঠ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শুভন রামসা এবং পবিত্র ত্রিপিটক পাঠ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট স¤্রাট খীসা।
এর আগে বেলা ২ টা ২০ মিনিটে সুনামগঞ্জের পুলিশ লাইন্স মাঠে এসে অবতরণ করেন রাষ্ট্রপতি। বেলা আড়াইটায় সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছান তিনি। সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যেই ২ টা ৪৫ মিনিটে সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে ক্ষয়ক্ষতির ২০ মিনিটের ভিডিও চিত্র উপস্থাপন করেন জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। এসময় অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, মুহিবুর রহমান মানিক এমপি, ড. জয়া সেন গুপ্তা এমপি, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এমপি রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক, অ্যাড, পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ এমপি, অ্যাড. শামছুন নাহার বেগম শাহানা এমপি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আয়ুব বখ্ত জগলুল, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. শামীমা শাহ্রিয়ার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বিকাল সাড়ে ৫ টায় সার্কিট হাউস মিলনায়তনে জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন রাষ্ট্রপতি।
এরপর ডিএস রোডের ‘ঐতিহ্য যাদুঘর’ পরিদর্শনে যান রাষ্ট্রপতি।
চৈত্রের আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে বের হয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। তিনি তিন দিনের সফরের প্রথম দিন হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে রোববার দুপুর আড়াইটায় মিঠামইনে আসেন। সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার বেলা ১২ টায় রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ মিঠামইন থেকে হেলিকপ্টারযোগে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এসময় লো-ফ্লাই করে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, ধর্মপাশা, শাল্লা, দিরাই ও বিশ্বম্ভরপুরের ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকার অবস্থা দেখেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি লো-ফ্লাই করে হাওর ঘুরে দেখার সময় অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি ও কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের রেজওয়ান আহমেদ এমপি তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

  • [১]