- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মনুষ্যত্বই পরমধর্ম- বুঝালেন দ. সুনামগঞ্জের ময়না ডাক্তার

বিশেষ প্রতিনিধি
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে হতদরিদ্র জয়ন্তি বিশ^াস’এর বিয়েতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন জয়ন্তি’র মুসলিম বাবা (ধর্মস্থ পিতা) পল্লী চিকিৎসক আব্দুুন নূর ময়না। শুক্রবার রাতে হিন্দু শাস্ত্রমতেই হওয়া বিয়েতে আগাগোড়াই উপস্থিত থেকে পিতার কর্তব্য পালন করেছেন আব্দুন নূর ময়না। জয়ন্তি’র বাড়ী দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস এবং আব্দুননূর ময়না’র বাড়ী একই উপজেলার সদরপুর গ্রামে। আব্দুননূর ময়না দক্ষিণ সুনামগঞ্জের উপজেলা সদর শান্তিগঞ্জে ফার্মেসী ব্যবসা করেন।
জয়ন্তি’র বাবা হরকুমার বিশ^াস এবং মা সুরধ্বনি বিশ^াস মারা গেছেন ১২ বছর আগে। জয়ন্তির বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায়ই তার বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। সহজ সরল মৎসজীবী ভাই প্রফুল্ল বিশ^াস কোনোভাবে সংসার চালান।
হরকুমার ও সুরধ্বনি মারা যাবার পর জয়ন্তি পল্লী চিকিৎসক আব্দুন নূর ময়নাকে বাবা (ধর্মস্থ) বলে ডাকে। সেই থেকে আব্দুননূর ময়নাও মেয়েটিকে সন্তানের মতোই ¯েœহ করেন। মাঝে মাঝে আর্থিক সহযোগিতা, অসুস্থ হলে বিনে পয়সায় ওষুধ দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার রাতে জয়ন্তি’র বিয়ে হয়েছে জেলার ছাতক উপজেলার মর্জা গ্রামের রাজিন্দ্র বিশ^াসের ছেলে গৌরাঙ্গ বিশ^াসের সঙ্গে। বিয়েতে সাধ্যমত সহযোগিতা করেছেন আব্দুননূর ময়না।
সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মেয়ে জয়ন্তি’র বিয়ে সম্পন্ন হবার পর আব্দুননূর ময়না মেয়ে জয়ন্তিকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ফেইসবুকে ছবি পোস্ট করে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, মেয়েটির নাম জয়ন্তি, পিতৃহারা মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই আমাকে বাবা বলে ডাকে, আমার কোনো কন্যা সন্তান না থাকায় ওকে আমার নিজের মেয়ে বলেই জানি, সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আদর ¯েœহ, ভালোবাসা দেবার চেষ্টা করেছি সব সময়। বাবার অভাব বুঝতে দেইনি কোনদিন, বাবা মুসলিম, মেয়ে সনাতন ধর্মবলম্বী হলেও আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র। মেয়েকে বেশি পড়াশুনা করাতে না পারলেও একজন ভাল মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠতে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। আজ মেয়েটির বিয়ে হলো, ভালো পাত্রের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পেরে আমি আনন্দিত, সবাই আমার মেয়ের সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য দোয়া করবেন।’ তাঁর এই স্ট্যাটাস স্থানীয়ভাবে ভাইরাল হয়।
খোঁজ নিতে স্থানীয় সাংবাদিকরা জয়ন্তি’র জয়কলস’এর বাড়িতেও যান।
জয়ন্তি’র কাকা সুধারঞ্জন বিশ^াস বলেন, ‘আব্দুননূর ময়না’র (ময়না ডাক্তারের) প্রতি কৃতজ্ঞ আমরা। মেয়ের মতোই দেখেছে সে জয়ন্তিকে, বিয়েতেও সাধ্যমত সহযোগিতা করেছে। একই কথা বললো জয়ন্তি’র ভাই প্রফুল্ল বিশ^াসও।
গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জয়ন্ত তালুকদার পল্টন বলেন, জয়ন্তিকে মেয়ের মতোই দেখেছেন আব্দুননূর ময়না। জয়ন্তি’র বিয়েতে সহযোগিতা করতে পেরে তিনি খুশী। তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসও অনেকের আবেগে নাড়া দিয়েছে।
শোভন দেব নামে একজন তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘মেয়েটির বাবা হরকুমার বিশ্বাস এবং মা সুরধ্বনি বিশ্বাস গত হয়েছেন অনেক আগেই। অসহায় পরিবারটির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিলো যখন., ঠিক তখনই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন ডা. ময়নাভাই। পরিবারটি’র দেখাশুনা করতেন প্রতিনিয়ত। কোনোদিন জয়ন্তি বিশ্বাসকে বুঝতেই দেননি তার বাবার (হরকুমার বিশ্বাস) অভাব। খুব দ্বায়িত্ব নিয়েই এবার একজন সুপাত্রের হাতে তুলে দেন মেয়েটিকে। সম্প্রীতিহীনতা, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে সমস্ত দক্ষিণ এশিয়া জ্বলছে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি চলছে, ধর্মের ভিত্তিতে সমস্ত উপমহাদেশে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হচ্ছে। তখনই এমনতর মহৎ কাজ করলেন ময়না ডাক্তার…. । এমনতর অসাম্প্রদায়িক মানুষগুলো সহ¯্রবছর বেঁচে থাকুক।’
আব্দুননূর ময়না এ প্রতিবেদককে বলেন, জয়ন্তি’র বিয়েতে আবেগপ্রবণ ছিলাম আমি। মেয়ের বিয়েতে বাবার যেমন হয়। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তোলা ছবি দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। এই স্ট্যাটাসকে সকলে এমন গুরুত্ব দেবেন ভাবিনি আমি। আমার কাছে মনুষ্যত্বই পরমধর্ম। আমি ইসলামের অনুসারী অতএব ¯্রষ্টার পরেই মানুষের গুরুত্ব আমার কাছে।

  • [১]