বিশেষ প্রতিনিধি
মহাজনী ঋণের জালে বন্দি হয়ে আছে সুনামগঞ্জ শহরতলির কোরবাননগর ইউনিয়নের মাইজবাড়ি গ্রামের প্রায় ৩ হাজার নৌকামিস্ত্রি। শত বছর ধরে নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসা এই মানুষগুলো দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র হচ্ছে। হাড়ভাঙা খাটুনি দিলেও পুঁজি সংকটের কারণে মহাজনী ঋণ নেওয়ায় তাদের লাভের টাকা যাচ্ছে মহাজনের হিসাবে। অথচ. রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংক বা সরকারি অন্য কোন সহায়তা সংস্থা সহজ শর্তে ঋণ দিলে এই মানুষগুলোর দুর্দিন গুছে যেত।
সদর উপজেলার বৃহৎ গ্রাম কোরবাননগর ইউনিয়নের বৃহৎ গ্রাম মাইজবাড়ী। কমপক্ষে ৬ হাজার মানুষের বাস এই গ্রামে। কাঠমিস্ত্রীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ। এর মধ্যে নৌকা তৈরির মিস্ত্রী আছেন কমপক্ষে ৩ হাজার। বলা হয়ে থাকে প্রায় দেড়’শ বছর আগে ইয়াছিন বখ্ত নামের একজন কাঠমিস্ত্রি প্রথম এই গ্রামে নৌকা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। এক সময় কোষা নৌকা, পাতাম নৌকা, বারকী নৌকা, কিলুয়া নৌকা, জুইত নৌকা তৈরি করতেন এই গ্রামের কাঠমিস্ত্রিরা। এখন এসব নৌকার কদর কিছুটা কমেছে, চাহিদা বেড়েছে ভোলাগঞ্জি নৌকার। এরা বছরের পর বছর ধরে এসব নৌকা তৈরি করে সুনামগঞ্জের ছাতক ও সিলেটের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে সরবরাহ করছেন। নৌকার মিস্ত্রিরা জানালেন, হাড়ভাঙা খাটুনি তাদের, কিন্তু নৌকা বিক্রি করে এই গ্রামের কোন মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরঞ্চ. দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র হয়েছে, এক সময় যাদের জমি-জমা ছিল, এখন তারা ভূমিহীন। এক সময় যাদের বাড়িঘর ছিল, এখন তারা গৃহহীন। এই অবস্থার জন্য নিজেদের পুঁজিসংকট, ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে মহাজনদের কাছ থেকে টাকা এনে লোকসান দিয়ে নৌকা বিক্রি করাকে দায়ী করেন তারা।
গ্রামের পূর্ব পাড়ার কাঠমিস্ত্রি রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘৭০ বছর বয়স অইছে, এখন পর্যন্ত ই-কাম কইরা, কেউ উন্নতি করতে দেখছি না, পুঞ্জি (পুঁজি) না থাকায় পরের টেকায় (টাকায়) মাল কিইন্না নাও (নৌকা) বানাইতে যে টেকা খরচ অয় (হয়), বেছার (বিক্রির) সময় ই- টেকা পাওয়া যায় না, এই ভাবে চইল্লা আইছে বহুত বছর ধইরা, বছরে বছরে হকলেরঔ (সকলেরই) ঋণ বাড়ের’।
একই এলাকার কুতুব উদ্দিন জানান, টাকা দেবার সময় ভোলাগঞ্জের মহাজনেরা দর নির্ধারণ করে দেয়, একটি ভোলাগঞ্জি নৌকা কোন মহাজন আগে টাকা দিলে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি দর ধরেন না, অথচ নৌকা বানাতে খরচ হয় ৩২ হাজার টাকা। এই লোকসান ক্রমাগত হচ্ছে, প্রতি মৌসুমে লোকসানের অংক বাড়ে। লোকসানের টাকাসহ নিজেদের সংসার চালানোর খরচও আসে মহাজনের ঋণের টাকায়। এইভাবে মহাজনের ঋণ থেকে কখনোই বের হয়ে আসতে পারেন না তারা। একেকটি আলংয়ে (নৌকা বানানোর ঘর) ভোলাগঞ্জ বা ছাতকের মহাজনদের ১ থেকে ৫ লাখ টাকাও পাওনা আছে।
গ্রামের বয়স্ক মিস্ত্রি বশির উদ্দিন বলেন,‘দেড়’শ ফুট বালু-পাথর বহনকারী নৌকা ২৮-২৯ হাজার টাকায় বিক্রি করেন মাইজবাড়ির কাঠমিস্ত্রিরা, কিন্তু ভোলাগঞ্জের নৌকার পাইকাররা ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন এসব নৌকা, আমরা নৌকা তৈরি করে লোকসান দেই, অন্যদিকে তারা একেক নৌকায় ১০-১১ হাজার টাকা ব্যবসা করে আসছেন’।
কাঠমিস্ত্রি নাজিম উদ্দিন জানালেন,‘ব্যাংক থেকে নৌকা ব্যবসা করার জন্য ঋণ নেওয়া যাবে, একথা কেউ কোনদিন বলেনি তাদের, তারা ব্যাংকে এজন্য কোনদিন যাননি’। একই কথা বললেন, তরুণ মিস্ত্রি কলন্দর মিয়া ও মানিক মিয়া।
কোরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল বরকত বলেন,‘মাইজবাড়ি একটি বড় গ্রাম, বেশিরভাগ মানুষ নৌকা মিস্ত্রির কাজ করেন, তারা ব্যাংক থেকে বা সরকারি অন্য কোন সংস্থা থেকে ঋণ নেবার জন্য যে নিয়মে ব্যবসা করতে হয়, সেভাবে করলে আমিও তাদের ঋণ পাইয়ে দিতে সুপারিশ করবো, আমি চেষ্টা করবো তাদের সঙ্গে মাঝে-মধ্যে বসে কীভাবে মহজনী ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, সেই পথ বের করে দিতে’।