- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মহাদুর্যোগে হাওরবাসী

অ্যাড. নিরঞ্জন তালুকদার
এমন ভয়াবহ দুর্যোগে হাওরবাসী আর কোন সময় পড়েছিলেন কি না তা ৮০ বছরের কৃষকও মনে করতে পারেন না। বায়োবৃদ্ধ কেউ কেউ বলেন, চৈতে এত বৃষ্টি দু’একবার দেখেছেন, প্রায় বছরই কম বেশী কাঁচা পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু ধান বের হতে না হতেই সমগ্র হাওর অঞ্চল এভাবে অথৈ পানিতে তলিয়ে যেতে কেউ দেখেনি। সপ্তাহ পার হলেও এখনও যায়নি হাওরাঞ্চলের পঁচা দুর্গন্ধ। এই দুর্গন্ধে টিকা দায় হয়ে পড়েছে শহরে-গ্রামে। স্কুলে, বাসে, কর্মস্থলে বা বাড়িতে কারো বমির ভাব হচ্ছে, কারোর বা হচ্ছে শ্বাসকষ্ট। হাজার টন মাছ আর জলজ প্রাণীর মড়কে হাওর-নদী নালা এখন জলজ প্রাণী শূন্য হওয়ার উপক্রম। দেখা দিয়েছে হাঁসের মড়ক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধানগাছ পঁচে রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের প্রভাবে অ্যামোনিয়ার সৃষ্টি হয়ে অক্সিজেন কমে গিয়ে এই অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
হাওরপাড়ের সোনালী বৈশাখে সারা বছরের জীবন জীবিকা চলে, জীবন রঙ্গিন হয়ে উঠে। বৈশাখ নিয়ে কৃষক স্বপ্নের জাল বুনে। কৃষকের স্বপ্নে কালবৈশাখী থাবা দেয়, কিন্তু কৃষক লড়াই করে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে। এবার চৈতের আকাশ ঢাকা মেঘ আর বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির উৎসবে কৃষকের স্বপ্ন চাপা পড়ে। অথচ শীতের শুরু থেকে হাওররক্ষা বাঁধ শেষ করতে বিভিন্ন মহল দাবী জানিয়ে ছিলেন। বসন্তের শুরুতে এদেশের বৈশিষ্ট্যের মতই সুনামগঞ্জের রাজপথ মিছিল, মিটিংয়ে সরগরম ছিল। দাবী ছিল, দ্রুত বাঁধ নির্মাণ শেষ কর। পত্র পত্রিকায় অনবরত লেখালেখি হল, বাঁধ হচ্ছে না, দুর্নীতি হচ্ছে। কিন্তু যারা এটা দেখার কথা বসন্তের শেষেও তারা শীতের কাঁথা মুড়ি দিয়ে থাকলেন। পাউবোর ঠিকাদার আর পিআইসির লোকজন কোথাও নামকাওয়াস্তে কিছু মাটি ফেলে, কোথাও বা না ফেলে অন্যবছরের মত অপেক্ষায় থাকল, কৃষকরাই তাদের গরজে ফসল রক্ষার জন্য বাঁধ দিবে আর নিজেরা পাউবোর কর্মকর্তাদের সাথে কোটি কোটি টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নেবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষেও তাই অনেক বাঁধে কাজ শুরুই হল না। আগাম বৃষ্টি আর পাহাড়ী ঢলে ধান বের হওয়ার সময়ই হাওর তলিয়ে যেতে শুরু করল। ছায়ার হাওর রক্ষায় হাজার কৃষকের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেল। হারাধনের শেষ সম্বল পাগনা আর শনির হাওর রক্ষায় রীতিমত প্রায় মাসব্যাপী যুদ্ধে নামলেন কয়েকটি উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ। যাদের হাওরে জমি নেই তারাও আশায় ছিলেন হাওর দুটি রক্ষা পেলে ধান কেটেও তারা কয়েক মাসের খাবার সংগ্রহ করতে পারবেন। কিন্তু পাগনার ধান পাকার আগেই “মই” দিল পানি এবং দুর্যোগের দশা শনিতেও পূর্ণ হল।
পাগনা আর শনিতে শনির দশা ঠেকাতে লড়াই চলার সময়ই রাষ্ট্রপতি হাওরের দুর্দশা দেখলেন। বললেন, হাওরের এমন ক্ষতি অতীতে কখনও হয়নি। ভয়াবহ পরিণতির আশংকা করে সুনামগঞ্জে সর্বস্তরের মানুষ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবী তুললেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হাওরপাড়ের সন্তান হাওরবাসীর দুর্গতি বুঝলেন। কিন্তু “রোম যখন পুড়ে নিরু তখন বাঁশি বাজায়” আমাদের এক শ্রেণির আমলাদের এই অবস্থান জানান দিতেই যেন দুর্গত এলাকা দাবী কারীদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব। মন্ত্রী তো সচিবের এক কাঠি উপরে। প্রমাণ করতেই যেন, শনির দশা ঘটার পরে পানিসম্পদমন্ত্রী বললেন, কৃষকরাই বাঁধ কাটে। মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে সার বীজ কিনে, পৌষ মাঘের হাড় কাঁপানো শীতের ভোরে কাদা পানিতে যে কৃষক ধান বুনে, সরকারী কর্তা, ঠিকাদার আর প্রকল্প কমিটির বাঁধের লুটপাটের ক্ষতি পুষাতে যে কৃষক দিন-রাত, মাস ব্যাপী ঝড় বৃষ্টিতে বাঁধ নির্মাণ করে, বাঁধ ভাঙতে দেখে যার আহাজারিতে বুকের পাঁজর ভাঙ্গে; মন্ত্রী বললেন, সেই কৃষক বাঁধ কাটে। বাঁধের টাকা লুটপাটকারীরা একথা শুনে দাঁত খিলিয়ে, বগল বাজিয়ে সুখ নিদ্রায় যেতেই পারে। কৃষক তখন বলতেই পারেন, আহা! হিরক রাজার দেশে এমন কথা হতেই পারে।
এত কিছুর পরও রাষ্ট্রপতির উপর হাওরবাসীর ভরসা আছে। তাঁর সহমর্মিতা দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকেও হাওরবাসীর দুদর্শা অবগত করেছেন। হাওরবাসীর বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হাওরবাসীর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ হাওরবাসীর বাঁচার অবলম্বন হবে।
এবার হাওরাঞ্চলের কী ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে সেটা একমাত্র বুঝতে পারবেন এই অঞ্চলের মানুষ। হাওরবাসীর বাঁচার মূল অবলম্বন তাদের একমাত্র বোর ফসল। এছাড়া লাখো লোক হাওরে মাছ ধরে তাদের পরিবার নিয়ে জীবন জীবিকা চালান। নজির বিহীন ভাবে এবার শতভাগ হাওর ধান পাকার আগেই তলিয়ে গেল। মাছের ভয়াবহ মড়কের এমন চিত্র কেউ দেখেনি। চৈতে কোন কোন হাওর তলিয়ে যায়, আবার আধা পাকা ধানেও পানি উঠে, তখন আধা পাকা ধান উঠিয়ে বা যে হাওর তলিয়ে যায় না সেখানে ধান কেটে কোন রকম বেঁচে যেতে পারে কৃষক। বিকল্প থাকে মাছ ধরে চলা। এবার কোনটাই নেই। এখানে কলকারখানা নেই। বালু মহালে লাখো মানুষের কাজ ছিল, কিন্তু লুটেরা গোষ্ঠী যন্ত্রদানব দিয়ে সেই কর্মক্ষেত্রেও গুটিয়ে দিয়েছে। মরার উপর খাঁড়ার ঘার মতো লাগাতারা বৃষ্টি আর শিলাবৃষ্টিতে রবিশষ্য ও শাক সবজীর মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। গোল আলু, মিষ্টি আলু, লাউ (মিষ্টি কুমড়া) ভাতের বিকল্প হতে পারতো। এগুলো কয়েকমাস প্রাকৃতিক ভাবেই সংরক্ষণ হয়। এবার এগুলোরও আকাল। বাদাম চাষ ও বাজারজাতেও কয়েক হাজার পরিবার চলেন। পানির করাল গ্রাস থেকে এটাও রক্ষা করা যায়নি। বৈশাখী  (বৈশাখ মাসের ধান) শুধু কৃষকের মুখে হাসিই ফুটায় না সমগ্র ভাটি বাংলার নগর বন্দরের ব্যবসা বাণিজ্যও এর ফলে ডালপালা মেলে। ধান আড়তে যায়, মিলে ওঠে। নদী ও সড়ক পথে পরিবহন ব্যবসা জমে ওঠে। ধান কাটা থেকে রাইছ মিলে প্রক্রিয়া পর্যন্ত লাখ লাখ শ্রমিকের অন্ন জোটে। কাপড়ের দোকান, হোটেল-রেস্টুরেন্ট থেকে সকল ব্যবসা বাণিজ্য বৈশাখে ফুলে ফেঁপে ওঠে। এবার সব কিছুই লাটে উঠেছে বা উঠবে। ধান শুধু মানুষের অন্ন জোগায় না, পশু-পাখি কীট পতঙ্গও এর মাধ্যমে বেঁচে থাকে যা আবার প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখে। ধানের খড়ে শুকনো মৌসুমের আগ পর্যন্ত পশুর খাবার জোগায়। এবার এক মুঠো খড়ও উঠেনি। চোখের জল ফেলে পানির দামে কৃষক গবাদি পশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। মাছের পর হাঁসের মড়ক সবারই জানা। মরা হাঁস খেয়ে কুকুর বেড়াল মারা যাওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। খাদ্যাভাবে পঁচা ধান গাছ বা বিষাক্ত গাছ খেয়ে গবাদি পশুরও মড়ক দেখা দেওয়ার আশংকা তৈরী হয়েছে। দীর্ঘ দিনের দুর্গন্ধ,হাওরের দূষিত পানি ব্যবহার করে পেটের পীড়া এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ারও খবর রয়েছে। সব মিলিয়ে নজিরবিহীন দুর্যোগে এখন হাওরের জনপদ।
এই দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজন জরুরী পদক্ষেপ। আসার কথা সরকার তিন লক্ষাধিক পরিবারকে রক্ষায় জুলাই পর্যন্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপ্তির তুলনায় এটি খুবই কম। যারা এক ফসলের উপর বা মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল এদের সবাইকে সাহায্যের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। স্বল্প, মাঝারি এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্যাটাগরী অনুযায়ী তালিকা করতে হবে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার সাহায্যের পাশাপাশি পুর্নবাসন কর্মসূচী হাতে নিতে হবে। কৃষি ঋণ মওকুফ করে, আগামী ফসল ওঠার আগ পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের সকল সরকারী/বেসরকারী ঋণ আদায় বন্ধ রাখার নির্দেশ দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র বেতন ও ফি আগামী ফসল উঠার আগ পর্যন্ত মওকুফ করতে হবে। সকল জলমহালের ইজারা স্থগিত করে জেলে কৃষকদের মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। গো খাদ্যও সাহায্য করার পাশাপাশি নদী নালা, দিয়ে ভেসে আসা কচুরিপানা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের মাধ্যমেও পুনর্বাসন কর্মসূচী জোরদার করা যায়। আগামী ফসল আবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ সার, কীটনাশক সকল কৃষককে প্রদানের জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে। এবারের ক্ষয়ক্ষতি সরকারের একার পক্ষে মোকাবিলা সম্ভব হবে না। এর জন্য সকল ব্যক্তি, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসলে দুর্গত মানুষ বাঁচার আশা পাবে। দেশ বিদেশের হাওরবাসীর সকল স্বজন ও হিতৈষীদের যুক্ত করতে হবে মানবতায়। পানির হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য নদী ড্রেজিংয়ের বিকল্প নেই। সকল সদ-নদী, নালা খনন করতে হবে। সুরমার খনন কাজে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত না করলে খননের সুফল পাওয়া যাবে না। হাওরের দূষণ মাত্রা কমলে জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসে সকল নদী-নদী ও হাওর বিলে মাছের পোনা ছাড়তে হবে। বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতিবাজ পাউবোর কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং পিআইসির লোকদের বিরুদ্ধে মামলা করে এদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ঠিকাদারদের ৫০ ভাগ বিল আটকানোর যে ঘোষণা মন্ত্রী দিয়েছেন তা প্রকৃত অবস্থার সাথে কোন ভাবেই মানানসই নয়। ঠিকাদার বা পিআইসি ৫০ ভাগ কাজ করেছে এমন বাঁধ পাওয়া দুষ্কর। এই অবস্থায় তাদের ৫০ ভাগ বিল দেওয়া মানে দুর্নীতিবাজকে পুরুস্কৃত করা। তাই ঠিকাদার বা পিআইসির বিল পরিশোধ পুরোপুরি বন্ধ রাখাই হবে সময়ে দাবি।
লেখক: কৃষক সংগ্রাম সমিতি, সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি

  • [১]