- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মহান ভাষা আন্দোলনে সুনামগঞ্জ

হোসেন তওফিক চৌধুরী
রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ সুনামগঞ্জের খ্যাতি অনেক পুরনো। ঐতিহাসিক খেলাফত আন্দোলন, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, কৃষক-প্রজামুক্তি আন্দোলন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ সহ সকল প্রকার স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও গনতন্ত্র আন্দোলনে সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য সর্বজনবিদিত। প্রতিটি আন্দোলনেই সুনামগঞ্জ বাসী এবং সুনামগঞ্জের সুসন্তানগণ গৌরবোজ্জাল ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম আন্দোলন ঐতিহাসিক মহান ভাষা আন্দোলন। সারা দেশ তথা তদ্বানিন্তন পূর্ব বাংলা ফুঁসে উঠে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবীতে সারা দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কম্পিত-প্রকম্পিত হয় সারা দেশ এবং তদানিন্তন ক্ষমতাসীন সরকার। এই আন্দোলন শুধু ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল। সকল শোষন, বঞ্চনা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই মহান আন্দোলনে রয়েছে সুনামগঞ্জের অতীতের ঐতিহ্যের মতো এক গৌরব দীপ্ত ভূমিকা। অন্যান্য আন্দোলনের মতো ভাষা আন্দোলনের সুনামগঞ্জের অবদান উল্লেখযোগ্য। জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুনামগঞ্জের সুসন্তানদের অবদান স্বরণীয় হয়ে রয়েছে। সুনামগঞ্জে যেসব সুসন্তান এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন তারা সুনামগঞ্জের ইতিহাসে সর্বসময় স্বরণীয় হয়ে থাকবেন।
ভাষা আন্দোলনে জাতীয় পর্যায়ে যেসব কৃতী সন্তান অনন্য অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, মাহমুদ আলী, শাহেদ আলী, আব্দুছ সামাদ আজাদ প্রমুখ রয়েছেন। মাহমুদ আলী সম্পাদিত ‘নও-বেলাল’ পত্রিকার ভূমিকা ছিল সর্বজনবিদিত। দেওয়ান আজরফ এই পত্রিকার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। ‘নও-বেলাল’ সিলেটের পত্রিকা হলেও ভাষা আন্দোলনের খবর অত্যন্ত প্রাধান্যভাবে প্রকাশ করা হতো। ‘ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইয়ের লেখক বদর উদ্দিন উমর লিখেছেন তাঁর বইয়ের বেশিরভাগ তথ্যই ‘নও-বেলাল’ থেকে নেয়া এবং ‘নও-বেলাল’ ভাষা আন্দোলনের এক প্রামান্য দলিল। উল্লেখ্য যে, মাহমুদ আলী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় ভিন্ন মত পোষণ করায় পাকিস্তানে চলে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ভাষা আন্দোলনে ‘সৈনিক’ পত্রিকার অবদান অপরিসীম। অধ্যাপক শাহেদ আলী এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। আব্দুছ সামাদ আজাদ একজন প্রখ্যাত ছাত্রনেতা হিসেবে আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জনাব আখলাকুর রহমান ভাষা আন্দোলনে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেন। মুসলিম চৌধুরী শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ভাষা আন্দোলনের এক সুতিকাগার। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই ১৯৪৭ সালে সংসদের এক সভায় ‘পাকিস্তান রাষ্ট্র ভাষা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে তিনি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন। এই জন্য মুসলিম চৌধুরীকে বিভিন্ন ধরনের হয়রানীর সম্মুখিন হতে হয়। কিন্তু তিনি স্বীয় মতে অটল থাকেন। তাজুল মোহাম্মদ সিলেটের ভাষা আন্দোলন শীর্ষক বইয়ে ভাষা আন্দোলনের বিস্তারিত বিবরণ লিখেছেন। তিনি লিখেন সুনামগঞ্জের তৎকালীন মুসলিম লীগের মহকুমা সভাপতি মকবুল হোসেন চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের ছাত্রদের উপর জুলুমের প্রতিবাদে মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন একজন খেলাফত আন্দোলনের নেতা, সাবেক এমএলএ (আসাম) এবং প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক। আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন তাঁর লিখিত ‘সুনামগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্য’ গ্রন্থেও একথা উল্লেখ করেছেন। ভাষা আন্দোলনেও তরুণ ও যুব নেতৃত্বের মধ্যে সাংবাদিক আব্দুল হাই ও আব্দুল হক পুরোভাগে ছিলেন। এছাড়াও আব্দুল মতিন চৌধুরী (এডভোকেট), কমরেড বরুন রায়, হোসেন বখ্ত, আলফাত উদ্দিন আহমদ, নুরুল আবেদীন, ডা. আবুল লেইছ (তখন ছাত্র), আশরাফ আলী, তজম্মুল হোসেন কাচা মিয়া, কাজল দত্ত, মঞ্জু দাস, নূরুল হুদা বাদল প্রমুখ ভাষা আন্দোলনকে বেগবান ও অপ্রতিরুদ্ধ করে তুলেন। ভাষা আন্দোলনে স্কুলের ছাত্ররাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তারাই ধর্মঘট, মিছিল, পিকেটিং, প্রভাত ফেরী প্রভৃতি কর্মসূচিকে সফল করে তুলতেন। পটকালেকশনের মাধ্যমে চাঁদা তুলে আন্দোলনের ব্যয় নির্বাহ করতেন। তখনকার দিনে মাইকের প্রচলন ছিল না। টিন দিয়ে চুঙ্গা বানিয়ে প্রচারণা ও সভার কাজ চালানো হতো। স্কুল ছাত্রদের মধ্যে আবুল হাসিম চৌধুরী, আব্দুল ওয়াহিদ লাট মিয়া, আব্দুর রহিম চৌধুরী, ডা. রকিব, দেওয়ান মহসিন রাজা, আব্দুল খালিক, আলা উদ্দিন আহমদ (ইঞ্চিনিয়ার), দেওয়ান নুরুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ অংশ নিয়েছেন। ডা. আবুল লেইছের স্ত্রী রাবেয়া লেইছ নিলফামারীতে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তাকে নিলফামারী থেকে এজন্য সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জের শিক্ষক জনাব আব্দুর রহিম (ঢাকাইয়া কারবালা) নামে একটি জারী গান লিখেন। এভাবেই সুনামগঞ্জ ভাষা আন্দোলনে গৌরবদীপ্ত ভূমিকার মাধ্যমে আন্দোলনে স্মরণীয় অবদান রেখেছেন।
লেখক: আইনজীবী-কলামিষ্ট।

  • [১]