মঙ্গলবার বাংলাদেশে মহামারী করোনা উর্ধমুখী নতুন রেকর্ড করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিং অনুসারে এ দিন কোভিড ১৯ পজিটিভ শনাক্ত সংখ্যা ৩১৭১ জন। একই দিনে মৃত্যু সংখ্যা ৪৫। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এ যাবত এটিই সর্বোচ্চ। এই রেকর্ডও হয়তো সামনের দিনগুলোতে একাধিকবার ভাঙবে। রেকর্ড ভেঙে ভেঙেই করোনা নিজের চূড়া খোঁজে নিবে। তবে চূড়ায় উঠার দিন আসতে আরও কতদিন সময় লাগবে সেই কথা কেউ বলতে পারছেন না। বাহ্যিক আচরণ দেখে মনে করার কোনো কারণ নেই যে জনমনে এ নিয়ে কোনো উদ্বেগ উৎকণ্ঠা রয়েছে। বাইরে বেরোলে দেখা যায় মানুষ স্বাস্থ্যবিধি ভাঙার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। এই উদাসীনতা বাংলাদেশের করোনা দুর্যোগকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলছে।
সরকার রঙ ভিত্তিক যে ব্যবস্থাপনার কথা বলেছিলেও তা বাস্তবায়নেও সময় ক্ষেপণ করার নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে বলে মনে হয়। মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে রাজধানীর ছোট একটি এলাকা পূর্ব রাজারবাজারকে রেডজোন ঘোষণার মধ্য দিয়ে লকডাউন কার্যকরের কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। অথচ ঢাকা মহানগরীর মধ্যেই এর চেয়ে অধিক সংক্রমিত এলাকা রয়েছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজিপুর, সিলেট ইত্যাদিও অধিক সংক্রমণপ্রবণ এলাকা। মূলত পুরো বাংলাদেশের খুব কম এলাকাই পাওয়া যাবে যেখানে করোনা ঝুঁকি নেই। সুনামগঞ্জ জেলাও ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। জেলার ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার এলাকাকে রীতিমত হটস্পট বিবেচনা করা যেতে পারে। সুনামগঞ্জ জেলা সদরও আরেক ঝুঁকিবহুল এলাকা। সোমবারের পরিসংখ্যান অনুসারে সদর ও ছাতকে আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৯৫ ও ৯৪। জাউয়াবাজার এলাকায় ব্যাপক সংক্রমণের আশংকা করা হচ্ছে। এরকম অবস্থা সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোনো একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে মহামারীকে বাগে আনা আর সম্ভব হবে না। দেশের সবগুলো জনবহুল অঞ্চল বিশেষ করে মহানগরী, নগরী, শহর ও হাটবাজার সবগুলোই এখন বিপদজনক। সুতরাং এলাকা বিশেষকে রেডজোন ঘোষণা, তাও আবার সময় ক্ষেপণের কৌশল অবলম্বনের মধ্য দিয়ে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
সরকার সীমিত পরিসরে সাধারণ ছুটি ১৫ জুন পর্যন্ত প্রত্যাহার করেছিলেন। সেই সময় শেষ হতে আর মাত্র ৫ দিন বাকি। ছুটি প্রত্যাহারের পরের ১০ দিনের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। সাধারণ ছুটি বলবৎ থাকার শেষদিন ৩০ মে বাংলাদেশে শনাক্তকৃত করোনা পজিটিভ ছিলেন ৪৪৬০৮ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন ৬১০ ব্যক্তি। এর পরের ১০ দিনেই (৯ জুন পর্যন্ত) আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন ২৭০৬৭ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৬৫ জন। এই ১০ দিনে প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যু বেড়েছে। সর্বশেষ দিনে করেছে নতুন রেকর্ড। এমন অবস্থায় সরকারকে নতুন চিন্তা করতে হবে নতুবা ভয়ংকর ভবিষ্যৎ দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আবারও সরকারকে কঠোর পদক্ষেপের দিকে যেতে হবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ঢিলেঢালা লকডাউনের পরিবর্তে কঠিন কঠোর কারফিউ জারি করে মানুষকে ঘরে আটকে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। এই পরামর্শ আমলে নিতে হবে। আবারও সকল সরকারি বেসরকারি অফিস বন্ধ করে দিতে হবে। হাট বাজার বন্ধ করে দিতে হবে। যেখানেই জনসমাগম ঘটে সেখানেই কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। প্রাকৃতিক নিয়মে মহামারী কমার ক্ষণের জন্য অপেক্ষায় থাকা হবে চরম আত্মঘাতী। সেই চিন্তা না করে মহামারী-বিজ্ঞান যা শিখিয়েছে তারই প্রয়োগ করতে হবে। এখনই আফসোসের শেষ নেই। পরে আফসোস করারও সুযোগ থাকবে না।
সরকার নিশ্চয়ই নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকেননি। তারা অবশ্যই প্রতিটি মুহূর্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। জনগণ আশা করে সরকার এবার কার্যকর পদক্ষেপই গ্রহণ করবেন।