ইয়াসমিন নাহার রুমা
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সুনামগঞ্জ সদর
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অপরিহার্য। রূপকল্প ২০২১ বা জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জনসম্পদ উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এখন মানসম্মত শিক্ষাকেই সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পৃথিবীর যে কোন উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশই প্রাথমিক শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকারের নানামুখী সময়ো পযোগী পদক্ষেপের কারণে গত এক দশকে এ দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ও বেশ অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রার যে শুভসূচনা করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। শুধু তাই নয়, বছরের প্রথমদিনে নতুন বই তুলে দেওয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, সরকারি বিদ্যালয়ে দপ্তরীকাম প্রহরীনিয়োগ, স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠন, বিভিন্ন খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পাশাপাশি শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টিসহ বিপুল সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু, পুলশিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগও উন্নয়নের গতিকে করেছে তরান্বিত। একদিকে যেমন শুরু হয়েছে বিদ্যালয় ভিত্তিক উন্নয়ন ফান্ড (ঝখওচ) প্রদান ও ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়া অন্যদিকে অনুমোদিত হয়েছে জাতীয় স্কুলমিল নীতি-২০১৯ এর খসড়া। বর্তমানে ৩০ লাখ শিক্ষার্থী এর আওতায় থাকলেও ভবিষ্যতে ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীই এর আওতাভুক্ত হবে। এ প্রক্রিয়ায় সব শিশুই সমান পুষ্টি সমান জীবনমান অর্জনে সক্ষম হবে, তাদের মেধার উৎকর্ষ সাধন হবে, চিন্তা ও কল্পনা শক্তির বিকাশের সাথে সাথে সৃজনশীলতা এবং দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। তাছাড়া এর ফলে শিশুদের রক্তস্বল্পতার হার কমছে এবং ঝড়ে পড়া রোধ হচ্ছে দৃশ্যমান হারে। ঝড়ে পড়া রোধে সরকারের প্রশংসনীয় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বছরের শুরুতে প্রতিটি স্কুলে ক্যাচমেন্ট এলাকাভিত্তিক শিশু জরিপপূর্বক ভর্তি নিশ্চিত করা। নিয়মিত মা সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও হোমভিজিট কার্যক্রম।
সরকারের এসব উন্নয়ন কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন ও নিশ্চিতকরণ অনেকাংশে নির্ভর করে যোগ্য, দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষকবৃন্দের উপর। দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় এখন ও দেশের মেধাবী ও যোগ্য শ্রেণির অনেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আগ্রহী হোননা। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো আকর্ষনীয়ও সন্তোষজনক করা এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষনের বর্তমান ধারার সংস্কার প্রয়োজন।বিশ্বের অন্যান্য দেশে আমরা দেখতে পাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অনেক আকর্ষণীয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গুণগত শিক্ষার ধারা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের অনুকূল কমর্ পরিবেশ প্রদান প্রাথমিক শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনুকূল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে নি¤েœাক্ত বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
* শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমিয়ে ছোট ছোট শাখায় ভাগ করা এবং শাখা অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।
* প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব শিক্ষকরা নিয়োগ পান তারা অনেক সময় উপযুক্ত বাসস্থানের অভাবে সেসব স্থানে স্থায়ীভাবে থাকতে পারেন না। প্রত্যন্ত দূর্গম এলাকার শিক্ষকদের জন্য স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
* সাধারণত বিদ্যালয় প্রতি চারজন শিক্ষক বরাদ্দ থাকায় তাদের পক্ষে ৯টা থেকে ৪টা একটানা কাজ করা কষ্টসাধ্য হওয়ায় অনেকক্ষেত্রেই পাঠদান মানসম্মত হয় না। তাছাড়া ছুটি বা প্রশিক্ষণকালীন শিক্ষক স্বল্পতা আরো প্রকট হয়ে পড়ে। তাই বিদ্যালয় প্রতি শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।
পরিশেষে সরকারের সুপরিকল্পিত যুগোপযোগী পদক্ষেপ ও আন্তরিক বাস্তবায়নের ফলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত মানোন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও গতিশীল সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এটাই এখন সকলের স্বপ্ন।