- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার রফতানিকারকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া

শেখ কবির আহমেদ, মালয়েশিয়া
শ্রমবাজারের এই ক্রান্তিকালে নতুন করে মালয়েশিয়ার দুয়ার খোলার খবর রফতানিকারকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ইতিমধ্যে সে দেশের অনেক কোম্পানীর মালিকরা শ্রমিকের চাহিদা চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর মিনিট সাইন করে রেখেছেন। চাহিদা পত্র বাংলাদেশে চলে আসার পর কাজ শুরু করবেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সরকারের সূত্রগুলো বলছে, চলতি মাসের শেষেই আসতে পারে চাহিদাপত্র।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে করা ‘জিটুজি প্লাস “ চুক্তির আওতায় কর্মী নেয়ার  প্রক্রিয়াই হবে অনলাইনে। এতে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকবে বলে আশা করছেন তারা। সরকারের তথ্যভান্ডারের পাশাপাশি বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিও কর্মী বাছাই করবে।
জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘চলতি মাসেই যে চাহিদাপত্র আসবে সেটা বলতে পারছি না, তবে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, তারা আন্তরিকতায় যত দ্রুত সম্ভব এই প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছিল, সেগুলো আর থাকবে না। নতুন পদ্ধতিতে বেসরকারি খাতও কর্মী পাঠাতে পারবে।’
বাংলাদেশিদের প্রমবাজারের একটি মালয়েশিয়া। কিন্তু ২০০৯ সালে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৩ সালে ‘জিটুজি’ (সরকারিভাবে) শুধু প্লান্টেশন খাতে কর্মী যাওয়া শুরু করে দেশটিতে। তবে, এ প্রক্রিয়ায় কর্মী যাওয়ার হার সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মালয়েশিয়া সরকারের একটি সমঝোতা সই হয়। ‘জিটুজি প্লাস’ প্রক্রিয়ায় (সরকারি-বেসরকারি) সেবা, নির্মাণ, কৃষি, প্ল্যান্টেশন ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে প্রতিবছর ৫ লাখ করে ৩ বছরে মোট ১৫ লাখ কর্মী যাওয়ার কথা ছিল দেশটিতে।  কিন্তু, চুক্তি সইয়ের ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র ও উপ-প্রধানমন্ত্রী ড. আহমদ জাহিদ হামিদি বাংলাদেশসহ সব দেশ থেকে কর্মী নেওয়া আপাতত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। তবে, কয়েক মাসের মাথায় গত মে মাসে বিদেশি কর্মী না নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন জাহিদ হামিদি।
বায়রার মহাসচিব মোহাম্মদ রুহুল আমিন  বলেন, ‘বিদেশি কর্মী না নেওয়ার যে ঘোষণা মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে ছিল তা ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে সোর্স কান্ট্রি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। দেশটিতে বর্তমানে বিদেশি কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা  বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে হওয়া চুক্তির আওতায় কর্মী পাঠানো শুরু হলে হয়রানি বন্ধ হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো চাইলেও কারও সঙ্গে প্রতারণা করতে পারবেন না। তাছাড়া কর্মীকে মাসের পর মাস অপেক্ষাও করতে হবে না। কারণ, রিসিট অব কলিং ভিসা (ভিডিআর) ২৪ ঘণ্টা থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে হয়ে যাবে।
বেসরকারিভাবে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার মহাসচিব মোহাম্মদ রুহুল আমিন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কর্মী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। আগে কর্মীদের মেডিকেল পরীক্ষা নিয়ে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। এখন আর তা লাগবে না। মেডিকেল পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার পর প্রাথমিক যাচাইয়ে অযোগ্য হলে তাকে আর মেডিকেল পরীক্ষা করতে দেয়া হবে না। এতে কর্মীদের অযথা টাকা খরচ করতে হবে না।’
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে কর্মীদের যথাযথ মেডিকেল পরীক্ষা করে যাওয়ার ফলে মালয়েশিয়া গিয়ে ‘আনফিট’ হয়ে ফিরে আসার হার কমবে। এখানকার মেডিকেল রিপোর্টটিও হাতে হাতে দেয়া হবে না। অনলাইনের মাধ্যমে মালয়েশিয়াতেই পাঠিয়ে দেয়া হবে। আগে কর্মীরা শতভাগ ইন্সুরেন্স সুবিধা পেতেন না। ফলে তারা হাসপাতাল সেবা ও ক্ষতিপূরণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতেন। এখন থেকে অনলাইনের মাধ্যমে দেশে থাকতেই ইন্সুরেন্স নিশ্চিত করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, জিটুজি প্লাস চুক্তির আওতায় শ্রমিকদের ওয়ার্ক পারমিটটিও নবায়ন করবে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান। যদি মালিকপক্ষ ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করতে চায় তাহলে অনলাইনে এটি ইমিগ্রেশন বিভাগকে জানিয়ে দেবে। এখানে ওয়ার্ক পারমিট জালিয়াতি করার কোনো সুযোগ নেই। পাশাপাশি ‘ডাবল ভিসা’ ইস্যুর সুযোগও আর থাকছে না। কারণ, ভিসার সব তথ্যই থাকবে অনলাইনে। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবে না।
চুক্তিতে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। শ্রমিকরা মারা গেলে কিংবা কর্মস্থলে দুর্ঘটনার কারণে পঙ্গু হলে তার নিকটজনেরা ক্ষতিপূরণ পাবেন। সব ধরনের তথ্য অনলাইনে থাকায় স্বজনদের ভোগান্তি কমবে।
জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অতীতে শ্রমিকরা নিয়োগকারীদের দ্বারা নির্যাতিত হলে, বেতন বা অন্যান্য সুবিধা না পেলে অভিযোগ জানানোর উপায় বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছতে পারতেন না। এখন আর এই সমস্যায় পড়তে হবে না। বাংলাদেশি শ্রমিকরা মালয়েশিয়ার যেকোনো শহরের ওয়ান স্টপ সেন্টারে (ওএসসি) গিয়ে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করতে পারবেন। ওএসসি পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের শ্রম বিভাগকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জানাবে।
বায়রা সূত্র জানায়, শ্রমিকদের ভিসা পেতে হলে মালয়েশিয়ার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে কর্মীর জীবনবৃত্তান্ত, পাসপোর্ট, মেডিকেল রিপোর্ট, ছবি, বায়োমেট্রিক তথ্য পাঠাতে হবে।
এদিকে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন ও বাংলাদেশস্থ মালয়েশিয়া দূতাবাসে ৩৪ হাজারেরও বেশি ভিসা আটকে পড়ায় প্রফেশনাল ভিসার ছাড়পত্র ইস্যু কার্যক্রম অনিশ্চিত। প্রফেশনাল ভিসার ছাড়পত্র ইস্যু বন্ধ থাকায় বিভিন্ন  এজেন্সির প্রায় ৩৪ হাজার প্রফেশনাল ভিসা আটকা পড়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক প্রবাসীরা বলছেন ,একদিকে প্রফেশনাল ভিসার ছাড় পত্র অন্যদিকে  মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের দ্বার উম্মুক্ত নিয়ে  এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মূখে পড়বে বলে অনেকের ধারণা। অনেক ভুক্তভোগী জানান, এর আগে  বিভিন্ন জনের কাছে টাকা, পাসপোর্ট দিয়ে তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

  • [১]