বিশ্বজিত রায়, মিনি পাগনা থেকে ফিরে
জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে কোন কোন পিআইসিতে অত্যধিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলার মিনি পাগনা হাওরের ৩টি পিআইসিতে গত মৌসুমের চেয়েও এই মৌসুমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আবার কোন পিআইসিতে কাজের তুলনায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কম। কোথাও কোথাও কাজ কম, বরাদ্দ বেশি, আবার কোথাও কাজ বেশি বরাদ্দ কম হওয়ায় স্থানীয়ভাবে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা পাইয়ে দিতে এমনটা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। দায়িত্বশীলরা এই অভিযোগ মানতে নারাজ।
বুধবার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের মিনি পাগনা ঘুরে দেখা যায়, এখানকার ৩ পিআইসির একটিতেও বড় কোন ভাঙন নেই। তায়েবনগর গ্রাম থেকে শুরু হয়ে মিনি পাগনা ঘুরে যশমন্তপুর এসে যুক্ত হওয়া তিন বাঁধের অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনও অক্ষত আছে পুরোনো মাটি। বাঁধের কাজ যে জায়গা থেকে শুরু হবে অর্থাৎ সেই তায়েবনগর ছুঁয়ে ছুটে চলা হাওরমুখী বাঁধটি দেখলে বোঝা যায় যেন সেটি একটি সড়ক। হাওরের চারপাশজুড়ে বয়ে চলা এই বাঁধগুলোয় যে মাটি আছে তাতে কোনভাবেই বরাদ্দের পরিমাণ মাটির প্রয়োজন হবে না। বাঁধ তীরবর্তী নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে মাটি আনার যথেষ্ট জায়গাও আছে সেখানে। গত মৌসুমের পুরোনো বাঁধের অনেকাংশে অল্পসংখ্যক মাটি ফেললেই পুরোদস্তুর বাঁধ হয়ে যাবে, এমনটাই বলেছেন স্থানীয়রা। তবু তিন বাঁধে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে গত বছর থেকে প্রায় দ্বিগুণ।
হাওর ঘুরে আরও দেখা যায়, মিনি পাগনার সন্নিকটে অবস্থিত ধর্মপাশা উপজেলার ধানকুনিয়া হাওর রক্ষা বাঁধে নির্দেশিকা বোর্ড সাটিয়ে সেখানে কাজ শুরু হয়েছে বেশ জোরেশোরে। কিন্তু মিনি পাগনার কোন বাঁধেই তখন পর্যন্ত (শনিবার) সাঁটানো হয়নি কোন নির্দেশিকা বোর্ড। কে কোন বাঁধে কাজ করছে, কিংবা কোন বাঁধে কত বরাদ্দ তা জানার কোন ব্যবস্থা কাজের এলাকায়। বাঁধের ঘাস ছেটে মাটি ফেলার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না।
জানা যায়, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে মিনি পাগনা হাওরের ১৮ নম্বর (বর্তমান ১নং) পিআইসির অনুকূলে বরাদ্দ ছিল ১২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, ১৯ নম্বর (বর্তমান ২নং) পিআইসিতে ৫ লাখ ২৭ হাজার এবং ২০ নম্বর (বর্তমান ৩নং) পিআইসিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৮ লাখ ৪২ হাজার টাকা। একই হাওরে ২০২০-২০২১ চলতি অর্থবছরে ১ নম্বর পিআইসির অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০ লাখ ৮ হাজার টাকা, ২ নম্বর পিআইসিতে ১৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং ৩ নম্বর পিআইসিতে ১৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। গত মৌসুমের তুলনায় এ মৌসুমে বরাদ্দ বেশি হওয়ায় হাওরপাড়ের কৃষক বলছেন, বাঁধ ব্যবসার জন্যই এটি করা হয়েছে।
গত বছরের পিআইসি সভাপতি ও রামপুর গ্রামের কৃষক মো. আমান উল্লাহ আমান জানিয়েছেন, তায়েবনগর থেকে যে বাঁধটা শুরু হয়েছে গত বছর সে বাঁধের কাজ তিনি করেছিলেন। তাতে বরাদ্দ ছিল ৯ লাখের কিছু উপরে। কিন্তু এ বছর তাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৮ লাখের বেশি। গত বছর এ বাঁধে কয়েকটা ভাঙা ছিল, এ বছর কোন ভাঙা নেই। তারপরও বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ। যদি ওই বাঁধগুলোতে ৫ ফুট উচ্চতায় মাটি ফেলা হয় তারপরও এত টাকা লাগবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
ফেনারবাঁক ইউনিয়ন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি গজারিয়া গ্রামের কৃষক মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, গত বছর এই বাঁধগুলোতে বরাদ্দ ছিল কম, কাজ ছিল বেশি। এ বছর বরাদ্দ বেশি, কাজ কম। মিনি পাগনায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাতে আমার ধারণা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এটা হয়েছে। এই তিন বাঁধে এত বেশি বরাদ্দের কোন প্রয়োজন নাই। এখানে বড় কোন ভাঙনও নাই। তারপরও মেজারমেন্ট করে যে ইষ্টিমিট দেওয়া হয়েছে তাতে ভিন্ন কিছুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
কম বরাদ্দ হওয়ায় বাঁধের কাজ থেকে অব্যাহতি চাওয়া পাগনা হাওরের ৫ নম্বর পিআইসি সভাপতি মো. আব্দুল মন্নাফ বলেন, রামপুর থেকে জামলাবাজ পর্যন্ত কাজ দেওয়া হয়েছে আমাকে। যেখানে ভাঙা আছে ৪ থেকে ৫টি। সেখানে বরাদ্দ মাত্র ৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। নিজের ক্ষেত বিক্রি করে তো আর কাজ করতে পারব না। তাই স্যারেন্ডার করেছি।
মিনি পাগনার ৩ নম্বর পিআইসিতে ভাঙন নেই জানিয়ে ওই পিআইসির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস বলেন, আব্দুল্লাহপুর তায়েবনগরের মাঝখানের সামান্য অংশ, তায়েবনগরের মাথা থেকে বাকী অংশ কাজ করার জন্য বলা হয়েছে। এজন্য বরাদ্দ সাড়ে ১৮ লাখ টাকা। বরাদ্দ কম না বেশি, এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি তিনি।
হাওরের খোঁজ-খবর রাখেন এমন একজন সরকারি চাকুরিজীবী জানিয়েছেন, বরাদ্দ বাড়ে মূলত ভাঙনের জন্য। যেহেতু পরপর চারবার বন্যা হয়েছে, সে কারণে বড় কোন ভাঙন সৃষ্টি হতে পারে। সেক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়াটা স্বাভাবিক। তবে মিনি পাগনায় ভাঙন যেহেতু নাই সেহেতু বিষয়টা প্রশ্নবিদ্ধ। এক্ষেত্রে প্রাক্কলন দেখলে হয়তো বিষয়টা পরিস্কার হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, পাউবোর যারা মেজারমেন্ট করেছেন, তারা স্থানীয় লোকজনকে এতে সম্পৃক্ত না করায় এই ত্রুটি হয়েছে। অনেকটা জেনেশোনেই এই কাজগুলো করা হচ্ছে। মেজারমেন্টে বোঝানো হচ্ছে বেশি মাটি লাগে, আসলে কিন্তু বেশি মাটি লাগছে না। যেখানে কোন ভাঙন নেই, সেখানে এত টাকা বরাদ্দের কোন প্রয়োজন নাই।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল কবীর বললেন, এখানকার বাঁধগুলো নীচু অবস্থায় আছে এবং স্লোব কমে গেছে। গতবার বরাদ্দ কমের কারণ ছিল এখানে নো ওয়ার্ক ছিল। কাজ করা হয় নাই। এই বছর এই অংশগুলোতে কাজ করা হচ্ছে। যে কারণে বরাদ্দ বেড়েছে। মাটি যেভাবে আছে মেজারমেন্ট অনুযায়ী সেভাবেই ইষ্টিমেট প্রস্তুত করা হয়েছে। ডিজাইন লেবেল অনুযায়ীই বাঁধে মাটি পড়বে।