বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধসহ ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী পুরাতন সার্কিট হাউসকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। বুধবার থেকে এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ শুরু করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
আসাম প্যাটার্নের আদলে থাকা টিনশেড এই স্থাপনাটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য উপরের টিন খুলে পুরাতন নষ্ট হয়ে যাওয়া কাঠের বদলে লোহার অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করা হবে। মেঝেতে টাইলস এবং উপরের সিলিং বদলে দেওয়া হবে। টিনসেড ঘরের সামনে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল হবে। এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের নানা ঐতিহাসিক বিষয় এখানে সংরক্ষণ করা হবে। প্রবেশ গেটেও কাজ করা হবে। সামনের বসার গোলচত্বর হবে।
মুক্তিযোদ্ধা মালেক হোসেন পীর বললেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য এই স্থাপনাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেবে। নতুন প্রজন্মের ইতিহাস জানান দেবে এই স্থাপনা। এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞ আমরা।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জের সন্তান বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপিসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে এই স্থাপনাটি সংরক্ষণের অনুরোধপত্র পাঠিয়েছিলেন।
কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক তাঁর অনুরোধ পত্রে উল্লেখ করেছিলেন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে প্রথম পাকিস্তানী সৈন্যরা এসে ওখানেই ঘাটি স্থাপন করে এবং সুনামগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই ভবনের চারপাশ থেকে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই ভবনের চারপাশ থেকে মুক্তিবাহিনী অর্থাৎ ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ভবনে অবস্থানরত পাকিস্তানী সৈন্যদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেন। প্রথম প্রহরের এই যুদ্ধে ভবন থেকে ছোড়া গুলিতে সুনামগঞ্জের প্রথম শহীদ আবুল হোসেন শাহাদাত বরণ করেন। এই সার্কিট হাউস ভবন দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ ব্যবহার করেছেন। এই ছোট সার্কিট হাউস ভবনটি আমাদের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের নিদর্শন এবং দুর্লভ একটি স্থাপনা।
অনুরোধ পত্রে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, এই ভবনের বারান্দায় বসে সামনের জুবিলী স্কুল মাঠ, সুরমা নদী, দূরের নীল পাহাড় অর্থাৎ সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপ বৈচিত্র উপভোগ করা যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলার ছোট অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহৃ, ঐতিহাসিক ও নান্দনিক স্থাপনা অবিকল সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সদয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য অনুরোধ জানিয়ে ছিলেন তিনি।
এই অনুরোধপত্র একই সঙ্গে মন্ত্রী পরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসককে পাঠিয়েছিলেন ড. মোহাম্মদ সাদিক।
পরে একই ধরনের অনুরোধপত্র সংশ্লিষ্টদের পাঠিয়েছিলেন তখনকার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ।
এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম জানিয়েছেন, সার্কিট হাউসের অবয়ব ঠিক রেখে ওই এলাকাকে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসাবে ধরে রাখার কাজ শুরু হয়েছে। ওখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক করা হবে। এছাড়া সার্কিট হাউস এলাকাকে বাউন্ডারী দেওয়ালের মধ্যে আনা হবে।
প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম বললেন, একটি ঐতিহাসিক কাজের সঙ্গে সুনামগঞ্জ এলজিইডি এবং আমি নিজে যুক্ত থাকতে পেরে গর্ববোধ করছি। এই দুটি কাজ করতে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ তাগাদা দিয়েছেন। এই অঞ্চলের কৃতি সন্তান ড. মোহাম্মদ সাদিক নানা স্থানে অনুরোধ পত্র পাঠিয়েছেন। সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ পত্র দিয়েছিলেন। কাজটি করতে পেরে আমি আনন্দিত।