বিশেষ প্রতিনিধি
দিরাইয়ে ঘরে ঢুকে ছুরিকাঘাতে স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আক্তার মুন্নীকে (১৯) হত্যাকারী বখাটে ইয়াহিয়া সরদারকে (২২) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার মধ্যরাতে সিলেট নগরের একটি বাসা থেকে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাবীবুল্লাহ্’র নেতৃত্বে পুলিশের তিনটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। বিকালে দিরাই আমল গ্রহণকারী আদালতের বিচারক মো. আবু আমর’এর আদালতে খুনী ইয়াহিয়া সরদারকে হাজির করলে, আদালত ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০ টায় সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ্ খান জানান, ইয়াহিয়া সিলেট নগরের জালাবাবাদ থানার মাসুক বাজার এলাকার দরশা গ্রামের একটি বাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন। পুলিশ প্রযুক্তির মাধ্যমে তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে অভিয়ান চালায় এবং বুধবার রাত ১ টায় তাকে গ্রেপ্তার
করে। পরে গণমাধ্যকর্মীদের সামনে ইয়াহিয়াকে হাজির করা হয়।
দিরাই পৌর শহরের আনোয়ারপুরের নয়া হাটির মাদানী মহল্লা এলাকার ইতালী প্রবাসী হিফজুর রহমানের মেয়ে মুন্নীকে গত প্রায় ১ বছর ধরে উত্যক্ত করে আসছিল বখাটে ইয়াহিয়া। গত শনিবার রাত ৮ টার দিকে দিরাই পৌর শহরের মাদানী মহল্লা এলাকায় ঘরে ঢুকে মুন্নীকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে বখাটে ইয়াহিয়া। এ সময় মুন্নী ও তার ছোটভাই ঘরের ঐ কক্ষে পড়ছিল। পড়ার টেবিলেই তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় ইয়াহিয়া। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মুন্নী মারা যায়।
মুন্নীর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ইয়াহিয়া এই কাজ করে। মুন্নী দিরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। মেধাবী মুন্নী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাবাদে ইয়াহিয়া দাবি করেছেন, তার সঙ্গে ঐ মেয়ের সম্পর্ক ছিল। তবে বিষয়টি একতরফাও হতে পারে। মুন্নীর পরিবার এই বখাটের উত্যক্তকরণের বিষয়ে ইতিপূর্বে র্যাবের সুনামগঞ্জ ক্যাম্পে এবং বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিকে অবগত করেছিল। তারা শালিসে বিষয়টি মিমাংসা করে দিয়েছিলেন। পুলিশ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
তিনি জানান, ঘটনার দুইদিন আগে ঐ বাসায় গিয়ে নিজের হাত কেটে মুন্নীকে রক্ত দেখায় সে এবং মুন্নীকে তার প্রেমের কথা আবার বলে। এ সময় মুন্নী তার কথায় সাড়া না দিলে ইয়াহিয়া বলে, সেও মরবে তাকেও মারবে। ঘটনার দিন ঐ বাসায় গিয়ে আবার মুন্নীর সঙ্গে কথা বলে সে। এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে মুন্নীকে ছুরিকাঘাত করে। ইয়াহিয়া পুলিশকে জানিয়েছে, ঘটনার সময় সে একাই ছিলো। তবে মামলার এজাহারে তানভির আহমদ চৌধুরী নামে আরো একজনের নামোল্লেখ রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
প্রেসব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার ইয়াহিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশের ৪ টি দল কাজ করেছে। ঘটনার পর প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা গেছে প্রথমে সে ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা এবং পরে আবার সিলেটে এসেছে। সিলেটে মাজারেও কয়েক ঘণ্টা ছিল সে। তিনি অভিযানকারী পুলিশ দলের সদস্যদের এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেন।
ঘটনার পর গত সোমবার বিকালে দিরাই থানায় মুন্নীর মা রাহেলা বেগম বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের সাকিতপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন সরদারের ছেলে মো. ইয়াহিয়া সরদার ও দিরাই পৌর শহরের আনোয়ারপুর গ্রামের মাদানী মহল্লা এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম চৌধুরীর ছেলে দিরাই ডিগ্রি কলেজের ¯œাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র তানভীর আহমদকে (২২) আসামি করা হয়। এরপর বিকালেই পুলিশ ইয়াহিয়ার বন্ধু তানভীরকে গ্রেপ্তার।
পুলিশ সুপারের প্রেসব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ্, সুনামগঞ্জের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ, দিরাই সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন, দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল, সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শীদুল্লাহ, ডিবির ওসি কাজী মুক্তাদির হোসেন, ডিআইও ওয়ান আব্দুল লতিফ তরফদার উপস্থিত ছিলেন।
বিকালে দিরাই আমল গ্রহণকারী আদালতের বিচারক মো. আবু আমর’এর আদালতে ইয়াহিয়া চৌধুরীকে হাজির করলে ১৬৪ ধারায় সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১৬৪ ধারায় ইয়াহিয়া চৌধুরী স্বীকারেক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। এসময় সে বলেছে, মুন্নীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত এক বছরে অনেকবারই মুন্নীদের বাসভবনে গিয়েছে সে। হঠাৎ করেই মুন্নী তাকে প্রত্যাখ্যান শুরু করে। এক পর্যায়ে গত ২৬ অক্টোবর মুন্নীর পরিবারের পক্ষ থেকে র্যাবের কাছে তার বিরুদ্ধে নালিশ করলে ২৯ অক্টোবর র্যাবের সুনামগঞ্জ ক্যাম্পে দুই পরিবারকে ডাকা হয়। তার বাবা সেখানে যান। এরপর থেকে প্রায় দুই মাস সে মুন্নীকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারে নি। গত ১৪ ডিসেম্বর মুন্নীদের বাসভবনে গিয়ে নিজের গলায় ছুরি লাগিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করতে চেয়েছে সে। মুন্নীর মা এবং মুন্নী তখন বলেছেন, তোমাকে আত্মহত্যা করতে হবে না, তোমার কাছেই মুন্নীকে বিয়ে দেব। এরপর চাকু দিয়ে নিজের হাত কেটে মুন্নী ও মুন্নীর মাকে রক্ত ছুঁইয়ে শপথ করিয়েছে। ২ দিন পর ১৬ তারিখ আবার যখন মুন্নীদের বাসভবনে যায় তাকে দেখে মুন্নী উত্তেজিত হয়ে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ শুরু করে। মুন্নী তখন একা দোতলায় তার কক্ষে ছিল। মুন্নীর ছোট ভাই নিচে নেমে যায়। এসময় সে (ইয়াহিয়া) ফ্রীজের উপরে থাকা চাকু দিয়ে প্রথমে মুন্নীর বুকে এবং পরে পেটে আঘাত করে বেরিয়ে আসে। এরপর পালিয়ে প্রথমে সিলেটে, পরে ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জে কবিরাজ নুরুল ইসলামের বাড়িতে যায়। এরপর আবার সিলেটে। সিলেট থেকে ঢাকার কল্যাণপুরে। গতকাল আবার সিলেটে চলে আসে।