- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মূল্যায়ন সুরঞ্জিতের জন্য নয়, নিজের জন্য

এই ক্ষতি অপূরণীয়-রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মানুষ চিরদিন সুরঞ্জিতকে মনে রাখবে- বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া। আমরা অভিভাবক হারালাম- অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান- পিএসসি চেয়ারম্যান ড, মোহাম্মদ সাদিক। রাজনৈতিক সংকটে সুরঞ্জিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন-বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন সংসদীয় গণতন্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র-বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ। সংসদে ও সংসদের বাইরে সুরঞ্জিত ছিলেন সংবিধান ও গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা- শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। সুরঞ্জিত ট্র্যাজিক হিরো,তাকে সরকারি দলে মানাত না, তাকে বিরোধী দলেই বেশি মানায়-স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তার এলাকায় তিনি ছিলেন হ্যামিলেনের বংশীবাদক-কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী।
প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ জাতীয় পর্যায়ের কয়েকজন রাজনীতিক ও নাগরিকের মন্তব্য এগুলো। জাতীয় ও অনলাইন পত্রিকা থেকে মন্তব্যগুলো চয়িত। এই মহান রাজনীতিকের অন্তর্ধানে এলাকার রাজনীতিক-চিন্তকরা কী বলছেন? এর কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় স্থানীয় পত্র-পত্রিকায়। সুনামগঞ্জের কলামিস্ট হোসেন তওফিক চৌধুরী বলেছেন, তিনি মানুষের ভালবাসায় সিক্ত, বরণীয় ও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। রাজনীতিক শাহরিয়ার বিপ্লব তার স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, দিরাই শাল্লা শুধু নয় পুরো ভাটি বাংলায় যেন বেদনার সুর। দিরাই ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মিহির রঞ্জন দাস বলেছেন, তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রগতিশীল এক রাজনীতিবিদ। সুরঞ্জিতের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির জেলা আহ্বায়ক নাছির চৌধুরী বলেছেন, তিনি পুরোপুরি গণতন্ত্রমনা একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। দিরাইর রাজনীতিক আব্দুল কুদ্দুৃস বলেছেন, আমরা আজ অভিভাবকশূন্য হয়ে গেলাম। দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র আজিজুর রহমান বুলবুল বলেছেন, একজন সুরঞ্জিত দিরাই-শাল্লাবাসী তথা রাজনৈতিক অঙ্গনে কতটুকু প্রয়োজন তা এখন বুঝা যাবে। দিরাইর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আতাউর রহমান বলেছেন, বেসামরিক লোক হয়েও সাব সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিরল সম্মান অর্জনের পাশাপাশি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনে তার ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
একেবারে তৃণমূলের বক্তব্য পাওয়া যায় নি। তারা গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না। কিন্তু দেখা গেছে সবচাইতে আন্তরিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তাঁরাই। দিরাই-শাল্লাসহ পুরো ভাটি এলাকার হাজার হাজার সাধারণ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই সুরঞ্জিতের মৃত্যুতে হাউমাউ করে কেঁদেছেন। তাদের কান্না দেখে মনে হবে নিজের পরিবারের ঘনিষ্ট কোন স্বজনের জানি মৃত্যু ঘটেছে। বিজ্ঞ রাজনীতিক-বিশিষ্ট নাগরিক-স্থানীয় রাজনীতিক থেকে শুরু করে গ্রামের সাধারণ কৃষক ও গৃহবঁধুটি পর্যন্ত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করেছেন। জীবিত থাকতে মানুষের সার্বিক মূল্যায়ন সম্ভব হয় না। মৃত্যুর পরই পরিপূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব। কে ছিলেন সুরঞ্জিত, কোন উচ্চতায় ছিল তার অবস্থান, রাষ্ট্রগঠনে কী ছিলো তার ভূমিকা, তার অবর্তমানে কোথায় কোন শূন্যতা অনুভূত হবেÑ এবার খুব ভাল করেই সেগুলো নিয়ে নির্মোহ আলোচনা হবে।  বুঝা যাবে হাওরের ঢেউ আর শস্যশ্যামল প্রকৃতি থেকে বেড়ে উঠা সুরঞ্জিত আসলে কে ছিলেন। জীবিত থাকাবস্থায় নির্মম সমালোচনা গঞ্জনা সইতে হয়েছে তাকে। অসীম বেদনা আর অভিমান ছিলো তার বুকে। এখন তিনি যাবতীয় জাগতিক সমালোচনা-প্রশংসার উর্দ্ধে চলে গেছেন। এবার নিরবে আসুন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুরঞ্জিতের অবদান কতটুকু ছিলো। এ সুরঞ্জিতকে মহিমান্বিত করার জন্য নয়। এ হলো আত্মোপলব্ধির। এ হলো নিজেকে চেনার জন্য।    

  • [১]