উজ্জ্বল মেহেদী
জাকির হোসেন জেরিন। এখন অকালপ্রয়াত একটি নাম। এই শহরে তাঁকে চেনেন না এমন লোক মেলা ভার। নানাভাবে, নানা ভাবাদর্শ ও দৃষ্টিকোণ থেকে চেনা জেরিন নামের মানুষটি আড়াল হয়ে গেলেন। বড় তাড়াতাড়ি বলা চলে। এক সকালে সবাই ঘুম ভাঙার আগেই তিনি পাড়ি দিলেন না ফেরার দেশে।
১১ আগষ্ট বৃহস্পতিবার। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে চেনা ভুবনে তাঁর মৃত্যুসংবাদ আপ্লুত করল সকলকে। অথচ নিউজ পেপারবুমের এই শহরে তাঁর মৃত্যু সংবাদটা আর ফলাও করে আসল না। মৃত্যুর সুরে আর প্রচার হলো না, এই শহরে হৃদয়-আক্রান্ত মানুষের তাৎক্ষণিক কোনো চিকিৎসার সুযোগ নেই। আক্রান্ত হওয়া মানে বলে-কয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া। হৃদয়বাদের বিশুদ্ধ উচ্চারণ মৃত্যুই। সেভাবেই চিরবিদায় নিয়েছেন জাকির হোসেন জেরিন। হারিয়ে গেল হাসি রাশিরাশির একটি মায়াবী মুখ। জেরিনবিহীন পরিবার, স্ত্রী-দুই ছেলেসন্তানও হারাল মায়ার বাঁধন।
জাকির হোসেন জেরিন আমার খালাত ভাই। তাই এক মানুষ দুইভাবে আমার কাছে পরিচিত। প্রথমত, পারিবারিক; দ্বিতীয়ত, পরিবার-গ-ির বাইরে। এই গ-ির বাইরে চেনা জেরিন ভাইয়ের অকালে নীরব প্রস্থান, আর সেটি ব্যাপক লোক-জানাজানির বাইরে থাকাটা আমার কাছে এখন মনে হচ্ছে তাঁর জীবদ্দশায় প্রোথিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, বিপ্লবীর মৃত্যু নেইÑএ চেতনায় তাঁর কবি কিশোর সুকান্তের ‘আঠারো’ পরবর্তী দশকাল কেটেছে। তাঁর যৌবন কেটেছে মৌলিক এক কঠিন কর্মযজ্ঞে, সমাজের বিভাজন ভাঙতে শ্রেণি বৈষম্য ঘুচাতে, সংগ্রামীর চরিত্র ধারণ করে।
‘এ লড়াই, জাতীয় মুক্তি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র…’ এ মন্ত্রে দীক্ষিত জেরিন ভাইয়ের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কেটেছে মূল ধারার ছাত্ররাজনীতির বাইরে আরেক রাজনীতি সংগঠিত করার কাজে। জেরিন ভাই কি পারলেন? পারেননি, তাই তো নীরবে সেই সংগ্রামী জীবন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রচলিত ধারার বাইরে কতটা শক্তিমান ছাত্রনেতা ছিলেন তিনি, তা এই ‘বর্জুয়া’ সমাজে অপাঠ্য হয়েই থাকার কথা। এক সময় নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন। দলবদল করে মূল ধারায় ফিরতে পারতেন, কিন্তু তিনি খোলস বদলাননি। বলা-চলা-লেখা আর গাওয়া-সবখানেই ছিল সেই শ্রেণি-সংগ্রাম ঘুচানোর এক দুর্দান্ত লড়াই। যাঁর নিত্যসঙ্গী ছিল আলুথালু মানুষ। হতাশ ছিলেন না, গণসংগীতের গলা দিয়ে গাইতেন, জীবনমুখী শিল্পী নচিকেতার সেই গানÑ ‘…বসতি আবার উঠবে জেগে, জীর্ণ মতবাদ সব ইতিহাস হবে…পৃথিবী আবার শান্ত হবে!’
২। ‘আজকে হালকা হাওয়ায় উড়–ক একক চিল/ জলতরঙ্গে আমরা ক্ষিপ্ত ঢেউল ফেনিল/ উধাও আলোর নিচে সমারোহ/ মিলিত প্রাণের একী বিদ্রোহ/ ফিরে তাকানোর নেই ভীরু মোহ, গতিশীল/ সবাই এসেছে, তুমি আসোনিকো, ডাকে মিছিল।’ সুকান্তের এই ‘ডাকে মিছিল’ একদা আমিও আলোড়িত ছিলাম। এখন কেউ যদি বলে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কোনটি, তাহলে বলবো ওই টুকুই। বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে আবার স্বপ্ন ভঙের পাঠ হয়েছিল। সেখান থেকে আমার নিজেকে জানাও সম্পন্ন হয়েছিল। যাঁর সূত্রধর ছিলেন জেরিন ভাই। গণমানুষের অধিকার আদায়ের গান, গণসংগীতÑজনহেনরী আমার প্রথম শোনা জেরিন ভাইয়ের কণ্ঠ থেকে। নাটক সমাজ বদলের হাতিয়ার, সেটিও একজন নাট্যাভিনেতা জেরিন ভাইয়ের কাছ থেকে জানা। গণমানুষের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে সেই কিশোর বয়সে ইস্পাত, ম্যাক্সিম গোর্কির মা থেকে শুরু করে বিপ্লবী রবিদাম পর্যন্ত পাঠ চক্রে কঠিন পাঠ হয় তাঁর।
আমি তখন কৈশোর পাড়ি দেওয়ার পথে। কিন্তু সেই বয়সে আমি কমরেড রবিদামকে রপ্ত করে গণমানুষের নেতা কমরেড বরুণ রায়ের ছায়াতলে যেতে সক্ষম হই। হালে সুনামগঞ্জ শহরের একটি বিদ্যাপীঠের নাম ধরে কয়েক প্রজন্ম কী যেন ‘বলীয়ান’ টাইপের মোর্চার প্রচারণায় মাতেন। কিন্তু তারা ইতিহাসের দিকে ফিরেও তাকান না, শেকড়টা যে আমাদের ব্রিটিশবিরোধী। শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়ে রবিদামের বিপ্লবী চেতনার ¯্রােতধারায় জন্ম নিয়েছিল বুলচান্দ হাইস্কুল নামের পাবলিক স্কুল। শেকড় কিংবা ঐতিহ্যের লালন হলে ‘বলীয়ান-বুলচান্দ’ হওয়াটাই মস্ত এক গর্বের বিষয় ছিল, শির উঁচু করার মতো ছিল। কিছু মানুষের প্রোপাগা-ায় গৌরবোজ্জ্বল পাবলিক স্কুল যেন আজ ¤্রয়িমান, বিদ্রোহ-বিরহে কাঁদে। তাইতো প্রশ্ন জাগেÑআছি কি আমরা ব্রিটিশ আমলে? এখনও কেন তোয়াজ করতে হবে যাবতীয় সব ব্রিটিশ-বেনিয়া নির্মিত স্থাপনাগুলোকে?
৩। সম্ভবত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের কোনো এক তারিখ হবে, ১৯৯৭ সাল। আমি তখন আমার হাতেখড়ির সংবাদপত্র সুনামগঞ্জের সংবাদ এর বার্তা বিভাগের দায়িত্বে। সাপ্তাহিক পত্রিকা। তাই প্রতি বৃহস্পতিবার দিন থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হতো। লেটারপ্রেসে পত্রিকা বের হতো। সে এক মস্ত কষ্টের কাজ। চোখের সামনে থাকা লেখাগুলো হাতের গাঁথুনি দিয়ে ছাপাখানার কর্মিরা সাজাতেন। এখন আমরা যেভাবে কম্পিউটার বা ল্যাপটপে কী বোর্ডে বোতামগুলোতে আঙুল স্পর্শ করে শব্দ গাঁথি, ঠিক সে রকম।
ছাপাখানার অক্ষরগুলো সন্ধ্যার পরপরই তৈরি হয়ে যেত। একদিন সন্ধ্যায় খবর পেলাম সকালে ঘুমের মধ্যে হৃদরোগে মারা গেছেন আবদুল মালেক নামের একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি সুনামগঞ্জ সংবাদের বিভাগীয় সম্পাদক ছিলেন। আমি সন্ধান করি এবং জেনেও যাই। এই লোকটাই সারা দেশের মৌলিক পড়–য়া গোষ্ঠীর একজন ধীমান লেখক ‘জহির সাদিক’। অকালপ্রয়াত জহির সাদিক। শেষ পৃষ্ঠায় অনাদারে লেটারপ্রেসের নিছক সেই শোকসংবাদটি আমি সাহস করে প্রথম পাতায় ছেপেছিলাম।
শহরের মধ্যগগনে ওষুধের দোকানে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো একটা লোক বসে থাকতেন। বিদ্যুৎ রায় তাঁর নাম। ‘আপ্পাদা’ নামে ভুবন ভোলানো এক পরিচিত ছিল তাঁর। আমি সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরই পরপারে চলে গেলেন। সেটিও অকালপ্রয়াণ। জীবনে কিংবা মরনেও প্রচারণায় ধারেকাছে নেই তাঁরা। ছিল না কোনো অভিলাষও। এরপরও আমার সাংবাদিকতা শুরুর ওই সময় আপ্পাদাকে নিয়ে ‘তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম…’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। সিলেটের দৈনিক মানচিত্র পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠাতে ছাপা হয়েছিল বলে আপ্পাদার মৃত্যু কিছুটা হলেও চাপা পড়েনি।
এ দুজনের প্রসঙ্গ এলো জেরিন ভাইয়ের হুটহাট চলে যাওয়া, আর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের অজানা থাকার পরিপ্রেক্ষিতে। তাঁদের প্রতি আমার সবিনয় এক পরামর্শ; মরা নদী ভরা অতীতের মতো এই শহরে কিছু ছাত্রনেতা আছেন। তারুণ্যে তাঁদের কর্ম তৎপরতা জীবদ্দশায় লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে। ছাত্ররাজনীতি মানেই কি লেজুড়বৃত্তি? তা-তো নয়, লেজুড়বৃত্তির বিরুদ্ধচারিতা প্রবল ছিল।
সেই হারানো জহির সাদিক লেখায় লেখায় যে জনগোষ্ঠীর মুক্তির কথা লিখতেন, আপ্পাদা শ্রেণি-বৈষম্য ঘুচাতে যে বিপ্লবের স্বপ্ন বুনতেন, জেরিন ভাই ছিলেন সেই পথেরই একজন পথিক। তবে কি আমরা পথ হারিয়েছি বলে পথের সাথিকে চিনতে পারছি না? অবশ্য এ নিয়ে কোনো ব্যাক্তিবিশেষ নয়, সমাজকে নিয়ে প্রথাবিরোধী লেখক-কবি হুমায়ূন আজাদ-এর আক্ষেপ হতে পারে মোক্ষম এক সান্ত¦নাÑ
‘সেই কবে থেকে জ্বলছি/ জ্ব’লে জ্ব’লে নিভে গেছি ব’লে/ তুমি দেখতে পাও নি।/ সেই কবে থেকে ডাকছি/ ডাকতে ডাকতে স্বরতন্ত্রি ছিঁড়ে বোবা হয়ে গেছি ব’লে/ তুমি শুনতে পাও নি।/ সেই কবে থেকে ফুটে আছি/ ফুটে ফুটে শাখা থেকে ঝ’ড়ে গেছি ব’লে/ তুমি কখনো তোলো নি।…’
৪। এবার পারিবারিক কাহনে ফিরি। পাঁচ বছরের মাথায় জেরিন ভাইদের পরিবারে আরও দুটো মৃত্যুর শোক বয়ে গেছে। এরমধ্যে ঝড়ো হাওয়ার মতো ছিল জাহিদ ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যু। তিনিও ঠিক একইভাবে, অকালে মারা গেছেন। আমাদের বড় খালাম্মা মানে জেরিন ভাইয়ের আম্মা পবিত্র হজব্রত পালনে সৌদিআরব গেছেন যে দিন, পরদিনই ঘটল এ ঘটনা। মায়ের মন, না বলতেই জানা হয়ে যায়। সেখানে তাঁকে জানানো হয়েছে ছেলের আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদ। না জানি কী অবস্থায় আছেন খালাম্মা।
বাড়িতে আছেন মায়ের প্রতিমা ছোট খালাম্মা। সেদিন সাতসকালে পাগলপারা ছোটখালাম্মার কান্না ভরা মুঠোফোন কল, প্রলাপের মতো বলছিলেন, ‘দেখো এসে, আমার জেরিন ঘুম থেকে জাগছে না আর, কত ডাকছি… তোমরা সবাই আসো, ডাকো তারে… জাগাও!’
ওপাশে ক্ষতবিক্ষত আমি, নীরবে কাঁদছি। যে ছোট খালাম্মা আমাদের জন্য সবসময় সান্ত¦না জানানোর মস্ত খনি, তাঁকে আজ কী করে সান্ত¦না দেই? শোককাতর ছোট খালাম্মার সেই কথাগুলো আমার কানে বাজছে এখন অন্য রকম সুর হয়ে। জেরিন ভাইয়ের প্রিয় কবিদের একজন পল্লিকবি জসিমউদ্দিনের এ পংক্তি পুনর্পাঠ করি, তাতেও যেন মৃত্যুর সুরÑ
‘…কে জানিত হায়, তাহারও পরাণে বাজিবে মরণ বীণ!/ কি জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল, আর উঠিল না ফিরে,/ এইখানে তারে কবর দিয়েছি, এসো, দেখো, উড়ে উড়ে…।’
লেখক : প্রথম আলো’র নিজস্ব প্রতিবেদক।