- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মৃত্যুসঙ্গী

কুমার সৌরভ
জার্মানীতে আমিরুল কবির এক বিচিত্র পেশায় জড়িত ছিলেন। নিজের পেশাগত পরিচয় দিতেন ”শেষ সময়ের বন্ধু’ বলে। তিনি নিজেকে বলতেন ‘মৃত্যুসঙ্গী’। তার কাজ ছিল গুরুতর অসুস্থ বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের সাহচর্য দেয়া। না, পীড়িত ব্যক্তিকে চিকিৎসা সেবা দান তার কাজ নয়। তিনি পীড়িতদের পাশে বসে থাকতেন। গল্প করতেন। রোগীকে মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখতে ইতিবাচক কথাবার্তা বলতেন। মূলত রোগীর একাকিত্ব ঘুচানোই তার কাজ। তার কাজের সময় নির্ধারিত থাকত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার কাজের সময় হত সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা । সোজা কথায় অফিস টাইম। জার্মানিতে সকলেই ব্যস্ত। বিশেষ করে অফিস টাইমে কোন কর্মক্ষম ব্যক্তিরই ঘরে থাকার উপায় নেই। তারা অসুস্থ পিতা মাতাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য এমন শেষ সময়ের বন্ধু নিয়োগ দেন।
কবির এখন যে রোগীকে সাহচর্য দিচ্ছেন তিনি ৮০ বছরের বৃদ্ধা অটো পিটার্স। লাং ক্যান্সারের রোগী। লাস্ট স্টেজ। পিটার্স স্থানীয় কমিউনিটি হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে ভ্যান্টিলেশনে নিতে হয়। নিয়ম করে চিকিৎসক দেখে যান। নার্সরা সময়মত ঔষধ দিয়ে যায়। মুখে এখন ঔষধ খেতে পারেন না পিটার্স। ইনজেকশন আর অটোমেটেড নেবোলাইজার প্রয়োগ করতে হয়। ২ দিন আগে তার লাস্ট সাইকল কেমোথেরাপি শেষ হয়েছে। কেমোর প্রতিক্রিয়ায় পিটার্সের চুল পড়ে গেছে। দুর্বল হয়ে পড়ছেন তিনি। কোনো কিছু খেতে পারছেন না। দুই ঘণ্টা পরপর নার্স রাইসফিডার দিয়ে দুধ খাইয়ে যাচ্ছেন। বুঝা যায় পিটার্সের শেষ সময় সমাগত প্রায়। তিনি অর্ধচেতন অবস্থায় রয়েছেন। যখন একটুখানি চেতনা ফিরে আসে তখন চোখ খোলে অস্ফুট স্বরে বলেন- রাইসা… এঞ্জেল…। ডাকছেন তিনি রাইসা ও এঞ্জেলকে।
কবির বসে আছেন পিটার্সের মাথার দিকে একটি চেয়ারে। তিনি বাইবেলের একটি বাণী পাঠ করে শোনাচ্ছেন- ‘ঘাস শুকিয়ে যায়, আর ফুলও ঝরে যায়, কিন্তু প্রভুর বাক্য চিরকালীন সত্য’। পিটার্স- সর্বদা সদাপ্রভুকে স্মরণ করুন। তিনিই আপনার সকল ইচ্ছা পূরণ করবেন। কবির আলতোভাবে পিটার্সের চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন।
পিটার্স এখন ঘোলা চোখে তাকিয়ে আছেন কবিরের দিকে। কম্পিত হাতখানি এগিয়ে দিলেন। কবির সেই হাতটি পরম মমতায় ধরলেন। পিটার্স আবারও জড়ানো কণ্ঠে বলার চেষ্টা করছেন- ‘ক..খ..ন.. আ..স..বে..ও..রা..’। পিটার্সের করুণ আকুতি সইতে পারছেন না কবির। বললেন- ‘ব্যস্ত হয়ো না, এই ইভিনিংয়েই আসছে ওরা’। কবির মনে মনে বলল, ‘হে মাবুদ এই ইভিনিংটিকে তুমি বিষন্ন করে দিও না’।
পিটার্সের প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। কবির নার্সকে ফোন করলেন। নার্স ডাক্তারকে জানাল। ডাক্তার আসলেন। পিটার্সকে পুনরায় ভ্যান্টিলেশন চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হল দ্রুত গতিতে।
বিকালে এঞ্জেল ও রাইসা আসলেন। এঞ্জেল পিটার্সের একমাত্র পুত্র সন্তান, রাইসা নাতনী। ওরা ফুল নিয়ে এসেছে। বেড খালি দেখে রাইসা ডুকরে কেঁদে উঠল। এঞ্জেল দ্রুত ছুটে গেলেন ডাক্তারের কাছে।
রাইসা ও এঞ্জেল এখন ভেন্টিলেশন চেম্বারের বাইরে। রাইসার হাতে সেই ফুলের তোড়া। পুরো কাঁচের দেয়ালের ওপাড়ে দেখা যাচ্ছে পিটার্সকে। ভেন্টিলেশন বেডে পড়ে আছেন। হালকা নীল গাউন গায়ে জড়ানো। মুখে নাকে ভেন্টিলেশন পাইপ।
রাইসা ফুলের তোড়া দেখিয়ে ডাকল- ড্য গুস মাদা! ফিরে আসো, দেখ কী তাজা ফুল এনেছি তোমার জন্য। এঞ্জেল জড়িয়ে ধরে আছে কন্যাকে।
মি. আমিরুল কবির ফিরে যাচ্ছেন নিজের এপার্টম্যান্টে। রাইসা কিংবা এঞ্জেল তার চলে যাওয়ার বিষয়টি খেয়ালও করল না। কবিরের চোখ ভেজা। এমন ভেজা চোখ তার কাছে নতুন কিছু নয়।

  • [১]