গত এক সপ্তাহ ধরে সুনামগঞ্জে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। গতবছরের ১৬ জুন ইতিহাসের সবচাইতে ভয়ানক বন্যায় প্লাবিত হয়েছিলো সুনামগঞ্জ। সেই ভয়াল বন্যায় মানুষের জীবন ও সম্পদকে করে তুলেছিলো ভীষণ বিপর্যয়কর। গতবছর এমন প্রলয়ংকরী বন্যার কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি। এত বড় মহাপ্রলয় ধেয়ে আসছে তার সামান্য কোনো ধারণা দেয়া হয়নি আবহাওয়া বিভাগ থেকে। ফলে প্রায় অপ্রস্তুত মানুষকে ঢলের বেগে ধেয়ে আসা এই বন্যা অবাক করে দিয়েছিলো। ওই বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণের কোনো হিসাব করা হয়নি। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, প্রায় প্রতিটি মানুষের ভিটেমাটি, ধান-চাল, ঘরবাড়ির আসবাব ও সামগ্রি বিনষ্টকরণসহ বেশকিছু প্রাণহানিও ঘটিয়েছিলো। মানুষ এখন আকাশে মেঘ জমলেই ভয় পাওয়া শুরু করেছে। এবারও গতবছরের মতো বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। বর্ষাকালে এমন বৃষ্টিপাত একেবারেই স্বাভাবিক হলেও গত বছরের অভিজ্ঞতা মানুষকে ভয়তাড়িত করে রেখেছে। আবহাওয়া দপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে এবার এখনও বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। এই আশ্বস্ত করার পিছনে বেশ কিছু কারণও আছে। এরমধ্যে প্রধান হলো, জেলার হাওরগুলো আগে থেকে জলমগ্ন হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাত ও উজানের ভারত অংশ থেকে নেমে আসা ঢল অনায়াসে হাওরগুলোতে নামতে পারবে। সামনের কিছুদিন হয়তো এই আশ্বস্ত থাকার বাস্তবতা বিরাজ করবে। কিন্তু উজানে ও অভ্যন্তরে টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি খারাপ হতে সময় লাগবে না। এই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
জনপদগুলো এখন সহজেই জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে যায়। ফলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই কৃত্রিম বন্যার দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়। জনপদগুলোর জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হলো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রাকৃতিক উৎসগুলোর বিলুপ্তি। সুনামগঞ্জ শহরের কথা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, এই শহরে আগে যেসব খাল ছিলো সেগুলোর অস্তিত্ব এখন আর নেই। এইসব খাল ছিলো শহরকে জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখার প্রধান অবলম্বন। এখন পানি নিষ্কাশনের জন্য যে ড্রেনেজ সিস্টেম করা হয়েছে তা আগের প্রাকৃতিক খালের সক্ষমতার তুলনায় অনেক দুর্বল। পাকা ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ থাকে। ফলে এইসব ড্রেন অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি টেনে নিতে পারে না। এর ফলে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে নাগরিকদের অশেষ দুর্ভোগের কারণ হতে দেখা যায়। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, মহিলা কলেজের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস যেটি আগে পুরানো জেলখানা ছিলো; এই বৃষ্টিúাতে তার আঙ্গিনায় হাঁটু জল জমে গেছে। এমন অবস্থা শহরের বহু জায়গায় তৈরি হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
প্রশাসনকে বন্যা মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। যাতে সেরকম পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বানবাসী মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়া যায়। বন্যার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘিœত হয়। বিপর্যস্ত হয় টেলি নেটওয়ার্ক। তৈরি হয় বিশুদ্ধ পানির সংকট। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়। সমস্যা হয় রান্না করে খাবার তৈরির। বাজারে নিত্যপণ্যের সংকট তৈরি হয়। শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীনতায় পতিত হয়ে খাদ্যাভাবের সম্মুখীন হয়। যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকেন। বিশেষ করে গ্রামগুলোতে যেখানে বহুতল ভবন নেই বললেই চলে সেখানকার দুর্ভোগ অকল্পনীয়। সুতরাং বন্যার আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করার সময় এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে।
দুর্যোগের আশঙ্কাকে হালকাভাবে গ্রহণ না করে সঠিক পূর্বাভাসের ভিত্তিতে উপযুক্তভাবে তৈরি থাকতে হবে। সেটি যেমন প্রশাসনের তেমনি সকলের। আগাম মানসিক প্রস্তুতি থাকলে দুর্যোগকে মোকাবিলা করা সহজ হয়।