সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তথাকথিত মেধাবৃত্তির নামে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর পরীক্ষার চাপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের নামে পরিচালিত এসব মেধা বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের লাভ কী হচ্ছে, এইসব পরীক্ষার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে মেধা বিকশিত হচ্ছে কিনা, সেটি ভাববার বিষয় বৈকি। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে শিশু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থেকে যত দূরে রাখা যায় তত মঙ্গল। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষাকে বিযুক্ত করা সম্ভব হয় নি। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বছরে একাধিক পরীক্ষায় বসতে হয়। তদুপরি উটকো ঝামেলার মতো উড়ে এসে জুরে বসা এইসব মেধাবৃত্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিড়ম্বনাই বাড়িয়ে তুলছে কেবল। শিক্ষার্থীরা কোন বয়সে কতটুকু শিখবে, কী শিখবে তার একটি জাতীয় মানদ- আছে। সরকার সেটি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করেছেন। সেই অনুসারে পাঠ্যসূচি প্রণীত হয়েছে। শিক্ষক শিক্ষিকারা ওই মানদ-ের ভিত্তিতে শিক্ষা দিয়ে থাকেন এবং প্রচলিত ব্যবস্থা অনুসারে শ্রেণি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মেধার স্তর পরিমাপ করে থাকেন। এর বাইরে মেধা পরিমাপ করার জন্য আর কোন কিছুর প্রয়োজন রয়েছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। যারা মেধাবৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন করে থাকেন তাদেরকে এই বিষয়টি চিন্তা করতে হবে। সরকারকেও বিবেচনা করতে হবে ঢালাওভাবে যত্রতত্র যেভাবে খুশি এইসব মেধাবৃত্তি পরীক্ষা চলতে দেয়া উচিৎ কিনা তা নিয়ে।
মেধা বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজকদের উদ্দেশ্য নিয়ে কারও কোন প্রশ্ন নেই। তারা একটি মহৎ কাজে জড়িত হওয়ার মানসিকতা নিয়েই এই আয়োজন করে যাচ্ছেন। অতীতে এমন বেসরকারি মেধা বৃত্তি পরীক্ষার সংখ্যা কম ছিল, আয়োজকদের পদ্ধতির মান উন্নত ছিল, উত্তীর্ণদের জন্য আকর্ষণীয় উপহার ছিল, তাই এসব নিয়ে কেউ কোন কথা বলার প্রয়োজন মনে করেন নি, বরং উৎসাহিত করেছেন। কিন্তু এখন যখন এক জন শিক্ষার্থীকে স্কুলের পরীক্ষার বাইরে আরও ডজনখানেক পরীক্ষায় বসতে হয়, তখন এনিয়ে চিন্তা না করলে শিশু মনে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেই উদাসীন থাকা হবে। মেধাবৃত্তির আয়োজকরা এক্ষেত্রে সৃজনশীল ধ্যান ধারণার বিস্তৃতি ঘটাতে পারেন। সনাতনী ধাঁচের পরীক্ষার বদলে তারা শিক্ষার্থীদের জন্য বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা লিখা, চিত্রাঙ্কণ, বইপড়া ইত্যাদি প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারেন। এতে পাঠ্যসূচির বাইরে শিশুদের সুকুমার বৃত্তি চর্চার দিগন্তটি আরও প্রসারিত হবে। আর যারা একান্তই পাঠ্যসূচীভিত্তিক মেধাকে মূল্যায়ন করতে চান তারা বিদ্যালয়ের ফলাফল অনুসারেই সেটি করতে পারেন।
শিশুদের একেবারে জীবনের শুরুর লগ্নে প্রতিযোগিতামূলক জায়গায় ফেলা দেয়া কিছুতেই উচিৎ নয়। পাঠগ্রহণকে তাদের জন্য আনন্দদায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অযাচিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যারা অসফল হয় তাদের মনে কেমন মন্দ প্রতিক্রিয়া হয় এবং এর ফলাফল কী হতে পারে তা সকলের ভাবা দরকার। তাই আমরা মনে করি, সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি মেধাবৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। এসব বিষয়ে অভিভাবকদেরও যথেষ্ট সচেতন হতে হবে। হুজুগে মেতে নিজের সন্তানকে সবার চাইতে সেরা বানানোর জন্য তাকে একটি নিরেট যন্ত্রে পরিণত করে ফেলবেন না। শিশুকে শিশুর মতো বাঁচতে দিন।