- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মেশিনের মাটি কাটা ও দুর্নীতিমুক্তির প্রত্যাশা

কর্মসৃজন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় কর্মহীন সময়ে গরিব মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য। মূলত রিলিফ না দিয়ে মানুষকে কাজের সুযোগ দিয়ে উপার্জন করার সম্মানজনক ব্যবস্থা চালু করাই ছিল সরকারের লক্ষ। এতে যেমন গ্রামীণ জনপদের কিছু কাজও হয়ে যায় তেমনি গরিব মানুষ সেখানে কাজ করার সুযোগ পেয়ে দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু সরকারের এই মহতী উদ্দেশ্যটি জড়িত লোকজন সমূলে বিনষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছে। কর্মসৃজন প্রকল্পটি রীতিমত লুটপাটের খনি হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্প নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। বরাদ্দের অর্ধেকই আত্মসাৎ হয়ে পড়ে বলে জোর আলোচনা চালু আছে। কর্তা ব্যক্তিদের দুর্নীতিগ্রস্ত মানসিকতার কারণে কর্মজীবীরাও এখানে এসে অলস হয়ে যান। স্বাভাবিকভাবে তারা যে কাজ করতে পারেন তার চাইতে অনেক কম কাজ করে তারা পার পেতে চান এখানে। অর্থাৎ কর্মসৃজন প্রকল্পটি কর্তাদের সাথে কর্মীদেরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলেছে। তাই প্রকল্পটি যে এখন মূল উদ্দেশ্য থেকেই বহু বহু দূরে অবস্থান করছে তা বলাই বাহুল্য।
ধর্মপাশার এক ইউনিয়নে কর্মসৃজন প্রকল্পের মাটি কাটার কাজে মেশিন ব্যবহারের খবর প্রকাশিত হয়েছে গতকালের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। বলাবাহুল্য প্রকল্প নীতিমালা অনুসারে এই কাজে মেশিন ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। কাজের মজুরিও পরিশোধ হয় শ্রমিকদের নামে। তারপরও মাটি কাটার কাজে এখানে এক্সেভেটর মেশিন লাগানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ধর্মপাশা বলেছেন, মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হলেও প্রকল্পভুক্ত শ্রমিকদের নামেই বিল দেওয়া হবে। এখানে যে কথাটি আমরা বলতে চাই, শ্রমিকদের নামে বিল যদি পরিশোধ করা হয় তাহলে মেশিনের ভাড়া পরিশোধ করা হবে কী করে? নিশ্চয়ই তাহলে ভুয়া শ্রমিকের নাম ব্যবহার করা হবে এবং ওই টাকা তোলে মেশিনের খরচ সংকুলান করা হবে। অর্থাৎ দুর্নীতির বিষয়টি আর সংগোপন করার কোনো দরকার নেই।
আমরা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ দেখার বাসনা প্রবলভাবে অন্তরে পোষণ করি। কিন্তু দুর্নীতি যে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে, ধনি-গরিব নির্বিশেষে সুযোগ পেলেই যে আমরা দুর্নীতি করার মওকা হাতছাড়া করি না, দুর্নীতির সেই সর্বপ্লাবী সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা কি এতই সোজা? দুর্নীতিমুক্ত দেশ করতে সবার আগে দরকার মানুষের ভিতরকার দুর্নীতি করার যে ইচ্ছা আঠার মতো লেগে আছে সেটি দূর করা। এক দিন, দুই দিনে এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। এই কাজটিকে একটি জাতীয় ব্রতের মতো গ্রহণ করে যদি উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সকলে সেটিকে কর্তব্য জ্ঞান করেন; কেবল তাহলেই সময়ের ব্যবধানে এই মহামারি থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। এই জায়গায় রাষ্ট্রীয় আর্থ-রাজনৈতিক নীতি সরাসরি সম্পর্কিত। অর্থাৎ সকল পর্যায় থেকে দুর্নীতি দূর করতে হলে রাষ্ট্রীয় দর্শনে তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
ধর্মপাশার কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকের পরিবর্তে মেশিন ব্যবহার, কিংবা অন্য কোনো প্রকল্পে শতকরা ২৫ ভাগ কাজ না হওয়া, অথবা ভুয়া শ্রমিকের নাম ব্যবহার করে সরকারি বরাদ্দ উত্তোলন ইত্যাদি নিয়ে যে যত কথাই বলেন না কেন তা সহজে দূর হওয়ার নয়। সামান্য উনিশ-বিশ ব্যবধানে এটি চলতেই থাকবে। কারণ আমরাই এর পৃষ্ঠপোষকতা করি। তবে কথা হল, প্রত্যাশা ভিন্ন ইতিবাচক অর্থে পরিবর্তনের সূচনা সম্ভব নয়। সেই প্রত্যাশাটা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বৈকি। ওই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করি, কাগজের জায়গা পূর্ণ করি। দুর্নীতির তমসা থেকে সুনীতির আলোয় আসাটাই যে মানুষের সহজাত প্রত্যয়।

  • [১]