বিন্দু তালুকদার
কোন কাজ না করেই উন্নয়ন প্রকল্পের সমূদয় টাকা আত্মসাতের কারণে আটকে আছে পুরো ইউনিয়ন পরিষদের চলতি অর্থ বছরের ১৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ। প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি ও টাকা আত্মসাতের কারণে বিপাকে পড়ছে সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ। ২০১৩-১৪ বছরে আত্মসাতকৃত ১ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দেওয়ায় এবারের বরাদ্দের ১৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ছাড় করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরের উন্নয়ন প্রকল্পে মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের অসহায় ও দরিদ্রদের মাঝে স্যানিটারি রিং-স্লাব বিতরণ প্রকল্পে ১ লাখ টাকার কাজে এই অনিয়ম-দুর্নীতি ঘটে। স্থানীয় ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাকসুদ আলী ও তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাজির উদ্দিনের (বর্তমানে মৃত) বিরুদ্ধে এই অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নীরিক্ষণে (অডিট) বিষয়টি ধরা পরার পর আত্মসাতকৃত টাকা ফেরত দেয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে টাকা আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ চেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি লেখা হয়েছে। তবে এখনও প্রকল্পের টাকা ফেরত দেয়নি অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মাকসুদ আলী।
মাকসুদ আলী সম্প্রতি হয়ে যাওয়া নির্বাচনে আবারো একই ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও ওই প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের দায়ে তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাননি।
জানা যায়, এলজিএসপি-২ এর নীতিমালা অনুযায়ী স্থানীয় ওয়ার্ড কমিটি ঠিকাদার দিয়ে কাজ বাস্তবায়ন করেন। ওয়ার্ডের সুপারভিশন কমিটি কাজ তদারিক করেন। উভয় কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ঠিকাদারকে বিল প্রদান করা হয়। কিন্তু ওই ইউনিয়নের গত ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে ৪ নং ওয়ার্ডের অসহায় ও দরিদ্রদের মাঝে স্যানিটারী রিং-স্লাব বিতরণ প্রকল্পে ১ লাখ টাকার কোন কাজই হয়নি। কিন্তু স্থানীয় ওয়ার্ডের দুই কমিটি এই প্রকল্পের বিল উত্তোলনে নিজেদের পছন্দসই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুমাইয়া এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার মনোয়ার হোসেনের নামে বিল উত্তোলনের জন্য সম্মতি প্রদান করেন। এবং সংশ্লিষ্ট সবার যোগসাশজে প্রকল্পের কাজ কাগজে-কলমে বাস্তবায়ন দেখিয়ে পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে অডিটে এই প্রকল্পের কোন কাজই হয়নি বলে ধরা পরে। অডিট এই প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে অনিয়ম হয়েছে উল্লেখ করে আপত্তি জানান। অভিযুক্ত ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিলোয়ার হোসেন ঢাকায় গিয়ে আপত্তির জবাব দাখিল করলেও সন্তুষজনক না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জবাব গ্রহণ করেন নি। প্রকল্পের কাজ হয়নি বলে পুরো টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
স্থানীয় ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অভিযুক্ত মাকসুদ আলী বলেন,‘আমার বিরুদ্ধে প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করার অভিযোগ সঠিক নয়। এই প্রকল্পের কাজ করেছেন ঠিকাদার। প্রকল্পের টাকা ছাড় করেছেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাজির উদ্দিন। আমরা ঠিকাদার দিয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ করিয়েছি, কিন্তু এলাকার কিছু মানুষ অডিটের কাছে অভিযোগ করেছিল। তাই বলা হচ্ছে কাজ হয়নি, টাকা আত্মসাৎ করেছি।’
মোল্লপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান দিলোয়ার হোসেনের সাথে কথা বলতে চাইলে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান নূরুল হক বলেন,‘এই প্রকল্পের বিষয়টি আমি শুনেছি। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।’
এলজিএসপি-২ প্রকল্পের জেলা ফ্যাসিলিটেটর খন্দকার রবিউল আওয়াল নাসিম বলেন,‘মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের অসহায় ও দরিদ্রদের মাঝে স্যানিটারী রিং-স্লাব বিতরণ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। কোন কাজ না করেই প্রকল্পের পুরো টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। অডিটে বিষয়টি ধরা পরার পর আত্মসাতকৃত টাকা ফেরত দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। প্রকল্পের আত্মসাতকৃত টাকা ফেরত দেয়া না হলে নতুন করে টাকা ছাড় হবে না।’
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী বলেন,‘ মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ওই প্রকল্পের টাকা আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ পরিচালক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) লুৎফুর রহমান বলেন,‘ মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের এই প্রকল্পের আত্মসাতকৃত টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হবে এবং ঘটনার সাথে যে বা যারা জড়িত আছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’