- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মোহাম্মদ সাদিকের কবিতার দিকে যাই

মুহম্মদ ইমদাদ  
একুশ শতকের স্বদেশ ও বিশ্বের উদ্যত বর্ষাফলকের সামনে
কবি উচ্চারণ করেন ধাড়ারগাঁয়ের মাতৃমন্ত্র। কবিতা
শরীরে মোজেকখচিত হয়ে ওঠে প্রকৃতির বৈভব- বৈচিত্র,
ধাড়ারগাঁয়ে জোনাক কথা, নদী, হাওর, মানুষ,
প্রেম ও মরমি সাধনার শব্দকুহক। মোহাম্মদ সাদিক অগোচরের কবি, তিনি কবিতা লেখেন জীবনানন্দে, উপাসনার মতো।
মোহাম্মদ সাদিকের কবিতা সম্পর্কে ওপরের কথাগুলো লিখেছিলেন আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ পুরুষদের একজন, সৈয়দ আকরম হোসেন।
কবি মোহাম্মদ সাদিকের কবিতা পড়তে পড়তে আমাদেরও তা-ই মনে হয়। সম্প্রতিপ্রকাশিত তার মরমি কবিতার সংকলন ‘শফাত শাহের লাঠি’ গ্রন্থটি পড়ে আমাদের বিশ্বাস জন্মে যে, এ কবির কবিতার আধুনিক মননে-বেদনায় মিলেমিশে একাকার আছে বাংলার আবহমান বাউল-ফকিরদের মরমিমন্ত্র। তিনি বাংলা ভাষার একমাত্র কবি, যিনি একইসঙ্গে যাপন করেন একজন আধুনিক কবির হৃদয় ও একজন লালন/হাসন রাজার চিরকালীন আত্মা। আর এ কারণেই তিনি কবিতার জোছনায় বেড়ে উঠতে উঠতে নিজ হাতে হৃদয় তুলে দিতে পারেন মনমহাজনি নায় :
হাওর যেখানে সিথান রেখেছে/পাহাড়ের কোলে এসে/মরমি মানুষ উড়িয়েছে পাল/দেহ-বজরায় ভেসে/সেখানে উদাস বেড়েছে তরুণ/কবিতার জোছনায়/হৃদয় দিয়েছে নিজ হাতে তুলে/মনমহাজনি নায়।
তাই আমাদেরই কালের ভাষায় লেখা তার কবিতাগুলো/কবিতার জগৎ খুব সন্তর্পণে আলাদা হয়ে যায়। মেলানো যায় না এ সময়ের কোনো কবির কবিতার সঙ্গে। তার কবিতা একজন আধুনিক কবির হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসা ‘বাউল-কবিতা’ যেন। কিন্তু লোককবিতা না। কারণ তিনি লিখতে পারেন :
‘মানুষ জন্মগ্রহণ করে কারণ মাটি হওয়া ছাড়া আর তার অন্য/কোনো নিয়তি নেই।’
অথবা,
‘ছোটো’পা তোর নকশিকাঁথা বুনতে বুনতে নামল এসে/শীতের শিশির/তবু তো তোর শিল্পকলা শেষ হল না, শেষ হল না!/লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এ কোন কাঁথা বুনলি আপা।’
মাটি হয়ে যাওয়া যার নিয়তি সেই মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কাঁথা বুনে যায়? এখানে এসেই আমরা বুঝতে পারি তার বিশ্ববোধ আর কসমিক বেদনা। মনমহাজনি নায় ভেসে যেতে যেতে তার আত্মা অবলোকন করে মানুষের মরণশীলতা আর অমরত্ব। ফলে ‘যেহেতু থাকব না’ শিরোনামের কবিতায় যেমন লিখেন,
‘কেন তবে এইখানে ঘর বাঁধা, নিকোনো উঠোন/ঘাটের কিনারে নৌকা, নেবু ফুল, বাঁশঝাড়’ অথবা ‘এই দেহজমিন ছাড়া আমার অন্য কোনো ভূমি তো নেই।’
তেমনি তিনি ঘোষণা করতে পারেন,
‘তোমার প্রেমিকাদের তুমি ক্ষমা করে দাও/যারা তোমাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল এবং কখনও যারা ভালোবাসেনি/মূলত মানুষ নয়, মাটি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে তুমি মাটি ভালোবাসো/প্রতিদিন এখানে ঈগল তাড়া করে দোয়েলকে/ দোয়েলের কোনো দুঃখ নেই, সে এখন অন্ধকার।
যেন ‘জীবনদেবতা’র প্রতি সুন্দর সাহসী পবিত্র লোভ আর পরাশক্তির কাছে অসহায় হেরে যাওয়া শক্তিহীনের বিপুল জীবনবোধ অথবা দোয়েলের গভীর আকাশের আশা!
মোহাম্মদ সাদিকের কবিতা আমাদের পৌঁছে দেয় সেই চিন্তা ও সুন্দরের জগতে যেখানে আমরা প্রাকৃতিক-জাগতিক অসহায়ত্বকে অনুভব করি গভীর বেদনায়, আর নিজেরই হৃদয়ের স্বপ্ন ও শক্তির জোরে পৃথিবীকে সুন্দরে ভরে দিতে চাই। কারণ তিনি লিখেন :
‘মানুষের মতো শ্রেষ্ঠ ফুলগুলো ভালোবাসো/হয়তো এখানে কিছু ক্ষত কিছু কীট আছে, বিষ আছে/তবু দ্যাখো/মানুষ নামের এসব আশ্চর্য সুন্দর ফুলগুলো ফুটে আছে/ তারা আছে বলেই আকাশ এতটা নীল, পাখির পালকে এত রং/সুরের সা¤্রাজ্যে এত শান্তি/তুমি সে মানুষ, সেই মহামানবের হৃদয়ের ভাষা মমতায় পাঠ করো’
বাউল-ফকিরের আত্মার সঙ্গে আধুনিক কবির আত্মা মিশে কবি মোহাম্মদ সাদিকের ‘বাউল-কবিতাগুলো’ বাংলা কবিতার ঐতিহ্যকে নতুন একটি দিগন্তের দিকে বিস্তার ঘটিয়েছে। বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ, নজরুল বা জসীমউদ্দীনকে যেমন একলা একলা লাগে, তেমনি কবি মোহাম্মদ সাদিককেও আমাদের কাছে একটু একলা লাগে। এ একাকিত্বই তো চায় আজকের পাঠক। যে একাকিত্ব থেকে জন্ম নেয় নতুন স্বর-সুর, নতুন আত্মা।
২.
মোহাম্মদ সাদিক তার কবিতা-বিষয়ে লিখেছেন, ‘কবিতা লিখতে লিখতে বুঝেছি, আমি কবিতা না লিখলেও সভ্যতার কোনো ক্ষতি হতো না। নিজের কবিতা পড়তে পড়তে বুঝি কবিতা নিয়ে আমার অহংকার করার কিছুই নেই। তবু ভালোবাসার এ সব পঙ্ক্তি, আমার গোপন বেদনা ও আনন্দাবেগকে সতত জাগিয়ে রাখে।’
কবির এ কথাগুলো পড়ে আমরা তার কবিতায় যদি প্রবেশ করি তাহলে বুঝতে পারি এ কবি সব দিক দিয়েই আলাদা। কারণ, আমরা জানি পৃথিবীর সব কবিই মনে করেন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি। অথচ মোহাম্মদ সাদিক জীবন অতিবাহিত করছেন একজন প্রকৃত কবির মতোই। তার সঙ্গে কথা বলে সবসময়ই মনে হয়েছে তিনি একজন কবি। কবি ছাড়া আর কিছু নয়। দীর্ঘ কবিজীবনে তার কবিতার পরিমাণ হয়তো বিপুল নয়; কিন্তু তার কবিতার আনন্দ, মৌলিক আনন্দ; তার কবিতার বেদনা, চিরকালের বেদনা। আর এ কারণেই খুব সহজে তার কবিতার সঙ্গে পাঠক একাত্ম হয়ে যান। কবিতার পরতে পরতে নিজের আত্মাকে খুঁজে পান।
সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমি শুনি অলৌকিক পৃথিবীর ভাষা/বুকের বেদনাসহ জেগে ওঠে শ্মশানের যাবতীয় লাশ/তারা এ হাত ধরে আমাকে শোনায় সেই মৃত ইতিহাস/তারা বলে বাড়িঘর জমাজমি শত্রুমিত্র রাজা আর প্রজা/তারা বলে ফের শান্তি শৌর্য বীর্য পাবো আমি প্রাণের ঠিকানা/তারা বলে ‘ইচ্ছে হয় ফিরে আসি প্রিয়তম পৃথিবীর দিকে/যে মাটি বেসেছে ভালো সবুজাভ ঘাসফুল সূর্য়ের সভায়/ইচ্ছে করে মাটি খুঁড়ে উঠে আসি আমাদের হৃত ঠিকানায়’।
এ কবিতাটি পড়ার পর তার কবিতা নিয়ে আমাদের অহংকার করতে ইচ্ছে করে। আমাদের ভাষার এই কবির কবিতাকে আমরা ভালোবাসতে ভালোবাসি। অথচ তার কবিতা নিয়ে বাংলা কবিতার প্রাঙ্গণে তেমন আলোচনা আমাদের চোখে পড়ে না। হাজার হাজার পত্রিকার ভিড়েও মোহাম্মদ সাদিকের কবিতা প্রায় বিরল। নিভৃতচারি এ কবিকে নিয়ে জেগে উঠবে যে ভাবীকাল, আমরা আপতত সেই ভাবীকালের প্রতীক্ষায় রয়েছি।
‘ইচ্ছে হয় ফিরে আসি প্রিয়তম পৃথিবীর দিকে
যে মাটি বেসেছে ভালো সবুজাভ ঘাসফুল সূর্য়ের সভায়
ইচ্ছে করে মাটি খুঁড়ে উঠে আসি আমাদের হৃত ঠিকানায়’।
মোহাম্মদ সাদিকের কবিতায় মৃতরা মাটি খুঁড়ে যেমন আবারও ফিরে আসতে চায় এ পৃথিবীর মায়ার ভিতর, তেমনি আমরাও বারবার ফিরে যেতে চাই তার কবিতার কাছে/কবিতার মায়ার ভিতর।

  • [১]