সাইদুর রহমান আসাদ
দুপুরে খবর পেলাম তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন স্থায়ী কান্দা উপচে বর্ধিত গুরমা হাওরে পানি ঢুকছে। সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে রওয়ানা হলাম আমি, এনটিভির স্টাফ রিপোর্টার দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী ও জাগো নিউজের প্রতিনিধি লিপসন আহমেদ। সঙ্গে ছিলেন সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. জাকির হোসেন।
টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে খবর আসলো ২৭ নম্বর পিআইসির করা বাঁধ ভেঙে বর্ধিত গুরমা হাওরে পানি প্রবেশ করছে। সরাসরি চলে গেলাম ২৭ নম্বর পিআইসি বাঁধ সংলগ্ন এলাকায়। দূর থেকে দেখলাম বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করার দৃশ্য।
বেশ লম্বা বাঁধের একপাশে বোট লাগিয়ে দেঁৗড়ে গেলাম ভাঙা অংশে। বাঁধ ভেঙে উত্তর থেকে দক্ষিণে পানি প্রবেশের প্রচণ্ড শব্দ কানে আসতে লাগল। চোখের সামনে দেখলাম এক ভয়াবহ দৃশ্য। আমরা ক’জন এরকম দৃশ্যের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
সেই ভয়াবহ দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম আমরা ক’জন। চোখের সামনে ২০— ২৫ বছরের পুরোনো হাওরের ভারসাম্য রক্ষাকারী করচ গাছ উপড়ে করে পানিতে পড়ে মুহূর্তেই হারিয়ে যাচ্ছে। এসব গাছের শিকড় মাটির বেশ গভীরে পোঁতা থাকে। গাছগুলো বাঁধ রক্ষার কাজও করে। কিন্তু যেভাবে গাছগুলো শিকড় সমেত উপড়ে পড়ছিল তাতে ঢলের বেগ সম্পর্কে সামান্য আন্তাজ করা যায়। যেন আড়ালে থেকে অতিকায় কোনো দানব ঠুনকো দিয়ে গাছগুলো পানিতে ফেলে দিচ্ছিল।
প্রায় ৩০ মিনিট আমরা ক’জন দাড়িয়ে রইলাম। এই সব চিত্র ধারণের ফাঁকে তাকালাম জেলার স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেনের দিকে। তাঁর চোখ ছলছল করছে। কয়েকদিন এই কর্মকর্তা বাঁধ মেরামতের কাজে দিনরাত ছিলেন। তাঁর চোখের সামনে মুহূর্তেই দুমড়ে—মুচড়ে যাবে বাঁধ, এরকম ভাবেন নি। বললেন, আসাদ, দিনরাত থেকেছি বাঁধ মেরামতের কাজে। নৌকার মাঝে অস্থায়ী অফিস করেছি। আমরা প্রকৃতির কাছে কত অসহায়!
পেছন দিক থেকে খবর আসলো বাঁধের উল্টো দিকে ভেঙে যাচ্ছে। আমরা এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি দ্রুত সেখান থেকে চলে না গেলে সমূহ বিপদ। পানির তোড় আমাদের ভাসিয়ে নিবে। মনে হলো চোখের সামনে হারিয়ে যাওয়া বড় বড় গাছগুলোর কথা!
আমরা জায়গা পরিবর্তন করতে দেঁৗড়াতে শুরু করলাম। বোটের কাছে এসে স্বস্তি বোধ করলাম। রওয়ানা হলাম ২৩ নম্বর পিআইসির করা বাঁধের দিকে।
মনে থাকবে পানির অসম্ভব শক্তির কাছে অসহায় প্রাণ—প্রকৃতির কথা আর তখন একটু আগে দেখা বড় বড় গাছের অসহায় আত্মসমর্পনের দৃশ্য চোখে ভাসছিলো।