- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

রড না দিয়েই প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণ/ নির্মাণাধীন ৫টি ঘর ভাঙলো প্রশাসন

আশিক মিয়া ও সোহানুর রহমান
ঘরের ভীমের মাথায় চার টুকরা রড বাইরের দিকে ঠিকই বের করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভেতরে রডের ছিটেফুটোও নেই। এমন দুঃসাহসিক এবং অমানবিক অনিয়ম হয়েছে দোয়ারাবাজারে উপহারের ঘর নির্মাণে। শুক্রবার রাতে অনিয়মের মাধ্যমে এভাবে ঘর নির্মাণ হচ্ছে খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে পাঁচটি ঘর ভেঙে ফেলেন। এসময় আরও ছয় ঘরের কাজ বন্ধ রাখার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়। শনিবার ভোর রাত পর্যন্ত অনিয়ম করে নির্মাণাধীন ঘরগুলো ভাঙা হয়।
সকালে খবর পেয়ে জেলা প্রশাসকও সেখানে যান, তিনিও সেগুলো ডিজাইন মোতাবেক নির্মাণ করার নির্দেশ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয়রা জানান, দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের আজমপুর এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ৩৭ টি গৃহ নির্মাণ কাজ এপ্রিল মাসে শুরু হয়। ঘরের কাজ করাচ্ছিলেন উপজেলা সদরের রায়নগরের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য তাজির উদ্দিন। কাজের শুরুতেই নির্মাণ ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছিল। ১৬ জুনের বন্যার আগে কিছু ঘরের কাজ হয়। বন্যার সময় কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। এরপর আবার কাজ শুরু হলেও বেশিরভাগ দিনেই কাজ হচ্ছিল রাতে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। শুক্রবার রাতেও ওখানে কাজ হচ্ছিল। স্থানীয় লোকজনের পক্ষ থেকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে জানানো হয়, উপহারের ঘরের কাজ হচ্ছে, ঘরের ভীমে অভিনব কায়দায় বাইরে চার টুকরা রড ঢুকিয়ে ভেতরে কোন রড দেওয়া হচ্ছে না। সিমেন্ট কম দেওয়া হচ্ছে। ঢালাই করা হচ্ছে ইটসলিং না করেই কাদা মাটির উপর মসলা তৈরি করে।
স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বলেন, উপহারের গৃহ নির্মাণের শুরুতেই নিম্নমানের কাজের প্রতিবাদ করেছিলাম। এসময় আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিলেও এ ঘটনায় দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার উৎসাহিত হয়। পরে আরও বেশি অনিয়ম হতে থাকে। নিম্নমানের বালু, ইট এবং সিমেন্ট কম দিয়ে কাজ হয়। শুক্রবার রাতে রড ছাড়াই ভীম ঢালাই দেওয়া শুরু হলে স্থানীয়রা এসিল্যান্ডকে বিষয়টি জানায়। পরে দায়িত্বশীলরা এসে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে নির্মাণাধীন ঘরের ভীমের অংশ ভেঙে ফেলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নানও একই ধরণের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, নির্মিত ৩৭ টি ঘরেই একই ধরণের অনিয়ম হয়েছে।


রাতে ঘর ভাঙার কাজে নিয়োজিত নির্মাণ শ্রমিক আলামিন বললেন, কয়েকটি ঘর ভেঙে গ্রেট ভীমে কোন রড পান নি তারা। একটি ঘরে চারটির স্থলে একটি রড পেয়েছেন।
দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল খালেক বললেন, প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণে অনিয়ম হওয়ায় শুরুতেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা প্রতিবাদ করেন। তারা উপজেলা প্রশাসনকে ঠিকাদার তাজির উদ্দিনের অনিয়মের কথা জানান। ওইসময় প্রতিবাদকারীদের উল্টো হেনস্তা করায় অনিয়ম বেশি হতে থাকে। শুক্রবার রাতে দেখা গেল রড ছাড়াই হচ্ছে ঢালাই। উপহারের ঘর নির্মাণে এধরণের অনিয়ম সহ্য করা যায় না।
গৃহ নির্মাণ কাজের ঠিকাদার তাজির উদ্দিন বললেন, আমি কাজের ঠিকাদার নই। গৃহ নিমার্ণের জন্য কমিটি আছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সেক্রেটারী। আমি মালামাল সরবরাহ করি। আমাকে এসিল্যান্ড সাহেব বিকালে (শনিবার বিকালে) দেখা করতে বলেছেন, আমি যাব। দেখি তিনি কি বলেন।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সল আহমদ বললেন, অভিযোগ পেয়ে ওখানে গিয়ে খুবই খারাপ লেগেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে এভাবে অভিনব কায়দায় অনিয়ম কোনভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। ভীম না ভাঙলে বুঝাই যেত না, ভেতরে রড নেই। বাইরে থেকে বুঝার উপায় নেই ভেতরে রড দেওয়া হয় নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা প্রিয়াংকা বললেন, অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে রাতেই ওখানে এসিল্যান্ড প্রথমে যান। অভিযোগের সত্যতা পান। পরে পুলিশসহ ওখানে গিয়ে নির্মাণাধীন ঘরের ভীমের অংশ শ্রমিক লাগিয়ে ভেঙে দেই। জেলা প্রশাসক মহোদয় শনিবার ঘটনাস্থলে এসে পাঁচ দিনের মধ্যে ঠিকাদারকে নিজ খরচে কাজ করে দেবার নির্দেশ দেন এবং অন্য ঘরগুলোয়ও এভাবে কাজ হয়েছে কি-না যাচাই করে দেখার নির্দেশ দেন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানালেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণ ডিজাইন মোতাবেক না হওয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসিল্যা- রাতে নির্মাণস্থলে গিয়ে ঘরের কিছু অংশ ভেঙেছেন। ওই অংশ পাঁচ দিনের মধ্যে নির্মাণ ঠিকাদারের খরচে ডিজাইন মোতাবেক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • [১]