- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব-১১
যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ নির্মম হয়। মনের অজান্তেই মায়া মমতার ঘাটতি ঘটে। আমাদের নিরেট বোকামীর জন্য পাক সেনাদের খপ্পরে পড়েছি। শত্রুদের তুচ্ছার্থে গণ্য করেই বিপদটা ডেকে এনেছি। এখন বুঝতে শিখেছি, শত্রুকে দুর্বল ভাবা ঠিক নয়। নদীতে পড়ে তো আমাদের কেউ বাঁচার কথায় ছিল না। রাজাকারের খুঁজে আমরা কতটুকুু রাস্তা অতিক্রম করেছি ? সে খেয়াল আমাদের ছিল না। একজন সাথীকে হারালাম, সঙ্গে পাঁচটি রাইফেল। মেজর ডি স্যুজাকে কী জবাব দিব ? কূল কিনারা পাচ্ছিলাম না। তাই আমরা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম। দেলোয়ার হোসেন এর নিখোঁজের সংবাদটি মেজরকে দেওয়া যাবে না। এককথায় দেলোয়ার আমাদের সাথেই ছিল না। রাইফেল হারানোর কথাও গোপন থাকবে। বালাট গিয়ে চুপচাপ অস্ত্রাগার থেকে পাচঁটি রাইফেল তুলে নিব। সন্ধ্যায় যে সময় সবার হাজিরা নেওয়া হয়, আমরা সেই সময় পিছন দিক দিয়ে ওঠব। আর এই সময়ই চুরি করার সময়। রাইফেল চুরি শেষে আবার নিচে চলে আসব। সবার হাজিরা শেষে সবার সামনে দিয়ে ব্যারাকে গিয়ে ঢুকব। আর বলব আজ সামনা সামনি তুমুল যুদ্ধ হয়েছে, ওদের অনেক হতাহত হয়েছে। আমরা শুধু ভাগ্যের জোড়ে ফিরে এসেছি। যেই কথা সেই কাজ, উপরোক্ত কর্মগুলি সম্পাদন করে বীর বীক্রমে সবার সামনে দিয়ে ব্যারাকে গিয়ে ঢুকলাম। গোলাগুলির আওয়াজ সবাই শোনেছে, তাই আমাদের বাহ্ বাহ্ দিতে লাগল। আর বীরত্ব কতটুকু করেছি তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে হাইকমান্ডদের দায় দায়িত্ব নিয়ম কানুন শৃঙ্খলা কতটুকু ভঙ্গুর ছিল তা শহীদ বীর দেলোয়ার হোসেনের শহীদ হওয়াতেই টের পাওয়া যায়। আমরা বিবেকহীনরা বাদেও আটচল্লিশ বছরে দেলোয়ার হোসেনের নামটি কেউ মুখে আনল না। একজন মুক্তিযোদ্ধা নিখোঁজ, তার হাজিরা খাতাও কেউ দেখল না। কয়েক দিন আগে টেকেরঘাটে দেখে আসলাম, একটি কবরের দেয়ালে লেখা শহীদ বীর সিরাজ মিয়া, তারই পাশের কবরটির দেয়ালে লেখা অজানা মুক্তিযোদ্ধাদের কবর। বীব বিক্রমে যোদ্ধ করে যারা দেশমাতৃকার টানে শহীদ হয়েছেন, তাদরে নামও কেউ জানার চেষ্টা করল না। বিবেকহীন কি শুধু আমরা কজনই ? একবার সুনামনি দাস ও আব্দুল মন্নানকে রেকি করার জন্য কাঠালবাড়ি, বৈশেরপাড়, বাগমার এলাকায় ছদ্মবেশে পাঠানো হয়। দুজনেই ছদ্মবেশ ধারণে পারদর্শী। কখনও সাহেব, কখনও ভিখারী, এমনকি পাগলের ভূমিকায় অভিনয়েও তারা পটু। মাতালের ভূমিকায় তো একেবারেই অসাধারণ। ঐ বিবেচনায় হানাদারদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় খবরাখবর তথ্য সংগ্রহ করতে ঐ দুই জনকে সিলেক্ট করেন। একদিন পর সুনামণি দাস ফিরে আসে, মন্নানের আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। সুনামনি গিয়েছিল গোদিরগাঁও, কান্দাগাঁও ও কাঠালবাড়ির দিকে। আর মন্নান গিয়েছে বেরিরগাঁও বাঘমারা হয়ে একবারে হালুয়ার ঘাট। সুনামনির ভাষ্যমতে হালুয়ারঘাট সুরমা নদীর পাড়ে দুই জনে একত্রিত হয়। হালুয়াঘাট বাজারে দু একটা দোকান থাকলেও ওখানে পাক সেনা ও রাজাকারদের আনাগোনা বেশি। তাই পেটের ক্ষুধায় একটা কিছু খাওয়ার জন্য বাজার থেকে একটু দুরে একটি আলগা বাড়িতে গিয়ে ওঠে। খাওয়ারও একটা বন্দোবস্ত হয়ে যায়। বাড়িতে এক বৃদ্ধ ছাড়া পুরুষ মানুষ কেউ ছিল না। তারা বৃদ্ধের কাছে নিজেদেরকে পাক সেনাদের গোয়েন্দা পরিচয় দিয়েছে। এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরকে হিন্দুস্থানের এজেন্ট বলে দোষারোপ করে করে বৃদ্ধের সাথে বেশ খাতির জমিয়েছে। কিন্তু খাওয়া আর হয়ে ওঠলো না। কথাচ্ছলে বৃদ্ধ বলেছে, দুপুরে নাকি পাঁচ ছয় জন পাক সেনা তাদের বাড়িতে গরুর গোস্ত ও ময়দার রুটি খাবে। বৃদ্ধের ছোট ছেলে তাদেরকে আনতে গিয়েছে। রান্নাও প্রায় শেষ। পাক সেনাদের কথা শুনে ওদের দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই বুঝি হায়েনারা চলে আসলো। ওরা বৃদ্ধকে বলল চাচাজি আমাদের আর খাওয়া হবে না। যারা খেতে আসতেছে তারা আমাদেরকে দেখলেই রেগে ফায়ার হয়ে যাবে। আর বলবে তোরা কাজ ফেলে এখানে এসেছিস। তোদের জন্য তো বাগমারা ডিফেন্সেই খাবার আছে। এখানে কাজ ফাঁকি দেওয়ার ফন্দি। সুতরাং মান থাকতে রাস্তা মাপাই ভালো। এই বলে বৃদ্ধের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পালালো। কতক্ষণ হেঁটে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখলো খাকি উর্দ্দি পড়া কয়েক জন পাক সেনা ঐ বাড়িতে গিয়ে ওঠছে। এই যাত্রায় ওরা রক্ষা পেলেও আব্দুল মন্নানের আর শেষ রক্ষা হলো না। রাজাকরদের অভয়ারণ্য এলাকায় রাজাকারদের সন্দেহের বাইরে থাকতে সুনামণি ও মন্নান মাথায় টুপিও লাগিয়ে ছিল। কারণ রাজাকাররা ধর্ম রক্ষায় পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে বলে সব সময় মাথায় টুপি লাগিয়ে থাকতো। ঐ বাড়ি থেকেই ওরা দুজন আলাদা হয়ে যায়। তাই সুনামনি ফিরে আসলেও আব্দুল মন্নানকে পাক সেনারা ধরে নিয়ে যায়। (চলবে)

  • [১]