হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ১২
বালাট থেকে সময় পেলেই শরণার্থী শিবিরে ঘোরতে যওয়াটা হঠাৎই থেমে গেল। আমরা ক’জনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল বেরিগাও ডিফেন্সে। সিলেট জেলার মধ্যে একমাত্র বেরিগাও বৈশেরপাড় কাঠাল বাড়ি এলাকায়েই সব থেকে বেশী বোম্বিং করছে পাক সেনারা। বোমার আগুনের তাপে কিছু জায়গায় মাটি একবারে তামার রঙে পরিণত হয়েছে। এই রণাঙ্গনের খবরাখবর রেডিও থেকে বার বার ফলাও করে প্রচার করছে। আমাদেরকে সি কোম্পানির অধীনে থেকে যুদ্ধ করতে পাঠনো হয়েছে। কোম্পানির কমান্ডর এনামুল হক চৌধুরী। স্থানীয় জনগণ দ্বারা রাতারাতি তিনটি ব্যাঙ্কার তৈরি করানো হয়ে। ব্যাংকারগুলো পাক সেনাদের ব্যাংকার থেকে বড়জোড় একশত গজ দূরত্বে। আমাদের ব্যাঙ্কারটি একেবারে শত্রুদের সামনে দুতলা সিস্টেমে করা হয়েছে। থাকতাম নিচ তলায়, গুলি করতাম উপরের তলায় গিয়ে। আমরা ক’জনের মতো সব গুণধরকেই এই তিনটি ব্যাঙ্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোম্পানির হেডকোয়ার্টার ছিলো নারায়নতলা মিশনে। কয়েক দিন পর আমার আহত দুই ভাগনে রাজেন্দ্র ও দোলচাঁদকে সুস্থ হওয়র পর আমাদের এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দোলচাঁদ ডুগডুগি বাজিয়ে ভালো গান করতো। সে আসায় গানের আসরটা একবরে জমে ওঠেছে। ব্যাঙ্কারে সরবাহ করা খাবারের মান ছিল অত্যন্ত নি¤œমানের। পোকা ধরা চালের ভাত, খাওয়ার মতো নয়। চোখ বুঝে খেয়ে ফেলতাম। এমনও দিন গেছে গোলাগুলির তীব্রতায় দিনের বেলায় খাবার পৌঁছাতে পারেনি। গোলাগুলি রাতেও থাকতো, দেখা যায়নি বলে ভয় কম। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে অধিক কষ্ট স্বীকার করেছেন স্থানীয় মুক্তিকামী জনগণ। খোলা ময়দানে গোলাগুলির মাঝেও কলাগাছ সংগ্রহ করে এসে ব্যাঙ্কার তৈরি করতে গিয়ে অনেকেই হতাহত হয়েছেন। স্থানীয়রা আমাদের কাছে খাবার পৌঁছানো, ব্যাংকার তৈরি এমনকি আমাদের হতাহতদের বালাট হাসপাতালে পৌঁছে দিতেন। শত্রু এলাকার খবরাখবরও উনাদের কাছ থেকে জানতাম। এসব কাজ যারা করেছেন তারাও মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারতেন। কিন্তু আমাদের সাথে যে মায়ার বন্ধন রচনা হয়ে গেছে, ছিন্ন করে আর যেতে পারেননি। নারায়ণতলা, মঙ্গলকাটা, গোদিরগাও, কান্দাগাঁও, গুচ্ছগাঁও এলাকায় গিয়ে মুখরুচক খাবার খেয়েছি। মা বোনেরা কাছে বসিয়ে হাতপাখা নেড়ে আমাদের খাইয়ে দিয়েছেন। এই মাতৃতুল্য নারীদেরকে আজীবন প্রণিপাত জানাব। উত্তর সুনামগঞ্জে মহামহিয়ান মানুষদের কথা মনে পরলেই আজও শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়। সেই মুক্তিকামী মানুষদেরকে ঈশ^র সদাসর্বদা মঙ্গল করুন এই কামনা করি। দেশে রাজাকারের তুলনায় ভালো মানুষের সংখ্যা বেশি ছিল বলেই এতো তাড়াতাড়ি দেশটা স্বাধীন হয়। আমি মাঝে মধ্যে নারায়ণতলা শহীদ মিনারটি দেখতে যাই, নেমপ্লেটে সাথী বন্ধুদের নাম দেখে মনটা একটু ভারি হলেও তবু হালকা লাগে। কিন্তু এর পাশাপাশি স্বাধীনতা যুদ্ধে স্থানীয় জনসাধারণ আমাদের সাহয্য করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছে বা আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন সেই দুঃসাহসী বীরদের নামও যদি ফলকে লেখা থাকতো তাহলে ঐ এলাকায় যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল মুক্তিযোদ্ধারাই খুশি থাকতেন। আশা করি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিষয়টি বিবেচনায় এনে ঐ সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতা করতে গিয়ে যারা হতাহত হয়েছেন, তাদেরকেও সহযোদ্ধা বা ছায়াযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। সি কোম্পানীর প্লাটুন কমান্ডার মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার ও আমরা ক’জন কয়েক দিন যখন বালাটে ছিলাম, তখনকার একটি মর্মান্তিক ঘটনা লিখতে ভুলে গিয়াছিলাম। জব্বার ভাই পনের ষোল জনকে নিয়ে গেরিলা যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বালাটের লালপানি বাজার হয়ে ঢলুরা অতিক্রম হওয়ার পর প্রায় দুই মাইল অগ্রসর হতেই পাক সেনাদের ওৎ পাতা ফাঁদে আটকা পরেন। শত্রুরা চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। ওনারা হতাশ না হয়ে প্রচুর সাহস ও অদম্য মনোবলে শত্রুদের উপর গুলি ছুঁড়তে থাকেন। এতে আমাদের পাঁচজন আহত হয়, একজন মাথায় গুলি খেয়ে শহীদ হন। এরপরও গুলি চালিয়ে রেখে আমাদের নিয়ে আসতে সক্ষম হন। আহতদের আনতে জীবনের ঝুঁকি যে কত মারত্মক ছিল ভোক্তভোগীরাই টের পেয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য শহীদ হওয়া বীর যোদ্ধা অনিল দাসের লাশটি আর নিয়ে আসতে পারেন নি। তবে ঐদিন শত্রু পক্ষেরও অনেক হতাহত হয়েছে। সুনামগঞ্জ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর ৭ ডিসেম্বর রাতে শহরের মধুমিতা হোটেলে জব্বার ভাই রাত্রি যাপন করেন। তার সাথে আরেকটি ছেলে ছিল ওর নামটা মনে করতে পারছি না। ভোরে হোটেলের রুমে দুজনেরই মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। জব্বার ভাইয়ের স্টেনগানের ব্রাশফ্যায়ারেই ওদের মৃত্যু হয়েছে। কি কারণে এমন দুর্ঘটনার উদ্ভব হয়েছে তা জানার পরিবেশও পরিস্থিতি তখনকার সময়ে একবারেই ছিল না। ওদের মৃত্যু রণাঙ্গনেই শত্রুর দ্বারা হতে পারতো, যুদ্ধক্ষেত্রে বহু দুঃসাহসিকতার সাথে পাক সেনাদের মোকাবেলা করেছেন কিন্তু মৃত্যু তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আজ নিজ অস্ত্রের কাছে পরাভূত। আসলে মৃত্যু নামক আপেক্ষিক বস্তুটা ঈশ^রের হাতেই ন্যস্ত। (চলবে)