- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব-১৬
বিজয় উল্লাসের অনেক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থাকতে পারে। যুদ্ধ জয় হয়তো সকল জয়ের উর্ধ্বে স্থান পায়। আর যুবতী নারী উদ্ধারে বিজয় উপাখ্যান আলাদা ভাবে সংজ্ঞায়িত না করলে বিজয়ের পূর্ণতা পায় না। ছয়টি মেয়েকে কুলাংগারদের হাত থেকে উদ্ধার করে আমাদের মনে যতটুকু প্রশান্তি পেয়েছি মহাবীর আলেকজান্ডারও বিশ^ জয় করে এমন আনন্দ পেয়েছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। আমরা ছয়টি মেয়েকে নিয়ে পায়ে হেঁটে পেক কাঁদার উপর দিয়ে চিনাকান্দি পৌঁছতে অন্তত সাড়ে চার ঘন্টা সময় লেগেছে। এরপরও আমাদের শরীরে কোন ক্লান্তি অবসাদ দেখা দেয়নি। তবে মনে হয়েছে পুরুষের পৌরুষত্ব নারীরাই যদি না জানে সে পৌরুষ অর্থহীন। যাদেরকে উদ্ধারে আমাদের এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা তারাও আজ জয়ের অংশীদার হয়ে আমাদের সাথে হাঁটছে। তাই তো দেহে ক্লান্তিরও বালাই নেই। সন্ধার আগ মুহূর্তে চিনাকান্দি হরিদাসের বাড়িতে গিয়ে ওঠি। ওখানেই ওদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করি। এর আগে চা মুড়ি খাওয়ার সময় ওদের সাথে আলাপ করে জানা যায় ওদের দুই জনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ শহরে, গুরুদয়াল কলেজের ছাত্রী। দুই জনের বাড়ি শরারচর গ্রামে, ময়মনসিংহ কলেজে পড়ে। একজন মদন থানার দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েটি শাল্লা থানার সুখলাইন গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম আর লিখলাম না। তিনি স্বর্গবাসী হয়ে গেছেন অনেক আগেই। ওরা সপরিবারে নিজের বস্তি নৌকায় ভারত যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমই রাত্রি যাপন করে জামালগঞ্জের নয় মৌজার বিনাজোড়া গ্রামে। পরের দিন মাতারগাও দুুইদিন অবস্থান করে রাস্তাঘাটের খবরাখবর জেনে মাতারগাও থেকে মাইল দুয়েক অগ্রসর হলেই রাজাকারের হাতে ধরা পরে। যাক ওদেরকে খাওয়া দাওয়া করায়ে ওখানে রেখেই বালাট চলে যাই। গোলাম রব্বানী সাহেবকে সাথে নিয়ে মীর শওকত সাহেবকে বিস্তারিত খোলে বলার পর তিনি মেয়েগুলিকে আপাতত মইলাম শরণার্থী শিবিরে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে নির্দেশ দেন। পরের দিন তিনি নিজে গিয়েই দেখে আসবেন বলে আমাদের বলে দেন। পরদিন সকালে রব্বানী সাহেবের সাথে মইলাম মুক্তিযোদ্ধা অফিসে গিয়ে তাবু, রেশন, বিছানাপত্র, বাসনপত্র এবং লাকড়ি সহ সাত নম্বর ক্যাম্পের কাঠালবাড়িতে তাবু টাঙ্গিয়ে ওদের থাকার ব্যবস্থা করি। দুপুর বেলায় হরিদাসের বাড়ি থেকে ওদেরকে নিয়ে আসি। ওরা রান্না বান্না করে, এক সাথে খাওয়া দাওয়া করি। ওদেরকে বিনীত ভাবে বলিÑ দেশ স্বাধীন হলে আমরা তাদেরকে তাদের নিজ বাড়িতে দিয়ে আসব। এর মধ্যে প্রতিটা শরণার্থী শিবিরে ওদের মা বাবা আত্মীয় স্বজনদের খুঁজে বের করব। অতীত কাহিনী মুছে দিয়ে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করতে অনুরোধ করি। ওদের মৌন সম্মতি পাওয়া যায়। আমরা আবার পরদিন আসব বলে কথা দিয়ে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বালাট চলে আসি। মইলাম মুক্তিযোদ্ধা অফিস থেকেও কয়েক জন ওদের দেখে আসে। মাঝে একদিন বাদ দিয়ে আমরা কয়েক জন বিকেল বেলায় ওদেরকে দেখতে যাই। তাবুর কাছে গিয়ে দেখি তাজ্জব ব্যাপার। তাবু খালি, ওরা কেউই নেই। পাশের বাসার কয়েক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এক মহিলা জানান, গত কাল সন্ধ্যায় উনার মেঝ মেয়েকে তারা নাকি বলেছে, নারে বোন এখানে আর থাকা যাবে না। আরেক মহিলা বললেন, কাল সকালে তারা সবাই এক সঙ্গে বালাট নদীতে ¯œান করতে গিয়েছিল। ¯œান সেরে তাবুতে আসার পথে ওদের একজনের আপন ভাইয়ের সঙ্গে সামনা সামনি সাক্ষাত হয়। ভাইটি না চেনার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তাবুতে ফিরে আসার ঘন্টাখানেক পর থেকেই দফায় দফায় মেয়েটির আত্মীয় ও পরিচিত যুবতী আর মহিলারা এসে তাবুর সামনে দাঁড়িয়ে ওদের কিছু না বলে নিজেদের মধ্যে কানাঘোষা ও উঁকিঝুকি মেরে চলে যায়। হয়তো মেয়েটির স্বজনরা ভেবেছে যে, মেয়েটি এতো দিন রাজাকার দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছে তার সাথে প্রকাশ্যে কথা বললেই জাতমান দুটোই হারোনোর সম্ভাবনা। মেয়েগুলি এসব দৃশ্যে অতিষ্ট হয়ে তাবুর পর্দা ফেলে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। মেয়েগুলো নাকি পাশের বাসার মেয়েদেরকে বলেছিল শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা গোপন সূত্রের ভিত্তিতে অনেক খুঁজাখুজি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নরপশুদের হাত থেকে ওদেরকে উদ্ধার করেছেন। কিন্তু তাদের মা বাবা ভাই বোনরা কোন খুঁজ নিল না। অথচ তারা জানে রাজাকাররা তাদেরকে কোথা থেকে ধরে নিয়েছে। সমাজের ঠুনকো মান সম্মান আঁকড়ে ধরে মেয়ে বোনকে চিরতরে ভুলে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে দিব্যি আছেন। তাই তারা সমাজ আচারকে ধিক্কার জানিয়ে নিরুদ্দেশে পারি জমায়। তাবুর ভিতরে এক কোণে আমাদের কিনে দেওয়া ছয়টা শাড়ি ভাজ করে রাখা। ভাজের মধ্যে পাথর চাপা দেওয়া একটি চিঠি, চিঠি খোলে দেখি আমরা হতাভাগাদের উদ্দেশ্যে লিখা। ছয় অসহায়া যুবতীর বুক ফাটা আর্তনাদ মিশ্রিত আবেগঘন কথা কয়েক লাইনে প্রকাশ। শ্রী চরণেষু, দেশ বরেণ্য বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, হতভাগিনীদের প্রণাম নিবেন। হিন্দু সমাজের কাছে আমরা অস্পৃশ্য অপয়া। আপনারা হতভাগীনিদের গ্রহণ করবেন কিনা তাও যাচাইয়ের মনের জোর নেই। আপনাদের পায়ের ধুলোর জোরে জনম জনমের পাপ পঙ্কিল জীবন আজ ধন্য। এ জীবনে আর দেখা হবে না। আমাদের মা বাবা ভাই বোনদের মতো আপনারাও দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যাবেন। মাথার দিব্যি রইল আমাদের আর খুঁজবেন না। প্রাণ ছোয়া শাড়ি গুলে রেখে গেলাম। পরজন্ম যদি থাকে ওগুলো পরে এসে সামনে দাঁড়াব। আপনারা দেশমাতৃকার টানে রণাঙ্গনে, আমাদেরও যুদ্ধে যেতে মন চায়। তবে এই কলঙ্কিত মুখ কাউকে দেখাতে মন সায় দেয় না। তাই অজানায় পারি জমালাম। ইতি ঈশ^র অভিশপ্তা হতভাগীগণ।

  • [১]