হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব -০৩
হরিদাসের বাড়িতে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে, মাইলাম শরণার্থী শিবিরে চলে যাই। শিবিরের সাত নম্বর ক্যাম্পে, শাল্লা থানার হরিনগর গ্রামের খোকা বাবুর ঘরে আত্মীয় সূত্রে গিয়ে ওঠি। কোন আলাপ আলোচনা না করেই নাস্তা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। বিকাল চারটার দিকে ঘুম ভাঙ্গে। রাজাকারে ধরে নেওয়া আমার তিন সঙ্গীও খোকা বাবুর আত্মীয়। আর আশেপাশের বাসার সবাই কোন না কোন ভাবে আপন জন। তাই মর্মান্তিক ঘটনায় সবাই ব্যথিত। আর শরণার্থী শিবিরে এদের আসতে বাধ্য করেছে রাজাকাররা। তাই মনের ক্ষোভে গালাগাল করা ছাড়া আর কিই বা করার আছে। আপন দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবার সময়ই তো চোখের জল ফেলতে ফেলতে চোখ শুকিয়ে গেছে। আমি ¯œানাহার শেষে শরণার্থী শিবিরে একটু ঘোরাফেরা করে যা দেখলাম তাতে গা শিউরে উঠে। এক বাসায় গোধুলী লগ্নে সাত পাকে বিবাহ হচ্ছে। সবাই আনন্দ হৈ-হুল্লুরে ব্যস্ত। চলছে বরযাত্রী আপ্যায়নের বন্দোবস্ত। আতশবাজীর ঝিলিক। কোন দিকেই আনন্দের আর কমতি নাই। ঠিক একই সময়ে পাশের বাসার এক টকবগে যুবক কলেরায় মারা গেছে। চলছে স্বজনদের মুত্যু শোকে বুক ফাটা আর্তনাদ। কান্নার রোলে আকাশ বাতাস স্তব্ধ হয়ে আসছে। মরদেহ শ্মশানে নিতে শ্মশান বন্ধুদের চলছে বাঁশ ডেঙ্গার প্রস্তুতি। এক মহিলা একটি পুরাতন হাড়ি ভেঙ্গে, মৃতকে শেষ বিদায় জানাতে উচ্চ কন্ঠে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। এই দিকে বিয়ের জয়ধ্বনি ও উলুধ্বনিতে বিবাহ বাসর মুখরিত। এবং সাত পাক সমাপ্তিতে সমস্বরে প্রেমধ্বনি। শ্মশান বন্ধুরা মরদেহ কাঁেধ নিয়ে হরিবল হরিবল বলে শ্মশানে যাত্রা। এ যেন গগণবিদারী আত্মযন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ, চোখে না দেখলে এমন স্পর্শকাতর দৃশ্য আত্মস্থ করা দুরূহ ব্যাপার। মরদেহ দাহ করার জন্য কোনো শ্মশান না থাকায় বালুতলে পুতে রেখে আসতে হয়েছে। পুতে আসার কিছূক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ী শিয়ালের দল গর্ত থেকে লাশ ওঠিয়ে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, দেখার কেউ নেই। দেখবেই বা কে, যারা লাশ সৎকার করতে গেল তাদেরই অন্যকোন একজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে ততক্ষণে। মৃত্যু পথযাত্রীকে অনেক বাসায় সুস্থ্য করারও কেউ নেই। বালুচরের ঘন বসতি, তীব্র তাপ, বিশুদ্ধ পানির চূড়ান্ত সংকট, নামমাত্র চিকিৎসার তামাশা। এক বাসার সামনে আরেক বাসার পেছন, এক বাসার সামনে বালুর গর্তে ছলার চাটাই বেস্টনি দিয়ে পায়খানা প্রশ্রাবের স্থান। এমন নোংরা পরিবেশে মানুষের মৃত্যুকে অনিচ্ছাকৃত ভাবে ডেকে এনেছে। শিবিরের উত্তর দিকে বালাট নদীতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল। ঝর্ণাবাহি নদীও ঘোলাটে হয়ে গেছে। আট ও নয় নম্বর শিবির ঘেঁষা পাহাড়ের কিনার দিয়ে প্রবাহিত একটি নালার মতো ছোট্ট ছড়া। পানিতে ভেসে যাচ্ছে মানুষের মল-মুত্র পচা গলা মৃত দেহ। এই ছড়াতেই হাত দিয়ে ময়লা ফাঁকা করে ¯œান পান চলছে। আর অকাতরে অকাল মৃত্যুতে ঢলে পড়ছে। আমার তিন সাথীর প্রাণ কেড়ে নিল হানাদারদের দুসর রাজাকাররা। শরণার্থী শিবিরে সর্বহারা মানুষের প্রাণ কাড়ছে দয়াময় ইশ^রের ইঙ্গিতবাহী দোসর যমরাজ। শরণার্থীরা মৃত্যু আতঙ্কে জন্মভূমি ছেড়েছেন, কিন্তু মৃত্যু পিছু ছাড়ছে না। এই দিকে আবার শিবির ছেড়ে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা। সব মিলিয়ে অসহায় মানুষেরা দেশ স্বাধীনের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। আমি পরের দিন আবার প্রতিটা শিবির ঘোরাফেরা করে আরো অনেক দুর্বিসহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করি এবং রাতেই খোকা বাবুকে না বলেই নদী সাঁতরিয়ে বালাট শনির বাজারে গিয়ে ওঠি। মুক্তিযুদ্ধে না যাওয়ার জন্য খোকা বাবু অনেক অনুরোধ করেছেন। উনার কথা মানতে বিবেকে সায় দেয়নি। রাতে একটি কাঠাল খেয়ে বাজারের চাঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ি। শেষ রাতে বাজারের পাহারাদার এসে চাঙ্গ থেকে ওঠিয়ে দেয়। ওদের রাজার অনুমতি ব্যতীত রাতে ওখানে থাকা যাবে না। এই বাড়তি উপদ্রবে খাসিয়া ও রাজাকারে খুব একটা তফাৎ মনে হয়নি। বাঙালি নামটাও তাদের কাছে ঘৃণার মনে হয়। এর পরে খাসিয়া গারোদের সাথে নিবিড় সখ্যতা গড়েই ওখানে আস্তানা গাঁড়লাম। এভাবে পনের দিন কাটানোর পর জগৎজ্যোতি দাস, বড় ভাই আলী আমজদ, জিয়া উদ্দিন, ইলিয়াস আলী, সিরাজ মিয়া, কাইয়ূম ভাই, যুবায়ের চৌধুরী, মোহন্ত রায়, দীপঙ্কর রায়, রাম কুমার দাস সহ আরো অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে বালাটে চলে আসে।