হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ০৪
জগৎজ্যোতি দাসের সাথে আমার প্রথম দেখা। সবাই উনাকে দাদা বলে ডাকে। আমি ওই ডাকই রপ্ত করলাম। এখানে খাসিয়াদের অনেক অসদাচরণ সহ্য করেছি। জগৎজ্যোতি দাস আমার আসার পর থেকেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। প্রথম দিনেই এক খাসিয়াকে খারাপ ব্যবহার করার জন্য জগৎজ্যোতি তাকে ধরে এক আছাড় মেরে তার বাপদশা ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। এর পর থেকে খাসিয়া গারোরা আমাদেরকে সমীহ করে চলে। তবে দুই তিন দিন বাদেই আমরা একশত চৌদ্দ জনকে চারটি ট্রাকে করে ট্রেনিং সেন্টার ইকো-ওয়ানের উদ্দ্যেশে পাঠানো হয়। বালাটে রিক্রুটিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন ফেনারবাঁকের মুজিবুর ভাই। আমরা পাহাড়ি রাস্তায় পনের বিশ কিলোমিটার অতিক্রম করার পরেই আমাদের ট্রাকটি রাস্তা থেকে অনুমান পঞ্চাশ হাত নীচে ছিটকে পড়ে যায়। একটি বড় গাছে না আটকালে পাতাল প্রবেশের সম্ভাবনা ছিল। আহত কয়েক জনের মধ্যে আমি একটু বেশি। শিলং থেকে ক্র্যান আনিয়ে আমাদেরকে উদ্ধার করা হয়। আহতদের শিলং হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমাকে চার দিন হাসপাতালে রেখে ট্রেনিং সেন্টারে পাঠিয়ে দেন। ভাগ্যের কারসাজি লোকোচুরি প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার নিগুঢ় মাহাত্ম্য সেই সময়ে বুঝার জ্ঞান বুদ্ধি ছিল না বলে আজকের দিনে ভেবে অবাক হই। এপর্যন্ত কয়েক বার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছি। কিন্তু আসল মৃত্যুর সন্ধান মেলেনি। বিপদ যুক্ত জীবনই হচ্ছে মৃত্যু। আমি পঞ্চম ব্যাচে ট্রেনিং করি। হিন্দি ইংরেজি অনর্গল বলতে পারতেন বলে, ব্যাচ কমান্ডার ছিলেন জগৎজ্যোতি দাস। চেড়াপুঞ্জির চব্বিশ ঘন্টা বৃষ্টিপাতের মধ্যেই, আট ঘন্টা ট্রেনিং করতে হয়েছে। সন্ধায় আবার পাহাড়ী জংগলে দুই ঘন্টা গেরিলা যুদ্ধের এ্যাম্বুস করানো হতো। ছোট চিনা জোঁক রাতের বেলায় শরীরে খুঁেজ পেতাম না। সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখতাম রক্ত খেয়ে টিমটিমে হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। যে পরিমাণ খাবার দিতো তাতে পেটের ক্ষুধা লেগেই থাকতো। আমরা কয়েক জন একাধিক বার প্লেট হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে বাড়তি খাবার নিতাম। এতে তাদের হিসাবের খাবার শর্ট পড়ে যেত। বেসামাল দেখে খাবার নিতে টিকেট সিস্টেম চালু করে। আমরা বাড়তি টিকেটও সংগ্রহ করে ফেলতাম। সকালে লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় পরোটা বন্টন করা হতো, তাতেও কাজ হয়নি। দারোচিনির বাগান থাকায় ওই গাছের ডাল দিয়ে দাঁত মাজতাম। পেটের ক্ষুধায় বাগান থেকে চুরি করে আনারস এনে কাটারি ছাড়াই কামড়িয়ে খেয়ে মুখে ঘা হয়ে গেছে। একদিন প্রচন্ড ঠান্ডায় মোহন্ত রায় বলল, সে আজ ট্রেনিংয়ে যেতে পারবে না। আমরা যেন ব্যাচ কমান্ডারকে তার অসুস্থতার কথা বলি। আমরা বললাম ব্যাচ কমান্ডার কোন ওজর আপত্তি শোনেন না। তুই তো উনাকে ভালো করেই চিনিস। তাবু থেকে ধরে নিয়ে তোকে ট্রেনিংয়ে পাঠাবেন। যার নাম জগৎজ্যোতি দাস। শেষান্তে মোহন্ত রায় এক অভিনব ফন্দী বের করল। আর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা আমাদের বুদ্ধির সাথে খাপেখাপ মিলে গেল। সকালে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার লাইনে দাঁড়ানোর সময় মোহন্তকে মাঝে রেখে তার
দুই পাশে দুই জন করে দাঁড়ালাম। পরোটা বিলি করার পরই মোহন্ত মুখে দিয়েই ঠান্ডায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছে। আমরা চারজনে তাকে পাঁজাকোলা করে ধরি। ব্যাচ কমান্ডার জিজ্ঞাসা করলেন ওর কি হয়েছে ? আমরা বললাম ঠান্ডায় অজ্ঞান হয়ে গেছে। তিনি তাকে তাবুতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন এবং তাকে গরম ছেক দিতে বললেন। আমাদের আর ট্রেনিংয়ে যেতে হবে না। প্রয়োজনে হাসপাতালে যেন নিয়ে যাই। চার জনে মহা খুশিতে মোহন্তকে কাঁধে নিয়ে তাবুর দিকে যাওয়ার পথে হাসপাতাল কম্পাউন্ডারের সাথে দেখা। উনি বললেন কি হয়েছে ? বললাম ঠান্ডায় অজ্ঞান হয়ে গেছে। উনি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার নিদের্শ দিলেন। আমাদের কোন আপত্তি কর্ণপাত করলেন না। পাহাড়ের উঁচু নিচু পথ বেয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার মোহন্তকে কাঁধে করে হাসপাতলে পৌছতে আমাদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। রোগীর সিটে শোয়ানোর পর ডাক্তার বড় একটি সুঁই এনে অর্ধেক সুঁইটা মোহন্তর উড়োতে ঢুকিয়ে দেন। মোহন্ত মাই গো বলে চিৎকার দিয়ে এক দৌঁড়ে বেতগড়া ভেঙ্গে তাবুতে এসে সত্যিকারেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। বেতের কাটায় ছিড়ে তার মুখমন্ডল শরীর এসিড আক্রান্তের মতো হয়ে গেছে। হাসপাতাল স্টাফ এসে সাথে সাথে তাকে শিলং হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সুস্থ হতে বেশ কয়েক দিন লেগেছিল। কষ্ট পেলেও মোহন্ত ট্রেনিং থেকে রেহাই পেয়েছে। আমরা চার দুর্ভাগাকে জোড় করে ট্রেনিংয়ে পাঠিয়ে দিল। আর দীর্ঘশ^াস ফেলে বলল, শালা বাঙাল ভঙ ধরেছে। মানুষ হাসি বস্তুটি প্রায় ভুলেই গেছে। অনেক বছর পরে হলেও মোহন্তর অজ্ঞান হওয়ার নাটকটির কথা মনে হলেই পুরনো মনেও হাসি পায়।