- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ০৬
বালাটে আমরা বরো জনে পাকা পোক্ত একটি ট্রিম গঠন করে ফেলছিলাম। যে কোন অপারেশনে এক সাথেই যেতাম। আমাদেরকে সরসরি নিয়ন্ত্রন করতেন সেক্টর কমান্ডার মীর শৌকত আলী সাহেব। আর সার্বিক সহযোগীতায় মেজর মোতালিব ও গোলাম রব্বানী সাহেব। ইন্ডিয়ান মেজর ডি স্যুজা আমাদের সমূহ কার্যক্রম সু-নজরে দেখতেন না। উনি খুবই বদমেজাজের লোক ছিলেন। আমরা উনাকে কালা মেজর বলেও ডাকতাম। উনি সম্ভবত শৌকত সাহেবকে কানমন্ত্র দিয়ে আমাদের প্রতি বিষিয়ে তুলছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের পরিচালনার দায়িত্ব উনার কমান্ডে নিয়ে আসে। এক কথায় উজাইয়া কৈয়ের মাথায় বারির মতো। তিনি আমার নেতৃত্ব খর্ব করার উদ্দ্যেশে বারজনের টীম লিডার হিসাবে নিয়ে আসেন আনছার সদস্য জয়নাল ভাইকে। তার নেতৃত্বে আমাদের কে পাঠানো হয় মথুরকান্দি বাজারে এ্যাম্বোস করার জন্য। ওখানে নাকি পাক সেনাদের আনাগোনা আছে। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমাদের আর এ্যাম্বোস পাতার প্রয়োজন হইনি। পাক সেনাদের ফাদেই আটকে গেছি। তারা আগথেকে শক্ত ঘাটি গেড়ে বসে আছে। ভুল তথ্যে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। ওদের প্রচন্ড আক্রমনে মারকুলির অরবিন্দু দাস শহীদ হন। তার লাশটি ও আমরা আনতে পারিনি। আহত দুলচাঁদকে কোনক্রমে আনতে পেরেছি। এই দিকে আবার কালা মেজর আমাদের উল্টো শাসিয়েছেন। আমরা নাকি ভুল পথে এগিয়েছি। হিন্দি ইংলিশ গালাগালি তো আছেই। তবে ঐ দিন থেকে কালা মেজরকে আমরা পাকিস্তানী বলে আখ্যায়িত করেছি। দুদিন আবার বাগমারা এলাকায় রেকি পেট্টোল করতে গিয়ে একেই অবস্থা। দুই জন আহত ও ইব্রাহীম নামে একজন শহিদ হন। হতাহতদের নিয়ে আসতে আমরাও প্রায় আধা মরা হয়েগেছি। এর পরেও কালা মেজরের কাছ থেকে পুরুষ্কারের বদলে তিরষ্কার পেয়েছি। আমাদের তের জনের মধ্যে তিন জন আহত আর দুই জন শহীদ হওয়ায় আরো পাচঁ জনকে আমাদের সাথে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। পরের দিন আবার বৈশের পাড় এলাকায় পেট্টোল করতে গিয়ে পাক সেনারদের গুলিতে একজন আহত হয়েছে। তাকে ধরাধরি করে ভোর বেলা বালাট হাসপাতালে এসে পৌঁছি। আহত সহ আমাদের দেখে সামন্য অনুশোচনা করেন নি কালা মেজর। সকালে নাস্তা খেতে বসেছি, এমন সময় কালা মেজর এসে বলল তোমরা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নেও। দু গ্রুপে আবার রেকি পেট্টোলে যেতে হবে। আমরা বললাম সারা রাত ঘুমাইনি একটু ঘুমিয়ে বিকেলে যাব, বলল কোন কথা নয় এখনিই যেতে হবে। এক গ্রুপ বাঘমারার দিকে অন্য গ্রুপ আম পাড়া বাজারের দিকে। আমরা নাস্তা অর্ধেক খেয়ে রাগে ক্ষোভে সবাই একসঙ্গে রওনা দিলাম। রাস্তায় দুই গ্রুপ না হয়ে একত্রে আমপাড়া বাজারে গিয়ে ওঠলাম। ওখানে বসেই সাব সেক্টর বড়চড়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সবাই হাতে হাত রেখে বললাম কালা মেজরের হুকুম মানিনা, মানবনা। জয় বাংলা শ্লোগানে মুখরিত করে অস্ত্রপাতি সহ বড়চড়ার উদ্দ্যোশে রওনা দেই। সসস্ত্র বারজন টকবকে যুবক মইলাম ও পানচড়া শরনার্থী শিবির হয়ে যাওয়ার পথে হাজার হাজার নারী পুরুষ
দু’হাত তুলে জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে আমাদেরকে অভিনন্দন জানান। তখন নিজেদেরকে বিশ^ জয়ী আলেকজান্ডারের মতো মনে হয়েছে। শরনার্থীরা সসস্ত্র পাক সেনা ও রাজাকার দেখেছে। অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধা এই প্রথম দেখলেন। পায়ে হেঁটে সন্ধ্যার সময় এসে বড় চড়া পৌঁছি। দাস কম্পানী কমান্ডার জগৎ জ্যোতি দাসকে বিস্তারিত খোলে বললে উনার কোম্পানীতে যোগদানের অনুমোতি দেন। এরই মধ্যে আমার নিজ গ্রাম খাগাউড়ার এগারো জন্য মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং শেষে বড়চড়া এসে পৌঁছেছে। গ্রামের মানুষ পেয়ে আনন্দের সাথে মহা আনন্দ যোগ হয়েছে। আসার পথে মইলাম ও পানচড়ার শিবিরে এবং বড়চড়ায় আতœীয় স্বজনদের কাছ থেকে যত টুকু জানলাম কয়েক দিন আগে জামালগঞ্জের নয় মৌজার এক হিন্দু গ্রামে রাজাকাররা গিয়ে একটি পাড়ায় ওঠে লুটপাট ও কয়েক জন যুবতীকে গণধর্ষণ করে। রাজাকারদের নৌকা ঘাটে ভিরতেই অবিবাহীত মেয়েরা পালাতে শুরু করে। আর বর্ষা কলে পালানোর জায়গায় বা কোথায়। ঘর ও গোয়াল ঘরের কোণে, পানিতে কচুরি পানার নিচে লুকিয়ে আতœ রক্ষার চেষ্টা করে। আধা শরীর লোকালেও বাকী শরীর স্পষ্ট দেখা যায়। কেউ কেউ সুশ্রী যুবতীদেরকে বধুর সাজে শাখা সিধুর পরিয়ে রান্না করে রেখে দেয়।

  • [১]