স্বপন কুমার দেব
সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ রায় দিয়েছেন ‘রাইট টু প্রাইভেসি’ একটি মৌলিক অধিকার। একজন নাগরিক তার গোপন বিষয় গোপন রাখতে পারবেন। কলকাতার ‘দেশ’ ম্যাগাজিন সহ ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে এ বিষয়ে লেখালেখি হয়েছে। সেখান থেকেই বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমার কাছে বিষয়টি একটু ব্যতিক্রমী মনে হওয়ায় এবং আমাদের দেশে এর প্রভাব প্রতিক্রিয়া কতটুকু হতে পারে কিংবা কতখানি প্রযোজ্য হতে পারে এসব চিন্তা ভাবনা থেকেই এই লেখা কিংবা আলোচনার সূত্রপাত। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানে বিভিন্ন আঙ্গিকে জনগণের মৌলিক অধিকার একটি স্বীকৃত বিষয়। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে শুনানী চলাকালে সরকারের যুক্তি ছিল যে প্রাইভেসির ধারণাটা খুবই অস্পষ্ট এবং অনির্দিষ্ট যে তা একটি বিশেষ অধিকার হিসাবে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সেখানকার বিচারপতিগণ সুদূর অতীতে অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে প্রাইভেসির ধারণার ক্রম বিবর্তন আলোচনা করে দেখিয়েছেন প্রাইভেসি আসলে স্বাধীন এবং সার্বভৌম ব্যক্তি সত্ত্বার একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থান, যেখানে বাইরের কোন হস্তক্ষেপ চলে না। সকলেরই ধারণা প্রাইভেসী একটি ব্যক্তিগত বিষয়। নিজ ব্যক্তিজীবনে ও যাপনে নিজস্ব গোপনীয়তা অবশ্যই একজন সংরক্ষণে অধিকারী। এটি তার মৌলিক অধিকারের আওতাভূক্ত। কিন্তু প্রাইভেসি রক্ষার্থে এমন কোন বিষয় যদি থাকে যা সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর তাহলে অবশ্যই এই অধিকার মৌলিক অধিকারের আওতাভূক্ত হবে না। ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা, পর্যবেক্ষণ, সিদ্ধান্ত ইত্যাদি অবশ্যই আছে। রায় পাঠ করার সুযোগ হয়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় বিচার ব্যবস্থায় রাইট টু প্রাইভেসির বিচার বিবেচনা শুরু হয় মোটামুটি উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে। সূত্রপাত উত্তর আমেরিকায়। সেখানে তখন শুরু হয়েছে দ্রুত বেগে আধুনিক নগরায়নের কর্মকা- এবং প্রযুক্তির চোখ ধাঁধানো নব নব আবিস্কার। এতে চাপে পড়ে যায় ব্যক্তি জীবন। নীরবে নিভৃতে নিজস্ব ধারায় এক খ- সুখ আর শান্তি নিয়ে জীবন যাপন বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সর্বত্র রব উঠে প্রাইভেসি আর রক্ষা করা যাচ্ছে না। সেই থেকেই প্রথম কমন ‘ল’ এর আওতায় রাইট টু প্রাইভেসি’র প্রবেশ ঘটে বিচার অঙ্গনে। ভারতের বিভিন্ন উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে রাইট টু প্রাইভেসিকে স্বীকৃতি দিয়ে রায় প্রদান করলেও ‘রাইট টু প্রাইভেসি’ মৌলিক অধিকার নয় বলে বিপরীত রায়ও আছে। কাজেই একটি অসঙ্গতি এবং অষ্পষ্টতা তো ছিলই। কিন্তু এবারে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের বৃহত্তম বেঞ্চ রায় প্রদান করায় হয়তো সে দেশে এ নিয়ে একটা আইনগত বিতর্কের নিস্পত্তি হলো। এ রায় তত্ত্বগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপক্ষে সেখানকার এটর্নী জেনারেল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন ‘রাইট টু প্রাইভেসি’ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেবা প্রকল্পের পরিপন্থী। এই অধিকার কেবল এলিটদের বিলাসিতা। সাধারণ মানুষ যারা জীবন ধারনের জন্য জরুরী এবং প্রয়োজনীয় রসদের জন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল, তাদের কাছে সেই রসদ পৌঁছে দিতে ‘রাইট টু প্রাইভেসি’ অন্তরায় সৃষ্টি করবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ ভিন্নরূপ। কোর্ট মনে করেন সরকারের যুক্তি সংবিধানের আগাগোড়া ভুল পাঠ। গরিবের রাজনৈতিক অধিকারের চেয়ে অর্থনৈতিক অধিকার বেশী জরুরী, এই ধরনের চিন্তা ভাবনা এবং ধারনা বা অবস্থান আসলে পরোক্ষভাবে মানবাধিকার লংঘনের তাত্ত্বিক ভিত্তি। কারণ মূলত: রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারের সংঘাত কাল্পনিক, যার কোন শক্ত তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। সরকারী সেবা তখনই নিশ্চিত করে ন্যায্য প্রাপকদের হাতে পৌঁছাবে যখন রাজনৈতিক স্বচ্ছতা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ সেটা নিশ্চিত করতে পারবে। না হলে সেবা আটকে যাবে মুনাফালোভী মধ্যস্বত্বভোগীদের গুদামে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের লেখার প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে উন্নয়ন কেবল কতগুলো নিস্প্রাণ পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবন তথা স্বাধীনতার বিকাশে তাদের ভূমিকা কতটা, তার খতিয়ানও জরুরী। এই রায়ে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় একটা প্রভাব তো পড়বেই। উঠে আসবে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় কতটুকু মৌলিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ইত্যাদি সম্পর্কিত আলোচনা ও সমালোচনা। আমাদের দেশের মহামান্য উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের রেফারেন্স পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে রাইট টু প্রাইভেসি নিয়ে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতেও আইনী লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটতে পারে। সম্পদের তথ্য গোপন সহ আয়কর ফাঁকি, গোপন দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয় কোন অবস্থায়ই আইনীভাবে রাইট টু প্রাইভেসির আওতাভূক্ত নয় বলে অনুমিত হয়। তবে কর্তৃপক্ষের যেমন রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা থাকবে ও সুশাসনের ক্ষমতা থাকবে তেমনি একই সঙ্গে তথ্য জানার অধিকারও জনগণের থাকবে। রাইট টু প্রাইভেসির বিরোধিতা যেমন কাম্য নয় তেমনি রাইট টু প্রাইভেসি ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে এই ব্যাপারে একটা সীমারেখা থাকা আবশ্যক। বিদগ্ধ জ্ঞানী জনের কাছ থেকে মূল্যবান আলোচনার আশা রইলো।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক।