১৯৭১ সালে এমএ মান্নান পাক সেনাদের কবল থেকে প্রাণে রক্ষা পান
হোসেন তওফিক চৌধুরী
সৌভাগ্য ও সফলতার এক বরপুত্র আবদুল মান্নান। তিনি বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। সফল সরকারী চাকুরী জীবনের পর রাজনীতিতে যোগদান করে এই পদে আসীন হয়েছেন। অসাধারণ মেধা, প্রতিভা ও ধৈর্য্যরে জন্যেই এই সফলতা অর্জন করেছেন। আরও সফলতা তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। জনাব মান্নানের জীবনে দুটো বড় অলৌকিকতা রয়েছে। জীবনের অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়েই তিনি বর্তমান মর্যাদার আসনে পৌঁছেছেন।
১৯৭১ সাল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের যুগসন্ধিকাল। বাঙালি জাতির মহাজাগৃতির সময়। দেশের সর্বত্র সশস্ত্র স্বাধীনতা
যুদ্ধ চলছে। এই সংকটময় এবং ক্রান্তিকালের একটি অলৌকিক ঘটনা আজ এই নিবন্ধে প্রকাশ করছি। আমি তখন ঢাকায় অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার। আমাদের অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জনাব এমএ মান্নান একটি এনজিওতে চাকুরী করেন। আমরা ঢাকার আরামবাগে একটি মেসে থাকি। আমি ও মান্নান সাহেব রুমমেট। এর আগেই তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ও পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন মৌখিক পরীক্ষা বাকী। তাকে নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট দাখিলের জন্য বলা হলো। আজ এত বছর পর দিনক্ষণ মনে নেই। তবে জুলাই আগস্টে হবে। তিনি সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্যে পিআইএ বিমানে ঢাকা থেকে সিলেট আসছিলেন। বিমানে তখন আর্মি গার্র্ড থাকত। বিমানে আরোহণের কিছু সময় পরই আর্মি গার্ডরা জনাব মান্নানকে সন্দেহ করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে গেল। সেখানে নিয়ে যাওয়ার অর্থই হল সন্ধ্যার পরই হত্যা। এটাই ছিল তখনকার নিয়ম। জনাব মান্নানকে এভাবে সেনারা পাকড়াও করলো এবং সেনানিবাসের অন্ধকার প্রকোষ্টে রাখল। এটা কেউ জানে না বা জানবার কথাও নয়। মান্নান একজন আর্মি গার্ডকে বুঝাতে সমর্থ হলেন যে আমার ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। তুমি দয়া করে আমার মেসে খবরটা পৌঁছে দেও যে আমি আর্মি হেফাজতে আছি। সে রাজী হলো। মান্নান একটা চিরকূট পাঠালেন। একটি ছোট চিরকূট। তিনি লিখলেন,‘আমি সেনানিবাসে, সন্ধ্যার পরই হয়তো শেষ। যদি পার তবে আমার জন্য কিছু কর।’ হঠাৎ উর্দি পরিহিত দু’জন আর্মি আমাদের মেসে এসে হাজির। আমরা তাদের দেখে ভয় পেলাম। বুক কেঁপে উঠলো। তাদের কথা শুনে এবং চিরকূট পেয়ে সব জানলাম। আমাদের বুকে ধরফরানি শুরু হল। আমরা সবাই বিমর্ষ ও বাকরুদ্ধ। তখনকার অবস্থা দূর থেকে দেখে কারও করার কিছু নেই। আল্লাহর কাছে তাঁর প্রাণ রক্ষার দোয়া করা ছাড়া আর কি ছিল। আমরা সবাই তাঁর প্রাণ রক্ষার জন্য দোয়া করলাম। আমরা যারা মেসে ছিলাম সবাই সাধ্যমত তাঁর জন্য চেষ্টা করলাম। আমাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করলেন। আল্লাহর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। রাখে আল্লাহ মারে কে। আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত ব্যক্তি মান্নান। সন্ধ্যার একটু আগেই মান্নান মেসে এসে হাজির। আমরা যেন আকাশের চাঁদ আমাদের মধ্যে ফিরে পেলাম। সে যে কি আনন্দ। সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। জনাব মান্নানের জীবনে আরো একটি আলোকিত ঘটনা ঘটেছে। সেসব ক্ষেত্রেও তিনি মৃত্যুর কবল থেকে ফিরে এসেছেন। ১৯৬৫ সালে এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মান্নান ছাড়া সব যাত্রী নিহত হন। আল্লাহর অপার রহমতে তিনি এত উপর থেকে পড়েও প্রাণে রক্ষা পান। বিমান কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল এই দুর্ঘটনায় কেউ জীবিত নেই। পরে মান্নান জীবিত খবর পেয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় তাঁকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলা হয়।
উপরে বর্ণিত দুটো ঘটনায়ই জনাব মান্নান নির্ঘাত মৃত্যুর কবল থেকে ফিরে এসেছেন। আল্লাহর অশেষ দয়াই তিনি বেঁচে গিয়ে এখন দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত।
লেখক: আইনজীবী-কলামিষ্ট