- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

রাবারড্যাম- কৃষকদের স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি
দুটি রাবারড্যাম জেলার বিশ্বম্ভরপুর ও সদর উপজেলার করচার হাওর পাড়ের অর্ধ লক্ষ কৃষকের স্বপ্ন দেখার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। জেলার ১১ উপজেলার ১৩৮ টি ছোট-বড় হাওরের বেশিরভাগেরই এবার বাঁধ ভেঙে বা বাঁধ উপচে পানি ঢুকে ফসল ডুবেছে। কিন্তু করচার হাওরের উচু এলাকার কৃষকরা শুক্রবারও (২০ মে)  ধান কেটেছেন। কৃষকরা বলেছেন,‘গজারিয়ায় লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বালুর বাঁধ হতো, সুরমা বা চলতি নদীতে পানি বাড়লেই দুশ্চিন্তায় ঘুমোতে পারতেন না কৃষকরা। এবার অকালে পানি বাড়লেও গজারিয়া ও ঘাগটিয়ার ভাঙন (ক্লোজার দিয়ে) দিয়ে পানি প্রবেশ করেনি। দুশ্চিন্তাও ছিল না কৃষকদের’।
করচার হাওরে জমি রয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর। এই হাওরের নিচু এলাকার ফসল এবার জলাবদ্ধতায় ডুবেছে। কিন্তু হাওরের দুটি বড় ক্লোজারে (ভাঙনে) রাবারড্যাম কাম ব্রিজ হওয়ায় নদী টইটুম্বুর হলেও পানি ঢুকতে পারেনি হাওরে।
গজারিয়ায় প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫০ মিটার লম্বা রাবারড্যাম কাম ব্রিজ এবং ঘাগটিয়ায় ৫ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ মিটার লম্বা রাবারড্যাম কাম ব্রিজ হয়েছে। সুনামগঞ্জ এলজিইডি কর্তৃক নির্মিত এই দুটি প্রকল্প হাওর এলাকার কৃষকসহ সংশ্লিষ্টদের অকাল বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় নতুন পরিকল্পনার সুযোগ করে দিয়েছে।
গজারিয়া রাবারড্যাম পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভাতেরটেক’র হোসেন আলী (৫০) বলেন,‘চৈত্র মাসের শেষ দিকে গজারিয়ায় বালুর বাঁধ দেবার কাজ শেষ হতো, বাঁধের দুই পাশে গাঢ় পলিথিন দিয়ে প্যালাসিটিং (বাঁধ আটকানোর ব্যবস্থা) করা হতো। এরপরও রাতে ঘুম হতো না আমাদের কখন বাঁধটি ভেঙে ফসল ডুবে যায় এই ভয়ে। ছোটকাল থেকে এই বয়স পর্যন্ত অন্তত ৫ বার এই বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনা দেখেছি। এবার এই দুশ্চিন্তা আমাদের ছিল না, রাবারড্যামের উল্টোপাশে নদীর দিকে ৬ ফুট উপরে পানি আটকা আছে, বালির বাঁধে এই পানি আটকানো কঠিন ছিল’।
ভাতেরটেকের কৃষাণি জুবেদা হাছান বললেন,‘রাবারড্যামের উপরের সেতু দিয়ে আমরা চলাচল করতে পারছি, ধান শুকাতে পারছি, অন্যবছর বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি নামতো এপার থেকে ওপারেও যাওয়া সম্ভব হতো না’।
একই এলাকার কৃষক বশর মিয়া বলেন,‘আমার ১০ কেয়ার জমির সবটুকুই কেটে আনতে পেরেছি, প্রথম প্রথম আমরা চিন্তা করেছিলাম রাবার দিয়ে কীভাবে এমন প্রবল বেগের পানি আটকানো যাবে, এখন পানি আটকানো দেখে আমাদের সাহস হয়েছে। তবে রাবারড্যামটি আরো দুই-তিন ফুট উঁচু হলে ভালো হতো’।
চালবন্দের কৃষক শাহেদ আলী বলেন,‘রাবারড্যাম দুটি আমাদের কাছে স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে, এখানে রাবারড্যাম হবার আগে বছরে বছরে বাঁধ দেবার সময় এলাকার গরীব মানুষেরা মাটি কেটে কিছু টাকা রোজগার করতে পারতো, কিন্তু সকলেরই চিন্তা থাকতো বাঁধ কখন ভেঙে যায়, বাঁধ ভাঙলে ফসল ডুবে গেলে সারা বছরই আমাদের খাওয়ার চিন্তা করতে হতো। এলাকা থেকে শহরে যেতে হলে দুটি স্থানে খেওয়ায় পারাপার করা লাগতো, এটিও এখন আর লাগবে না’। তিনিও রাবারড্যাম একটু উঁচু হলে ভাল হতো বলে মন্তব্য করেন।
এলাকার সমাজকর্মী শাহ্পরান বলেন,‘এই কাজের জন্য সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ আমরা, এভাবে নদীর পানি আটকানো যায়, আগে বুঝতেই পারিনি, দীর্ঘস্থায়ী এই ব্যবস্থায় এলাকার সকল কৃষকই খুশি’।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ইকবাল আহমদ বলেন,‘২২৬ সদস্য বিশিষ্ট গজারিয়া খাল রাবারড্যাম পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও ৪০ সদস্য বিশিষ্ট ঘাগটিয়া খাল রাবারড্যাম পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি করা হয়েছে, তারাই এখানকার পানি কখন আটকাতে হবে, কখন ছাড়তে হবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করবেন। পরিবেশ-প্রতিবেশসহ নানা বিষয় যাচাই করে উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে। উজানের মানুষ বা বাড়িঘর যাতে সংকটে না পড়ে এসব বিষয়ও যাচাই করা হয়েছে। এই দুটি প্রকল্প আমাদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। রাবারড্যামের ব্যয়কে সামান্য বাড়িয়েই এলাকাবাসীর চলাচলের একটি বড় সেতু হয়েছে। এখন এই সেতুর এপ্রোচ সড়ক থেকে পাশের দুই দিকের গ্রাম পর্যন্ত সড়ক করে দেব আমরা। হাওর এলাকায় আরো ১০ টি রাবারড্যাম নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাবনা কৃষি মন্ত্রণালয়কে পাঠানোর চিন্তা রয়েছে আমাদের। গজারিয়া রাবারড্যাম প্রকল্পটি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করানোর চেষ্টা করবো আমরা’।

  • [১]