- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

রামদিঘায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চারজনের মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা?

এ দেশে ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু’ এমন দুর্ঘটনার খবর নতুন নয়। তবে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থানার চামরদানী ইউনিয়নের রামদিঘা গ্রামে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে হঠাৎ তার ছিড়ে মাটিতে পড়ে বিদ্যুৎবাহিত তারে জড়িয়ে একই পরিবারের ৩জন নারী-পুরুষসহ আরেকটি পরিবারের মেয়ে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাকে একটি নিছক দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারেনা।
গত ২৬ এপ্রিল মঙ্গলবার সকালে ওই এলাকায় কোনো ঝড়ো বাতাস বয়ে যায়নি। বৈদ্যুতিক তারের ওপর কোনো গাছের ডালপালাও পড়েনি। তাহলে হঠাৎ কেন বৈদ্যুতিক তার খুলে নিচে পড়বে? তাহলে কি নতুন বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার কাজে ত্রুটি ছিল?
যিনি এ কাজের ঠিকাদার ছিলেন তিনি হয়ত ইতোমধ্যে (যদিও আমি নিশ্চিত না) বিলের টাকা তুলে নিয়েছেন। এ ঘটনার খবর যে উনি ইতোমধ্যে পেয়েছেন তা নিশ্চিত করে বলতে পারি। উনি হয়ত ধরেই নিয়েছেন যে যদি তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম বা কাজে গাফিলতির অভিযোগ ওঠে তাহলে একটা লামচাম বুঝিয়ে যে যে গু (ঘুষ) খায় তাঁদের ইচ্ছামত খাইয়ে সব ধামাচাপা দেবেন।
শুধু উনি কেন থানা পুলিশসহ ওই এলাকার একজন সাবেক চেয়ারম্যান নিহতের পরিবারকে এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, লাশের ময়নাতদন্ত করে কোনো লাভ নেই। তাছাড়া ময়নাতদন্ত করতে রামদীঘা থেকে লাশ সুনামগঞ্জ নিয়ে যেতে হলেও অনেক টাকা দরকার। আর সেই টাকা নিহতের পরিবারের কাছে নেই। যে সকল বুদ্ধির সাগরেরা নিহতের পরিবারকে এটা খুব যতœসহকারে বুঝিয়েছেন তাদের পরিবারেও এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটুক। তখন দেখি তাঁরা কি করেন? তখন কি উনারা বসে বসে লেমন জুস খাবেন? অবশ্যই খাবেন না। চিল্লাপাল্লা করে, প্রেস ডেকে সবাইকে জানান দেবেন। দোষীদের বিচার চাইবেন। রাস্তায় নামবেন। ‘বিচার চাই, বিচার চাই, ঠিকাদারের ফাঁসি চাই’ মার্কা শ্লোগান দিয়ে সবার কান ঝালাপালা করে ছাড়বেন। থানায় মামলাও লেখাবেন। মামলার গতি বাড়াতে থানা পুলিশকে যা দেওয়ার তাও দিবেন। আর সাথে হৃদয় ফাটানো কান্নাতো থাকবেই।
যেমনটি কাঁদছে রামদিঘার রণজিত সরকারের দুই মেয়ে রিপা সরকার ও পিয়াসী সরকার এবং এক ছেলে রূপান্তর সরকার। কাঁদতে কাঁদতে পাথর হয়ে গেছেন রণজিতের মা চারুবালা সরকার। তিনি একই সাথে নিজের স্বামী জগদীশ সরকার ও ছেলে রণজিৎ সরকারকে হারিয়েছেন। কাঁদছেন নিহত সোনালী দাসের বাবা রাকেশ দাস। তাঁদের কান্নার সীমানা কি খুব ছোট? দরিদ্র বলে কি তাঁদের কান্না কারো কানে পৌঁছায় না?
আমরা মানুষ হিসেবে কি আসলেই শ্রেষ্ঠ? ধনী লোকের কান্না আমরা খুব সহজেই শুনি। দৌড়ে গিয়ে সমবেদনা জানাই। আর যারা দিনমজুর, দিন আনে দিন খায় তারা যদি গোষ্ঠীসহ মরে যায় তাহলে আমরা টিয়ার শেল মেরেও কাঁদতে পারি না। আমরা কি আসলেই শ্রেষ্ঠ?
গত ২ এপ্রিল দুপুরে ধর্মপাশা উপজেলার সদর ইউনিয়নের হলিদাকান্দা গ্রাম সংলগ্ন মাঠে নেত্রকোনা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির অধীনে ৩৪টি গ্রামের ৫ হাজার ৭টি পরিবারের মধ্যে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্বোধন করা হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ  উদ্বোধক হিসেবে তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হবে।’ এটি সরকারের একটি ভাল উদ্যোগ। আমরা এমন উদ্যোগকে অবশ্যই স্বাগত জানাই।
তবে মন্ত্রীমহোদয়, উদ্বোধনের আগে দেখা নেওয়া উচিত যে সংযোগগুলো ঠিকমত দেওয়া হয়েছে কি না? তবে আমার জানা মতে নতুন সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের তদারকি কর্মকর্তা যখন কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন দেন তারপর নতুন সংযোগের উদ্বোধন করা হয়। যেহেতু রামদিঘায় এমন একটি মর্মান্তিক দূর্ঘটনা ঘটে গেলো সেহেতু আমরা যারা আমপাবলিক তারা এটা ধরে নিতে পারি যে ওই গ্রামে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের কাজটি সঠিকভাবে হয়নি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারসহ তদারকি কর্মকর্তাকে এ ক্ষেত্রে সরাসরি দায়ী করাটা ভুল হবে না। তবে মন্ত্রীমশাই আরেকটা কথা না বললেই নয়। যেদিন আপনি ধর্মপাশায় আরো ৩৪টি গ্রামের নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ উদ্বোধন করে আকাশপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন তখন থেকেই লোডশেডিং নতুন মাত্রায় রূপ নিয়েছে। মনে হচ্ছে আপনি বিদ্যুতের পরিবর্তে লোডশেডিংয়ের উদ্বোধন করে গেছেন। এ নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। কারণ শত অভিযোগ করেও কোনো লাভ নেই।
আমরা ধর্মপাশাবাসী আবার সেই কুপি বাতি আর হারিকেন যুগে ফিরে যাচ্ছি। বড় আক্ষেপ করেই বলি আমরা অনেকেই আমাদের ইলেকট্রিক চার্জার লাইটটিও ঠিকমত চার্জ দিতে পারি না। আর যারা এখানে গণমাধ্যমে কাজ করেন তারা যে কি পরিমাণ অশান্তিতে আছেন তা বলে বুঝানো যাবে না।
তবে এটাও বুঝানো যাবে না যে, রামদিঘার রণজিতের ছেলে, মেয়ে ও তাঁর মা কি পরিমাণ কষ্ট পাচ্ছেন। ওদের ভরণপোষণ দেওয়ার একটি মানুষও রইলো না। রণজিতের ছোট ভাই রিপনের আর্থিক অবস্থাও ভাল নয়। রিপন যেখানে তাঁর পরিবার নিয়ে চলতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খায় সেখানে তাঁর মা, দুই ভাতিজি ও এক ভাতিজার ভরণপোষণ করবে এমন ভাবাটা অবান্তর। তবুও জীবন থেমে থাকবে না, চলবে তার আপন গতিতে।
নেত্রকোনা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি এ ঘটনার তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। হতে পারে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, তদারকি কর্মকর্তাসহ দোষী ব্যক্তিরা তদন্তে পার পেয়ে যাবেন। তাঁদের পার করে দিতে সাহায্যকারি কর্তার অভাব হবে না। উনারা মিষ্টি টাইপের লোক তাই তাঁদের চারপাশে পিঁড়ড়ার মত অনেক লোকের ভিড়। এমন ভিড়ের মাঝেও জেগে উঠুক মানবতা। প্রতিবাদ হোক এমন জঘন্য কাজের। শাস্তি পাক দোষী ব্যক্তিরা এবং প্রতিষ্ঠিত হোক চিরন্তন সত্যের।
লেখক: সাংবাদিক।

  • [১]