দিরাই সংবাদদাতা
সুনামগঞ্জের রামেশ্বরপুরের পাইটালরা (পাটির কারিগর) এখন শীতলপাটি কম বুনেন। একসময় শীতল পাটির গ্রাম হিসেবেই পরিচিতি ছিল রামেশ^রপুরের। গ্রামের বেশির ভাগ নারীর জীবন জড়িয়ে আছে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া শীতল পাটিতে। এই গ্রামের নারীদের হাতে তৈরী শীতল পাটির সুনাম রয়েছে। এই গ্রামের ৭০ পরিবারের শতাধিক পাইটাল দীর্ঘদিন ধরে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রামের পাটি শিল্পকে। ঈদে—পূজোয় শীতল পাটির অর্ডার থাকতো, এখন সেটি কমে গেছে। পরিবারের নারী—পুরুষ, ছেলে, মেয়ে সকলেই পাটি বুননে পারদর্শী।
রামেশ্বরপুর ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামের স্কুল পড়ুয়া কিশোরী থেকে শুরু করে সকলেই পাটি বানানোর কাজ করেন। পাটি বুননের কাজ নারীরা সাধারণত গোল হয়ে বসেন, নিজেদের বসত ঘরের বারান্দায় বা উঠানে বসে পাটির কাজ করেন। পাটি তৈরিতে নারীদের সহযোগিতা করে থাকেন পুরুষরা। পাটি তৈরিতে পুরুষগণ বেতি (পাটি বানানোর বেত) তোলার কাজ করেন। নারীরা বুননের মধ্য দিয়ে পাটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। পাটি বুননের আগে বেত রং করার মাধ্যমে পাটির নানা নকশার কাজ করে নারীরা। এতে সুন্দর হয়ে উঠে পাটি। শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন রামেশ^রপুরের পাইটালরা। শীতলপাটির চাহিদা কমে যাওয়ায়, এই অভিজাত পাটিও কম তৈরি করছেন পাইটালরা।
তারা জানান, সাধারণ পাটির চাহিদা বেশি থাকায় বিপুল পরিমানে সাধারণ পাটি তৈরী করছেন পাইটালরা। সাধারণ পাটির দামও ৭—৮শ’ টাকার মধ্যে। এজন্য এই পাটির ক্রেতা বেশি।
অর্ডার না পেলে শীতল পাটি তৈরী করেন না রামেশ^রপুরের পাটিশিল্পীরা। শীতল পাটি তৈরী করতে ১০—১৫ দিন সময় লাগে, খরচ বেশি হয়, এজন্য বেশি দামেও বিক্রি করতে হয়। দাম বেশি থাকায় ক্রেতারাও শীতল পাটি কিনতে আসে না।
পাটিশিল্পীরা জানান, একটি বড় সাইজের শীতল পাটি তৈরি করতে ৬৪ টি বড় বেত প্রয়োজন হয়। বেতের সাইজ ছোট হলে বেত লাগে একশ থেকে ১২০—১২২ টি। একটি বড় শীতল পাটি তৈরীতে একজনের দশ থেকে বার দিন, ছোট সাইজের হলে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ দিন।
বড় আকারের শীতল পাটি তৈরীতে বেতের দাম, বেতিতোলা, পাটি বুনন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ হয় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। সেই পাটি বাজারে বিক্রি করা হয় চার হাজার থেকে সাত হাজার টাকয়া।
পাটি তৈরীতে ব্যস্ত সুমিত্রা বালা দত্ত, চম্পা রানী কর, সুচিত্রা দত্ত জানালেন, তারা এই গ্রামে বউ হয়ে এসেছিলেন, পরিবারের প্রয়োজনেই পাটি বুননের কাজ শিখেছেন। সংসারের বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি পাটি বুননের কাজও করতে হয় তাদের ।
তারা জানান, এই গ্রামে সাধারণত নরমাল পাটি, শীতলপাটি, জামদানি, সাদাপাটি, রঙিন পাটি বোনা হয়। একটি পাটি বোনতে ২৪০ থেকে ৩২০ টি মুর্তা লাগে। সাধারণ পাটি বোনা শেষ করতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে শীতলপাটি ও জামদানি পাটিতে পনের থেকে বিশ দিন সময় লাগে। সাধারণ পাটি ৭০০—১০০০ টাকা বিক্রি করা যায়। জামদানি বিক্রি হয় দুই থেকে চার হাজার টাকায় এবং শীতল পাটি তিন থেকে সাত হাজার টাকায় বিক্রি হয়। গ্রামের সকলেই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করায় অনেক সময় স্কুল পড়–য়া ছেলে—মেয়েদেরও কাজে লাগানো হয়।
পাটিশিল্পীরা জানালেন, বাজারে প্লাস্টিকের অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়ায় শীতল পাটি কিনতে আসে না ক্রেতারা।
সুচিত্রা বালা দত্ত বললেন, ৩০ বছর ধরে পাটি বানানোর কাজ করছেন তিনি। বছর দশেক আগে শীতল পাটির চাহিদা যেমন ছিল, এখন সেভাবেই নেই।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য লাল মিয়া বললেন, রামেশ্বরপুরের শীতল পাটির ঐতিহ্য ছিল। শীতল পাটির দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা কিনতে আসে না। তিনি বলেন, শীতল পাটির চাহিদা বাড়ানো গেলে বা বিদেশে রপ্তানী করার সুযোগ করে দিলে গ্রামের শীতল পাটির ঐতিহ্য ধরে রাখা যেত।