- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

রাষ্ট্রীয় সমর্থন ব্যতিত জলমহাল রক্ষা কঠিন

মাছ বালি ধান, সুনামগঞ্জের প্রাণ। সুনামগঞ্জকে সহজে চেনার বাক্যবদ্ধ এটি। এই ছন্দময় বাণীর মাধ্যমে জেলা সুনামগঞ্জের জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকা- সম্পর্কে সহজেই ধারণা মিলে। কিন্তু এখন কি সুনামগঞ্জের অবস্থা ওই বাক্যবদ্ধের মতো আছে? ধুকে ধুকে ধান উৎপাদনের বিষয়টি টিকে আছে। বাকি দু’টোÑ বালু আর মাছ ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। অজ¯্র প্রজাতির মিঠাপানির মৎস্যসম্পদ সমৃদ্ধ সুনামগঞ্জে এখন মাছের হাহাকার। সারা দেশের মধ্যে অন্যতম মৎস্যভা-ার টাঙ্গুয়া আজ মৎস্যশূন্য। নদী-নালা-খাল-পুকুরে নেই দেশি মাছ। হাওরের নি¤œাঞ্চলে বিল নামে পরিচিত কিছু জলমহালে এখনও যে সামান্য কিছু মাছের অস্তিত্ব রয়েছে তাও আমাদের লোভ আর দাপটের কাছে আজ বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে। জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী জেলায় ২০ একরের উপরে আয়তনবিশিষ্ট জলমহালের সংখ্যা ৪২০ টি। ২০ একরের নীচে আয়তন বিশিষ্ট জলমহালের সংখ্যা ৬২৫ টি। সর্বসাকূল্যে জলমহালের মোট সংখ্যা ১০৪৫ াট। এগুলো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অথবা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ইজারা হয়ে থাকে। বেশ কিছু জলমহাল রয়েছে যেগুলো আদালতে মামলায় জড়িত থাকার কারণে ইজারা দেয়া যায় না। বড় জলমহালগুলোর দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়ে থাকে অহরহ। এবছরই জলমহালগুলোতে সংঘর্ষে প্রাণ গেছে চার ব্যক্তির। এরকম অবস্থায় জলমহালগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত হয়ে পড়েছেন জেলাবাসী। জেলার অপরাপর জলমহালগুলোও টাঙ্গুয়ার মতো ভাগ্য বরণ করে কিনা সে আশংকা তাদের মনে।
জেলার জলমহালগুলোর বিশৃঙ্খল অবস্থা বিশ্লেষণ করে এর কারণ হিসাবে মোটাদাগে যেসব বিষয় সামনে আসে সেগুলো হলো:- ইজারাপ্রক্রিয়ায় দুর্বলতার কারণে মামলা-মোকদ্দমা তৈরি, তথাকথিত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলোর সুবিধাবাদিতা ও রাজনৈতিক প্রভাব। ইজারাদানকারী কর্তৃপক্ষ সচেতন ও আন্তরিক থাকলে এতো মামলার উদ্ভব ঘটত না। আইনি সুবিধার কারণে কিছু পকেট মৎস্যজীবী সমিতির আবির্ভাব ঘটেছে যেগুলো প্রকারান্তরে প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত থাকে। এই সমবায় সমিতি গঠন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে। কিছু সমিতি সামান্য সুবিধা নিয়ে ইজারা সত্ব বিক্রি করে দেয়। ইজারাগ্রহণ ও দখলদারিত্বে ব্যাপক রাজনৈতিক মদদ জলমহালগুলোর এক নির্মম বাস্তবতা। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের স্থানীয় প্রভাবশালীরাই নানা কায়দা-কানুন করে বিল-জলাশয় দখল করে খায়। এতসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে জলমহালগুলো এখন ত্রাসের রাজত্ব হয়ে উঠেছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, সংঘর্ষের আশংকায় জেলার ৪টি বড় জলমহালে ম্যাজিস্ট্রেটসহ পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
ইজারাপ্রথা কিংবা ইজারামুক্ত অবস্থা, কোন অবস্থাতেই জলমহালগুলো সমৃদ্ধ হচ্ছে না। এ হলো ব্লেডের ধারালো দুই কিনারার মতো অবস্থা। এদিকেও কাটে ও দিকেও কাটে। সত্যিই আমরা বিভ্রান্ত কোন পদ্ধতিটি কার্যকর তা অনুমান করতে। তবে একটি জিনিস সত্য, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও রাজনৈতিক মদদ হ্রাস পেলে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটত। বাস্তবে এমনটি হওয়ার কথা নয়। তাই আমরা মৎস্যসমৃদ্ধ সুনামগঞ্জ জেলার ঐতিহ্য বিলীন হওয়ার পথেই হাঁটছি, এরকম একটি ভবিষ্যৎবাণী করা অসংগত হবে না। দির্ইা উপজেলার জারুলিয়া জলমহালটি যদি সমিতির কোন এক কর্মকর্তা অবৈধভাবে বিক্রি না করতেন তাহলে ওখানে বর্তমান সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলেই আমাদের বিশ্বাস। এই যে আইন ভেঙে ইজারাসত্ব বিক্রি করে দেয়া হলো সেজন্য কি কারও বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে? এরকম জটিল পরিস্থিতিতে শান্তিপ্রিয় প্রকৃত মৎস্যব্যবসায়ীরা এখন ভয়ে এবং অবশ্যই নিজেদের দুর্বল অবস্থানের কারণে  ইজারা ও মৎস্য আহরণ প্রক্রিয়ার ভিতর ঢুকতে চান না। রাষ্ট্র যদি ব্যাপক সমর্থন নিয়ে এগিয়ে না আসেন তাহলে জেলার জলমহালগুলোকে রক্ষা করা হবে সুকঠিন।   

  • [১]